ডিসেম্বরের মধ্যে দেশে ফেরার ঘোষণা সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ; বিএনপি সরকারের নীতি, অর্থনীতি ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে তীব্র প্রশ্ন

ভারতের সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস-কে দেওয়া এক টেলিফোন সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, তাঁর দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত ক্ষমতায় ফেরার জন্য নয়; বরং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য। তিনি জানান, আগামী ডিসেম্বরের মধ্যেই দেশে ফেরার ইচ্ছা রয়েছে এবং উপযুক্ত সময়ে ফেরার নির্দিষ্ট তারিখ, সময় ও প্রবেশপথ ঘোষণা করবেন।

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তাঁর প্রত্যর্পণ নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের অবস্থান, বিএনপি সরকারের নীতি, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস ও সার সংকট, চীনের কাছ থেকে যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ এবং বাংলাদেশের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক প্রশ্ন তোলেন।

‘প্রত্যর্পণ নয়, নিজের দেশেই ফিরব’

বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে তাঁর প্রত্যর্পণকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরের সঙ্গে যুক্ত করার বিষয়ে প্রশ্ন তুলে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি কোনো চুক্তির আওতায় প্রত্যর্পণের মাধ্যমে নয়, নিজের ইচ্ছায় দেশে ফিরতে চান।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক সংকট অনির্দিষ্টকাল চলতে পারে না। তাঁর ভাষায়, ‘আমি নিজের দেশে, নিজের মানুষের কাছে ফিরব। সারা জীবন বিদেশে থাকতে পারি না।’

শেখ হাসিনার দাবি, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার, নির্যাতন ও বাড়িঘরে হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। তাঁর অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একটি ভীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।

অর্থনীতি ও উন্নয়ন নিয়ে বিএনপি সরকারকে প্রশ্ন

সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা তাঁর সরকারের সময়ের অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনা করেন। তাঁর দাবি, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার প্রায় ৭০ বিলিয়ন ডলার থেকে ৪৫০ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল এবং মাথাপিছু আয় ৪৮২ ডলার থেকে ২ হাজার ৭৮৪ ডলারে পৌঁছেছিল।

তবে তাঁর অভিযোগ, বর্তমানে প্রবৃদ্ধি কমে গেছে, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানে সংকট তৈরি হয়েছে এবং বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকট আবারও ফিরে এসেছে।

শেখ হাসিনা বলেন, এটি শুধু আওয়ামী লীগের সমস্যা নয়; বরং এটি বাংলাদেশের জাতীয় সংকট। উন্নয়ন থেমে গেলে কর্মসংস্থান কমে যায়, আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হলে মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় এবং উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো সুযোগ পেলে তা পুরো অঞ্চলের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে।

‘বিদ্যুৎ-গ্যাস নেই, সার কারখানা বন্ধ- তাহলে যুদ্ধবিমান কেন?’

চীনের কাছ থেকে প্রায় ২ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারে জে-১০সিই যুদ্ধবিমান কেনার উদ্যোগ নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন শেখ হাসিনা।

তিনি দাবি করেন, তাঁর সরকারের সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে উন্নীত করা হয়েছিল এবং দেশের সব ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে জ্বালানি সংকটের কারণে মানুষ বিদ্যুৎ পাচ্ছে না এবং গ্যাসের অভাবে দেশের ছয়টি সার কারখানার মধ্যে পাঁচটি বন্ধ রয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।

এমন পরিস্থিতিতে বিপুল অর্থ ব্যয়ে যুদ্ধবিমান কেনার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এত কঠিন পরিস্থিতিতে যুদ্ধবিমান কেনার এই বিলাসিতা কেন- এটাই আমার প্রশ্ন।’

তিস্তা প্রকল্প ও চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা নিয়েও উদ্বেগ

তিস্তা নদী প্রকল্পে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতার বিষয়ে তাঁর সরকারের সময় আলোচনা হয়েছিল বলে জানান শেখ হাসিনা। বর্তমানে বাংলাদেশ চীনের সঙ্গে এ প্রকল্পে কাজ করছে- এ বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমান সরকার কী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে, সে বিষয়ে তাঁর মন্তব্য করার কিছু নেই। তবে প্রতিরক্ষা সহযোগিতায় চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান ঘনিষ্ঠতা নিয়েও সাক্ষাৎকারে আলোচনা করেন তিনি।

