নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলায় অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের জন্য সরকারের মানবিক সহায়তার তালিকায় এক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার স্ত্রী ও নিকটাত্মীয়দের নাম অন্তর্ভুক্ত করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগের পর উপজেলা প্রশাসন তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন করেছে এবং অভিযুক্ত দুই কর্মকর্তাকে শোকজের পাশাপাশি অন্য ইউনিয়নে বদলি করা হয়েছে।

চলতি বছরের অতিবৃষ্টিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার জন্য সরকারের পক্ষ থেকে কলমাকান্দা উপজেলার আটটি ইউনিয়নের মোট ৬ হাজার ৩২০ জন কৃষককে প্রণোদনা দেওয়ার তালিকা প্রস্তুত করা হয়। এর মধ্যে পোগলা ইউনিয়নের ৬৮৭ জন কৃষকের নাম অন্তর্ভুক্ত ছিল। গত ১৭ জুন প্রথম ও দ্বিতীয় কিস্তির সহায়তা একসঙ্গে বিতরণ করা হয়। প্রত্যেক কৃষককে ৬ হাজার টাকা নগদ অর্থ ও ৩০ কেজি চাল দেওয়া হয়।

পোগলা ইউনিয়নের ১ থেকে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের রামনাথপুর ও সুনই ব্লকের দায়িত্বে থাকা উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহিনুর আলম প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে নিজের স্ত্রী, পরিবারের সদস্য ও নিকট আত্মীয়দের নাম সরকারি সহায়তার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করেন। এ কাজে তাকে সহযোগিতা করেছেন একই ইউনিয়নের ৬ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা আরেক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. নূর খান।

এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে গত রোববার পাবই গ্রামের বঞ্চিত কৃষকেরা নেত্রকোনা-১ আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগপত্রে মো. নুরে আলমসহ ২৪ জন কৃষক স্বাক্ষর করেন।

তালিকায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা শাহিনুর আলমের স্ত্রী শাহিনুর আক্তারের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি স্বামীর নামের পরিবর্তে বাবার নাম আবু সিদ্দিক ব্যবহার করে তালিকায় স্থান পান। এছাড়া শাহিনুর আলমের বড় ভাই রফিকুল আলমের স্ত্রী তৌহিদা খাতুনের নামও তালিকায় রয়েছে। একই সঙ্গে তাদের অন্তত ১৫ জন নিকটাত্মীয়ের নামও সরকারি সহায়তা গ্রহণকারীদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী মো. নুরে আলম বলেন, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। অতীতেও বিভিন্ন কৃষি প্রণোদনা, বিনামূল্যে সার ও বীজ বিতরণের ক্ষেত্রেও একই ধরনের স্বজনপ্রীতির অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রকৃত কৃষকেরা বারবার সরকারি সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহিনুর আলমের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। অপরদিকে মো. নূর খানের মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।

পোগলা ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য সবুজ মিয়া বলেন, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে শাহিনুর আলমের কাছ থেকে এমন আচরণ প্রত্যাশিত নয়। প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাদ দিয়ে পরিবারের সদস্যদের নাম অন্তর্ভুক্ত করা অত্যন্ত দুঃখজনক।

পোগলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে থাকা উপজেলা যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, তদন্তে অনিয়ম বা স্বজনপ্রীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সরকারের সহায়তা যেন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের কাছেই পৌঁছায়, সেটিই প্রশাসনের মূল লক্ষ্য।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, তালিকায় উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তার স্ত্রীর নাম থাকার বিষয়টি জানার পর তাৎক্ষণিকভাবে সেই নাম বাদ দেওয়া হয়েছে এবং সেখানে একজন প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এছাড়া বরাদ্দের অর্থ ফেরত এনে প্রকৃত কৃষকের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এরই মধ্যে শাহিনুর আলমকে লেঙ্গুড়া ইউনিয়নে এবং নূর খানকে বড়খাপন ইউনিয়নে বদলি করা হয়েছে। পাশাপাশি দুজনকেই শোকজ করা হয়েছে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এসএম মিকাইল ইসলাম বলেন, অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সাইফুল ইসলামকে প্রধান করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version