কোটি টাকার প্রকল্প, ৯০ প্লটে কারখানা হাতে গোনা; বাজার হারিয়ে পথে বসছেন তাঁতিরা
একসময় তাঁতের খটখট শব্দে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মুখর থাকত ঈশ্বরদীর ফতেহমোহাম্মদপুরের বেনারসিপল্লি। কয়েক হাজার কারিগরের কর্মচাঞ্চল্যে জমজমাট থাকা এই জনপদ এখন যেন নীরবতার প্রতীক। শত বছরের ঐতিহ্যবাহী বেনারসি শিল্প আজ অস্তিত্বের সংকটে। কারখানা বন্ধ হচ্ছে, কারিগররা পেশা বদলাচ্ছেন, আর বাজারে দেশীয় হাতে বোনা শাড়ির জায়গা দখল করছে কম দামের মেশিনে তৈরি শাড়ি।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠছে সরকারি উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে। তাঁতশিল্প রক্ষার উদ্দেশ্যে বিপুল অর্থ ব্যয়ে বেনারসিপল্লি প্রতিষ্ঠা করা হলেও দীর্ঘ সময় পরও সেখানে প্রত্যাশিত শিল্পায়ন হয়নি। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের উদ্যোগে প্রায় ২ কোটি ১৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ফতেহমোহাম্মদপুরে সাড়ে পাঁচ একর জমির ওপর বেনারসিপল্লি গড়ে তোলা হয়। ৯০ জন তাঁতির জন্য ৯০টি প্লট বরাদ্দ দেওয়া হলেও বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মাত্র সাতটি প্লটে কারখানা স্থাপিত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে চালু থাকা কারখানার সংখ্যাও নেমে আসে হাতে গোনা কয়েকটিতে।
অর্থাৎ, প্রকল্প হয়েছে, অর্থ ব্যয় হয়েছে, প্লট বরাদ্দ হয়েছে- কিন্তু সেই অনুপাতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের কাঙ্ক্ষিত কাঠামো গড়ে ওঠেনি। এই বাস্তবতা সরকারি পরিকল্পনা, তদারকি ও পরবর্তী সহায়তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
বেনারসিপল্লি প্রতিষ্ঠার মূল উদ্দেশ্য ছিল ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পকে আধুনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়া এবং তাঁতিদের জন্য একটি স্থায়ী উৎপাদনকেন্দ্র তৈরি করা। কিন্তু দীর্ঘ সময় পরও অধিকাংশ প্লট অব্যবহৃত থাকা এবং কারখানা না গড়ে ওঠার বিষয়টি প্রকল্প বাস্তবায়নের দুর্বলতার চিত্র তুলে ধরে। ২০২২ ও ২০২৩ সালের প্রতিবেদনেও পল্লিতে অধিকাংশ প্লটে কারখানা না থাকার বিষয়টি উঠে এসেছিল।
আরও হতাশাজনক হলো- কখনো এই শিল্পে শত শত কারখানা ও কয়েক হাজার কারিগরের কর্মচাঞ্চল্য ছিল। ২০১৯ সালের একটি প্রতিবেদনে ঈশ্বরদীর বেনারসিপল্লিতে চার শতাধিক কারখানা এবং প্রায় তিন-চার হাজার কারিগরের কর্মব্যস্ততার কথা উঠে এসেছিল। আজ সেই চিত্র অনেকটাই অতীত।
তাঁত মালিক ও ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, কম দামের মেশিনে তৈরি ভারতীয় শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় হাতে বোনা বেনারসি ক্রমেই পিছিয়ে পড়ছে। একটি হাতে বোনা শাড়ি তৈরি করতে কয়েক দিন পর্যন্ত সময় লাগে। প্রয়োজন হয় দক্ষ শ্রম, সূক্ষ্ম কারুকাজ ও দীর্ঘ সময়ের পরিশ্রম। বিপরীতে আধুনিক মেশিনে দ্রুত ও তুলনামূলক কম খরচে শাড়ি উৎপাদন সম্ভব।
ফলে বাজারে দামের প্রতিযোগিতায় দেশীয় তাঁতিরা বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ছেন। তবে শুধু বিদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতাকেই দায়ী করলে সমস্যার পুরো চিত্র পাওয়া যায় না। কারিগরদের জন্য সহজ ঋণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি, প্রশিক্ষণ, কাঁচামালের সুবিধা, বিপণনব্যবস্থা এবং দেশীয় পণ্যের ব্র্যান্ডিং- এসব ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদি সরকারি সহায়তার ঘাটতি রয়েছে বলে তাঁত মালিকদের অভিযোগ।