বাংলাদেশ ‘আরেক পাকিস্তানের’ পথে- নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কবার্তা

বাংলাদেশের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে শেখ হাসিনা তাঁর ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের দেওয়া ‘আরেক পাকিস্তান’ মন্তব্যের ব্যাখ্যাও দেন। তিনি বলেন, এই মন্তব্য সাধারণ পাকিস্তানি জনগণকে বোঝায় না; বরং উগ্রবাদ, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা ও দুর্বল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ঝুঁকিকে বোঝায়।

শেখ হাসিনার দাবি, বাংলাদেশে উগ্রবাদী ও সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক ফের সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। তিনি আল-কায়েদার ভারতীয় উপমহাদেশ শাখা (AQIS)-এর সম্ভাব্য তৎপরতা নিয়েও সতর্ক করেন।

তাঁর ভাষ্য, সন্ত্রাসবাদ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতা দুর্বল হলে এর প্রভাব শুধু বাংলাদেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; ভারত, মিয়ানমার, বঙ্গোপসাগর, আঞ্চলিক বাণিজ্য, অভিবাসন ও সামগ্রিক দক্ষিণ এশীয় নিরাপত্তার ওপরও পড়তে পারে।

আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা

আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্তেরও তীব্র সমালোচনা করেছেন শেখ হাসিনা। তাঁর প্রশ্ন, কোনো রাজনৈতিক দল ভুল করলে তার বিচার জনগণের ভোটে হওয়া উচিত- দল নিষিদ্ধ করে নয়।

তিনি দাবি করেন, আওয়ামী লীগ একটি ঐতিহাসিক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, যার শিকড় সাধারণ মানুষের মধ্যে। তাঁর বক্তব্য, দলকে নিষিদ্ধ করা হলেও আওয়ামী লীগের জনসমর্থন ও রাজনৈতিক অস্তিত্ব মুছে ফেলা যাবে না।

শেখ হাসিনা আরও দাবি করেন, দলের বিপুলসংখ্যক নেতা-কর্মী মামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের মুখে রয়েছেন এবং অনেকেই দেশ ছেড়ে বা আত্মগোপনে থাকতে বাধ্য হয়েছেন।

‘আমার ফেরার বিষয়টি ক্ষমতার নয়’

নিজের নিরাপত্তা ও দেশে ফেরার প্রসঙ্গে শেখ হাসিনা বলেন, তাঁর বিরুদ্ধে অসংখ্য মামলা করা হয়েছে এবং দেশে ফেরার পর গ্রেপ্তার বা প্রাণনাশের আশঙ্কার কথাও তিনি আগে বলেছেন।

১৯৭৫ সালে পরিবারের অধিকাংশ সদস্যকে হারানো, পরবর্তী সময়ে সামরিক শাসন ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র এবং ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এসব হুমকি তাঁকে দায়িত্ব থেকে সরাতে পারেনি।

শেষ পর্যন্ত নিজের অবস্থান স্পষ্ট করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন নই। আমার দেশে ফেরা ক্ষমতার জন্য নয়- মানুষের পাশে দাঁড়ানোর জন্য।’

তিনি জানান, বাংলাদেশে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের এবং এ বিষয়ে দলের নেতাদের সঙ্গেও রাজনৈতিক আলোচনা চলছে। তবে নেতা-কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হবে।

‘আমার মন পড়ে থাকে বাংলাদেশে’

ভারতে অবস্থানকাল সম্পর্কে শেখ হাসিনা বলেন, তিনি ভারতের সরকার ও জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞ। তবে নিজের দেশের মানুষের কাছ থেকে দূরে থাকা তাঁর জন্য সবচেয়ে কঠিন।

তিনি জানান, বাংলাদেশে প্রতিদিনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, দলের নেতা-কর্মীদের অবস্থা, অর্থনীতি, আইনশৃঙ্খলা, সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা এবং তরুণদের হতাশার খবর তিনি নিয়মিত অনুসরণ করেন।

সাক্ষাৎকারের শেষদিকে বাংলাদেশের মানুষের প্রতি নিজের টানের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, দেশের মানুষ, তাদের মুখ, ভাষা, সরল বিশ্বাস এবং বাংলার মাটিই তিনি সবচেয়ে বেশি মিস করেন। তাঁর আকাঙ্ক্ষা- ভয় নয়, আশা ও উন্নয়নের পথে এগিয়ে যাওয়া একটি বাংলাদেশে ফিরে যাওয়া।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version