বিদ্যুৎ নয়, রাসায়নিক সংকেতে হিসাব করবে কোষ-ভবিষ্যতে গাছের শরীরেই বসতে পারে এমন সার্কিট

কম্পিউটারের সার্কিটে তথ্যের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে ট্রানজিস্টর। এবার সেই ধারণাকেই জীবন্ত কোষের মধ্যে নিয়ে গেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (MIT)-এর গবেষকেরা। তাঁরা জেনেটিকভাবে পরিবর্তিত ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করে এমন এক ধরনের ‘জীবন্ত ট্রানজিস্টর’ ও কম্পিউটিং সার্কিট তৈরি করেছেন, যা বিদ্যুতের পরিবর্তে রাসায়নিক সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে হিসাব করতে পারে।

গবেষকেরা Pantoea agglomerans নামের একটি ব্যাকটেরিয়াকে জেনেটিকভাবে পরিবর্তন করে দুটি ভিন্ন ধরনের ট্রানজিস্টরের মতো কোষ তৈরি করেন। এর সঙ্গে আরও তিন ধরনের ব্যাকটেরিয়াকে ‘রিলে’ হিসেবে ব্যবহার করে মোট পাঁচ ধরনের কোষ দিয়ে গড়ে তোলা হয় জীবন্ত সার্কিট। এসব কোষ একে অন্যের কাছে নির্দিষ্ট রাসায়নিক সংকেত পাঠিয়ে তথ্য আদান-প্রদান করতে পারে।

প্রচলিত কম্পিউটারের ট্রানজিস্টর যেখানে বৈদ্যুতিক সংকেতের প্রবাহ চালু বা বন্ধ করে, সেখানে এই নতুন ব্যবস্থায় জীবন্ত কোষ রাসায়নিক অণুর সংকেত নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ, একটি কোষ থেকে উৎপন্ন সংকেত পরবর্তী কোষকে সক্রিয় বা নিষ্ক্রিয় করতে পারে- এভাবেই তৈরি হচ্ছে এক ধরনের জৈবিক লজিক সার্কিট।

গবেষকেরা ব্যাকটেরিয়াগুলোকে আগার বা জেলজাতীয় মাধ্যমের ওপর নির্দিষ্ট বিন্যাসে বৃদ্ধি করিয়ে অনেকটা ‘ছাপার’ মতো করে সার্কিট তৈরি করেছেন। এমনকি তাঁরা ২৪টি ব্যাকটেরিয়া কলোনি নিয়ে একটি কম্পিউটিং সার্কিটও তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন।

এই জীবন্ত সার্কিট একাধিক ইনপুট থেকে আসা রাসায়নিক সংকেত একসঙ্গে প্রক্রিয়া করতে পারে। গবেষণায় ডেমাল্টিপ্লেক্সার, হাফ অ্যাডার এবং ফুল অ্যাডারের মতো প্রচলিত কম্পিউটিংয়ের মৌলিক ব্যবস্থা তৈরির সক্ষমতাও দেখানো হয়েছে। ফলে ভবিষ্যতে জীবন্ত কোষকে শুধু জৈবিক উপাদান হিসেবে নয়, বরং তথ্য প্রক্রিয়াকরণকারী উপাদান হিসেবেও ব্যবহারের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।

তবে এই প্রযুক্তি এখনই প্রচলিত কম্পিউটারের বিকল্প হয়ে উঠছে না। এর অন্যতম বড় সীমাবদ্ধতা হলো গতি। একটি হিসাব সম্পন্ন করতেই প্রায় আট ঘণ্টা সময় লাগে। ফলে দ্রুতগতির গণনা বা প্রচলিত কম্পিউটিংয়ের কাজে এর ব্যবহার বাস্তবসম্মত নয়।

গবেষকদের লক্ষ্যও অবশ্য প্রচলিত কম্পিউটারকে প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং তাঁরা এমন জীবন্ত ব্যবস্থা তৈরি করতে চান, যা নিজের চারপাশের পরিবেশের পরিবর্তন শনাক্ত করে সেই অনুযায়ী স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতিক্রিয়া জানাতে পারবে।

ভবিষ্যতে উদ্ভিদের শিকড়, পাতা কিংবা অন্যান্য জীবন্ত টিস্যুর মধ্যে এ ধরনের জৈবিক সার্কিট বসানোর সম্ভাবনাও দেখছেন গবেষকেরা। কোনো উদ্ভিদে খরা, রোগ বা পরিবেশগত চাপের সংকেত দেখা দিলে সেই সংকেত শনাক্ত করে নির্দিষ্ট জৈবিক প্রতিক্রিয়া সক্রিয় করা যেতে পারে- এমন সম্ভাবনাই এখন গবেষণার অন্যতম আকর্ষণীয় দিক।

তবে এসব প্রয়োগ এখনো গবেষণা ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার পর্যায়ে রয়েছে। তবু জীবন্ত ব্যাকটেরিয়াকে ব্যবহার করে ট্রানজিস্টর ও কম্পিউটিং সার্কিটের মতো ব্যবস্থা তৈরির এই উদ্যোগ জীববিজ্ঞান, জেনেটিক প্রকৌশল ও কম্পিউটিং প্রযুক্তির সংযোগে নতুন এক দিগন্তের ইঙ্গিত দিচ্ছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version