একদিকে উৎপাদন নেই, আয় নেই, অন্যদিকে প্রতি মাসে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে শুধু নিরাপত্তা, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রশাসনিক কার্যক্রম চালাতে। সিরাজগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী জাতীয় জুট মিল এখন যেন রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থাপনা ও নীতিগত ব্যর্থতার এক জীবন্ত প্রতীক। বছরের পর বছর বন্ধ থাকা এই পাটকলের পেছনে সরকারের ব্যয় হচ্ছে বছরে ৮ কোটিরও বেশি টাকা, অথচ মিল থেকে সরকারের কোনো রাজস্ব বা আয় আসছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, শিল্প খাত পুনরুজ্জীবনের কার্যকর পরিকল্পনার অভাব, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং রাজনৈতিক সিদ্ধান্তহীনতার কারণে জাতীয় জুট মিল আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে। এর ফলে শুধু একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং হাজারো শ্রমিক, পাটচাষি, ব্যবসায়ী ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট মানুষের জীবন-জীবিকাও ভয়াবহ সংকটের মুখে পড়েছে।

বর্তমানে বন্ধ থাকা মিলটির মরিচা ধরা যন্ত্রপাতি, কোটি কোটি টাকার মেশিনারি ও স্থাপনা রক্ষণাবেক্ষণের জন্য ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের বেতন-ভাতা, বিদ্যুৎ বিল ও অন্যান্য খাতে প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। অর্থাৎ উৎপাদন শূন্য হলেও জনগণের করের অর্থ থেকে নিয়মিত কোটি কোটি টাকা খরচ হচ্ছে।

সিরাজগঞ্জ পৌরসভার রায়পুর এলাকায় ১৯৬০ সালে ৭৫ একর জায়গাজুড়ে প্রতিষ্ঠিত হয় এই জুট মিল। পরবর্তীতে জাতীয়করণের মাধ্যমে এটি ‘জাতীয় জুট মিল’ নামে পরিচিতি লাভ করে। একসময় দেশের অন্যতম লাভজনক পাটকল হিসেবে পরিচিত এই প্রতিষ্ঠানটি দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাবে ধীরে ধীরে লোকসানে পড়ে। অবশেষে ২০০৭ সালে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়।

শ্রমিকদের দীর্ঘ আন্দোলনের মুখে ২০১১ সালে পুনরায় চালু হলেও স্থায়ী সমাধান না হওয়ায় ২০২০ সালের ১ জুন আবারও বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরে ২০২২ সালে একটি বেসরকারি শিল্পগোষ্ঠী লিজ নিয়ে আংশিক উৎপাদন শুরু করলেও শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বকেয়া রেখেই ২০২৪ সালে প্রতিষ্ঠানটি ছেড়ে চলে যায়। এরপর থেকে মিলটি কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের দাবি, শিল্প পুনরুদ্ধারে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ না নেওয়ায় বর্তমান বিএনপি সরকারের শিল্পনীতি ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের মতে, একটি সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বছরের পর বছর বন্ধ রেখে জনগণের অর্থ অপচয় করা সরকারের ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ।

সাবেক শ্রমিক রতন আলী বলেন, “মিল চালু থাকলে প্রতি সপ্তাহে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা আয় করতাম। এখন ছোটখাটো কাজ আর কৃষিকাজ করে কোনোভাবে সংসার চালাতে হচ্ছে। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে আছি।”

আরেক শ্রমিক বেলাল হোসেন বলেন, “জুট মিলই ছিল আমাদের পরিবারের প্রধান আয়ের উৎস। মিল বন্ধ হওয়ার পর জীবনের সব হিসাব পাল্টে গেছে। যদি আবার চালু হয়, তাহলে পুরোনো শ্রমিকদের অগ্রাধিকার দিতে হবে।”

সিরাজগঞ্জ জেলা শ্রমিক দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি বিশা শেখ বলেন, জাতীয় জুট মিল শুধু একটি কারখানা নয়, এটি পুরো অঞ্চলের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। মিল চালু হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে, পাটচাষিরা ন্যায্যমূল্য পাবেন এবং দেশের পরিবেশবান্ধব শিল্পখাতও শক্তিশালী হবে।

জাতীয় জুট মিলের মজদুর ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি আনোয়ার হোসেন বলেন, “সরকারের উচিত দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিয়ে মিলটি চালু করা। দীর্ঘসূত্রিতা শুধু শ্রমিকদের নয়, পুরো অঞ্চলের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।”

সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির চেয়ারম্যান সাইদুর রহমান বাচ্ছু বলেন, “বর্তমান বিশ্বে পরিবেশবান্ধব পাটপণ্যের চাহিদা বাড়ছে। এমন সময়ে জাতীয় জুট মিল বন্ধ থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। দ্রুত উৎপাদন শুরু করা গেলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান হবে এবং স্থানীয় অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।”

জাতীয় জুট মিলের মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সাজ্জাদ হোসেন জানান, মিলটি বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের অধীনে রয়েছে। বর্তমানে ১৮৯ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন এবং প্রতি মাসে প্রায় ৬৫ থেকে ৭০ লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। নতুন করে লিজ দেওয়ার উদ্যোগ চলছে এবং উপযুক্ত বিনিয়োগকারী পাওয়া গেলে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

জাতীয় জুট মিলের বর্তমান অবস্থা দেশের রাষ্ট্রীয় শিল্প ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা ও দীর্ঘদিনের নীতিগত সংকটের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। সময়মতো কার্যকর উদ্যোগ না নেওয়ায় কোটি কোটি টাকার সম্পদ যেমন নষ্ট হচ্ছে, তেমনি কর্মহীন হয়ে পড়া হাজারো পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে। দ্রুত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে একসময়ের গৌরবময় এই শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতিহাসের পাতায় হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version