যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান সংঘাত, একের পর এক নিষেধাজ্ঞা এবং স্থবির কূটনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যেই ভয়াবহ চাপের মুখে পড়েছে ইরানের অর্থনীতি। মার্কিন ডলারের বিপরীতে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দর ইতিহাসের সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। তেহরানের খোলা বাজারে প্রথমবারের মতো এক মার্কিন ডলারের দাম ২০ লাখ রিয়াল ছাড়িয়েছে।

সোমবার (২৪ আগস্ট) ইরানি গণমাধ্যমের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে। রিয়ালের এই নজিরবিহীন দরপতন দেশটির দীর্ঘদিনের অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করে তুলেছে। বিশেষ করে খাদ্য, ওষুধ, জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল আমদানির ব্যয় বাড়ার আশঙ্কায় সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

সপ্তাহের শুরুতেও খোলা বাজারে এক ডলারের বিনিময়ে প্রায় ১৮ লাখ ৬৫ হাজার রিয়াল পাওয়া যাচ্ছিল। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে রিয়ালের মূল্য আরও ৭ শতাংশের বেশি কমে যাওয়ায় মুদ্রাবাজারে অস্থিরতা তীব্র হয়েছে।

রিয়ালের ওপর চাপ বৃদ্ধির পেছনে যুক্তরাষ্ট্রের ধারাবাহিক নিষেধাজ্ঞা, তেল রপ্তানিতে অনিশ্চয়তা, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বাধা এবং দেশটির অভ্যন্তরে ডলার ও সোনার বাড়তি চাহিদা বড় ভূমিকা রাখছে। অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার সময়ে ইরানিরা নিজেদের সম্পদ রক্ষা করতে বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণের দিকে ঝুঁকছেন, যা রিয়ালের ওপর আরও চাপ তৈরি করছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে উত্তেজনার মধ্যেই নতুন করে অর্থনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে ওয়াশিংটন। ১৭ জুনের সমঝোতা স্মারকের ৬০ দিনের সময়সীমা শেষ হওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের সমুদ্রবন্দর ও তেল খাতকে ঘিরে নতুন বিধিনিষেধ আরোপ করেছে এবং তেলবাণিজ্যসংক্রান্ত কিছু ছাড়ও বাতিল করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় তেহরানও কঠোর অবস্থান নিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার না করলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। ফলে মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারেও নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়নের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়তে পারে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায়। ইরানের আমদানিনির্ভর পণ্যগুলোর মূল্য রিয়ালের দুর্বলতার কারণে আরও বেড়ে যেতে পারে। খাদ্য ও ওষুধ থেকে শুরু করে শিল্পের কাঁচামাল এবং বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যের আমদানি ব্যয় বাড়লে বাজারে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

একই সঙ্গে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যের দাম বাড়ানোর ইঙ্গিতও দিয়েছে সরকার। এতে মূল্যস্ফীতি আরও বাড়তে পারে এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

অর্থনৈতিক সংকট ঘনীভূত হওয়ায় সরকারের ওপরও রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। রিয়ালের রেকর্ড দরপতন ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধিকে কেন্দ্র করে সরকারের সমালোচনা জোরদার হয়েছে। প্রবাসে থাকা ইরানের সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভিও জনগণকে সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version