এই সংকটের সবচেয়ে বড় আঘাত পড়েছে কারিগর পরিবারগুলোর ওপর। কাজ কমে যাওয়ায় অনেক দক্ষ তাঁতশ্রমিক পেশা পরিবর্তন করেছেন। নতুন প্রজন্মও দীর্ঘ সময় পরিশ্রমের তুলনায় কম আয় হওয়ায় এই পেশায় আসতে আগ্রহী নয়। ফলে শুধু কারখানা বন্ধ হচ্ছে না- ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গড়ে ওঠা তাঁত বোনার দক্ষতা।
একজন তাঁত মালিকের ভাষ্য, একসময় ঈশ্বরদীতে প্রায় এক হাজার তাঁত ছিল; এখন তা কমে আনুমানিক ৪০-৫০টির মধ্যে নেমে এসেছে। সরকারি সহায়তা, সহজ কিস্তি ও বাজার সুবিধা পেলে শিল্পটি আবার ঘুরে দাঁড়াতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।
ব্যবসায়ী মো. জাবেদ খান বলেন, তাঁর বাবা বেনারস থেকে এসে এখানে ব্যবসা শুরু করেছিলেন। কিন্তু ভারতীয় শাড়ির প্রতিযোগিতা এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় এখন তাঁত টিকিয়ে রাখাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
শাড়ি ব্যবসায়ী ওকিল খানের বক্তব্যেও একই সংকটের প্রতিফলন- মেশিনে কম সময়ে কম খরচে শাড়ি তৈরি হচ্ছে, আর দেশীয় তাঁতিদের হাতে একই পণ্য তৈরি করতে বেশি সময় ও শ্রম লাগছে।
এখানেই সামনে আসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন- একটি শতবর্ষী শিল্প যখন ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে যাচ্ছে, তখন রাষ্ট্রের দায়িত্ব কোথায়?
সরকারি উদ্যোগে বেনারসিপল্লি তৈরি করাই যদি শেষ কথা হয়, কিন্তু সেখানে কারখানা চালু রাখা, তাঁতিদের অর্থায়ন, আধুনিকায়ন, প্রশিক্ষণ, বিপণন ও বাজার সম্প্রসারণ নিশ্চিত না করা হয়, তাহলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য কতটা সফল হয়েছে- সেই প্রশ্ন এড়ানোর সুযোগ নেই।
ঈশ্বরদীর অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, শুধু জমি ও প্লট বরাদ্দ করলেই একটি শিল্প টিকে থাকে না। শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে প্রয়োজন পরিকল্পিত নীতি, নিয়মিত তদারকি, সহজ অর্থায়ন, প্রযুক্তি সহায়তা এবং বাজার সুরক্ষা।
এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে সরকারকে জরুরি ভিত্তিতে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা নিতে হবে। অব্যবহৃত প্লটগুলোর কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাঁতিদের সহজ শর্তে ঋণ, আধুনিক তাঁত ও প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, ডিজাইন উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
একই সঙ্গে দেশীয় বেনারসির জন্য শক্তিশালী ব্র্যান্ডিং, অনলাইন বিপণন, সরকারি-বেসরকারি ক্রয় এবং দেশীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারণের উদ্যোগ প্রয়োজন। আমদানি করা শাড়ির সঙ্গে প্রতিযোগিতায় দেশীয় শিল্পকে কীভাবে টেকসই করা যায়, সেটিও নীতিনির্ধারকদের গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে হবে।
ঈশ্বরদীর বেনারসিপল্লির বর্তমান চিত্র তাই কেবল একটি শিল্পের মন্দার গল্প নয়; এটি সরকারি অর্থে গড়ে ওঠা একটি সম্ভাবনাময় প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা ও তদারকি নিয়ে বড় প্রশ্নেরও প্রতিচ্ছবি।
একসময় যে তাঁতের শব্দ ঈশ্বরদীর পরিচয় বহন করত, সেই শব্দ আজ ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে শুধু কয়েকটি কারখানাই বন্ধ হবে না- হারিয়ে যেতে পারে শত বছরের কারিগরি জ্ঞান, ঐতিহ্য এবং হাজারো পরিবারের জীবিকার ভিত্তি।


