আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
জোনায়েদ সাকী।বাংলাদেশের অন্যতম ‘প্রতিক্রিয়াশীল’ সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী নাম। তার জীবনজুড়ে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দামামার উপস্থাপন। গত দেড়দশকে যারা বাংলাদেশের রাজনীতির মাঠের ‘টুকটাক’ খবর রাখতেন, তারাও জানেন লোকবল কম থাকলেও জোনায়েদ সাকী আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী সামনের সারির মুখ! যে শেখ হাসিনা আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদ অপচাহনিকে রক্তাভায় ফিরিয়েছেন বারবার, সেই কূটচালে শেখ হাসিনা ক্ষমতাও হারিয়েছেন, জোনায়েদ সাকীদের উচ্চারণে শেখ হাসিনাও ছিলেন ‘ফ্যাসিস্ট’! আজ ক্ষমতার সুবাতাসের বাতাবরণে জোনায়েদ সাকী আমেরিকার পরম ‘বন্ধু’, উপস্থিত আমেরিকার প্রজাতন্ত্র দিবসে!
রাজনীতির সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ ক্ষমতা নয়, জনপ্রিয়তাও নয়; সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ হলো বিশ্বাসযোগ্যতা। একজন রাজনীতিকের কথার সঙ্গে কাজের মিল যত দৃঢ় হয়, জনগণের আস্থাও তত গভীর হয়। কিন্তু যখন দীর্ঘদিনের উচ্চারিত আদর্শ ও বাস্তব আচরণের মধ্যে দৃশ্যমান ফারাক তৈরি হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে, বিতর্ক জন্ম নেয় এবং সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দায়ও সংশ্লিষ্ট রাজনীতিকের ওপরই বর্তায়।
বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতির পরিচিত মুখ জোনায়েদ সাকী বহু বছর ধরে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী রাজনীতির অন্যতম সোচ্চার কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচিত। তাঁর বক্তৃতা, বিবৃতি, মিছিল কিংবা আন্দোলনের ভাষ্যে যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক আধিপত্য, পররাষ্ট্রনীতি এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তারকে কঠোর ভাষায় সমালোচনা করা হয়েছে। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে ছিল সাম্রাজ্যবাদবিরোধিতা, এমনটাই তাঁর সমর্থক ও সমালোচক উভয় পক্ষই স্বীকার করেন।
কিন্তু সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ২৫০তম স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ঢাকায় মার্কিন দূতাবাস আয়োজিত অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর আমাদের ভাবতে হয় জোনায়েদ সাকীদের এমন চারিত্রিক দ্বিচারিতা এবং রাজনৈতিক ‘লাম্পট্য’ নিয়ে! যিনি দীর্ঘদিন যুক্তরাষ্ট্রের আধিপত্যবাদকে রাজনৈতিক বক্তব্যের অন্যতম প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছেন, তাঁর এমন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
প্রশ্নটি কেবল একটি অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়া নিয়ে নয়; প্রশ্নটি রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা ও নৈতিক সামঞ্জস্য নিয়ে। কারণ রাজনীতিতে প্রতীকী কর্মকাণ্ডেরও বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। একজন নেতার উপস্থিতি, অনুপস্থিতি কিংবা নীরবতা, সবকিছুরই রাজনৈতিক বার্তা থাকে। সেই কারণেই যদি কোনো নেতা সারাজীবন একটি (অপ)শক্তির বিরুদ্ধে সংগ্রামের আহ্বান জানান, আর পরবর্তীতে সেই (দৃঢ়!)শক্তির আনুষ্ঠানিক আয়োজনে অংশ নেন, তাহলে জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হওয়াই স্বাভাবিক।
তবে এখানেই মূল প্রশ্নটি ফিরে আসে, যদি এই উপস্থিতি কেবল কূটনৈতিক সৌজন্য হয়, তবে দীর্ঘদিন ধরে যে রাজনৈতিক ভাষ্য নির্মিত হয়েছে, তার সঙ্গে এই বাস্তবতার সম্পর্ক কী? জনগণের সামনে কি সেই ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে? রাজনীতিতে নীরবতা অনেক সময় বক্তব্যের চেয়েও বেশি প্রশ্ন তৈরি করে।
আদর্শভিত্তিক রাজনীতির সবচেয়ে বড় শক্তি হলো নৈতিক দৃঢ়তা। জনগণ এমন রাজনীতিককেই সম্মান করে, যিনি সুবিধা-অসুবিধা নির্বিশেষে নিজের ঘোষিত নীতিতে অবিচল থাকেন। আর যখন সেই অবস্থানে পরিবর্তন আসে, তখন সেই পরিবর্তনের কারণও জনগণের জানার অধিকার রয়েছে। কারণ গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে নেতৃত্বের বৈধতা কেবল নির্বাচনে নয়, জবাবদিহিতার মধ্য দিয়েও প্রতিষ্ঠিত হয়।
আজকের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আদর্শের ভাষা অনেক সময় বাস্তব রাজনীতির কৌশলের কাছে নতি স্বীকার করে। কিন্তু সেই আপস যদি ব্যাখ্যাহীন থাকে, তবে তা রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতায় আঘাত হানতে পারে। জনগণ তখন প্রশ্ন তোলে, এতদিনের কঠোর বক্তব্য কি ছিল নিছক রাজনৈতিক স্লোগান, নাকি বাস্তবতার চাপে আদর্শের পুনর্ব্যাখ্যা?
জোনায়েদ সাকীকে ঘিরে এই বিতর্ক তাই শুধু একজন ব্যক্তিকে নিয়ে নয়; এটি বাংলাদেশের আদর্শভিত্তিক রাজনীতির সামগ্রিক বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একজন রাজনীতিকের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ প্রতিপক্ষকে পরাজিত করা নয়, বরং নিজের ঘোষিত আদর্শের প্রতি জনগণের আস্থা অটুট রাখা।
শেষ পর্যন্ত রাজনীতির আদালতে সবচেয়ে কঠোর বিচারক কোনো দল, কোনো রাষ্ট্র বা কোনো প্রতিষ্ঠান নয়; সেই বিচারক হলো জনগণ। আর জনগণ সবসময়ই দেখতে চায়, একজন নেতার কণ্ঠে উচ্চারিত আদর্শ তাঁর পদচারণাতেও প্রতিফলিত হচ্ছে কিনা! কথার সঙ্গে কাজের এই সামঞ্জস্যই একজন রাজনীতিকের প্রকৃত পরিচয় নির্মাণ করে, যেখানে জোনায়েদ সাকী ‘শ্যামেও আছি, কূলেও আছি’ তত্ত্বে আছেন যা রাজনৈতিক কপটতা, অনাদর্শিক অসভ্যতা এবং গোলামীর অন্তঃরুপ।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক


