গাজায় যুদ্ধের ভয়াবহতা শুধু বোমা, ক্ষেপণাস্ত্র আর ধ্বংস হওয়া ভবনের গল্প নয়; ধ্বংসস্তূপের নিচে বছরের পর বছর চাপা পড়ে থাকা মরদেহগুলোও সেই নির্মমতার নীরব সাক্ষ্য বহন করছে। প্রায় তিন বছর আগে ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যাওয়া একটি পারিবারিক বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে একে একে ২১ জন স্বজনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন গাজা সিভিল ডিফেন্সের এক কর্মী- যিনি নিজেও হারিয়েছেন পরিবারের সদস্যদের।
২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর ইসরায়েলি হামলায় বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায়। হামলার পর সেখানে থাকা পরিবারের সদস্যরা ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়েন। কিন্তু যুদ্ধের তীব্রতা, উদ্ধার সরঞ্জামের সংকট এবং অব্যাহত নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে দীর্ঘ সময় ধরে তাদের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
অবশেষে প্রায় তিন বছর পর শুরু হয় সেই মর্মান্তিক উদ্ধার অভিযান। ধ্বংসস্তূপ সরাতে গিয়ে উদ্ধারকর্মীরা একে একে বের করে আনেন পরিবারের সদস্যদের মরদেহ। উদ্ধারকারীদের মধ্যে ছিলেন নিহতদেরই একজন স্বজন, গাজা সিভিল ডিফেন্সের এক কর্মী। নিজের পরিবারের সদস্যদের মরদেহ নিজ হাতে ধ্বংসস্তূপ থেকে তুলে আনার এই দৃশ্য গাজার যুদ্ধের মানবিক বিপর্যয়ের ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে।
গাজায় ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনও বহু মানুষের মরদেহ পড়ে থাকার আশঙ্কা রয়েছে। উদ্ধারকারী দলগুলো জানিয়েছে, প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি, জ্বালানি ও অন্যান্য সরঞ্জামের তীব্র সংকটের কারণে ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের মরদেহ উদ্ধার করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। এর আগেও ধ্বংস হওয়া বাড়িঘর থেকে একই পরিবারের বহু সদস্যের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এদিকে যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকার পরও গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও সামরিক অভিযান অব্যাহত থাকার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সাম্প্রতিক দিনগুলোতেও বিমান হামলায় হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। ৩১ আগস্ট ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত পাঁচ ফিলিস্তিনি নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে রয়টার্স; হামলার পরও দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধবিরতি নিয়ে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ অব্যাহত রয়েছে।
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, একদিনে নতুন করে ৮ জন নিহত এবং ৩১ জন আহত হওয়ার পর ২ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে চলমান সংঘাতে গাজায় নিহতের সংখ্যা দাঁড়ায় ৭৩ হাজার ৪৭০ জনে।
যুদ্ধবিরতি শুরু হওয়ার পরও ইসরায়েলি অভিযানে গাজায় ১ হাজার ৩০০-এর বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ইসরায়েল দাবি করছে, তাদের সামরিক অভিযান হামাসের কর্মকাণ্ড ঠেকাতে পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে হামাস ও ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ইসরায়েলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলছে।
গাজার বহু এলাকায় এখনো ভবনের পর ভবন ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়ে আছে। কোথাও স্বজনেরা জানেন, তাদের প্রিয়জন নিখোঁজ; কিন্তু তারা কোথায়, তা জানার উপায় নেই। ভারী যন্ত্রপাতির অভাবে অনেক পরিবার নিজেরাই হাত দিয়ে ধ্বংসস্তূপ খুঁড়ে প্রিয়জনের দেহাবশেষ খুঁজছেন।
একজন বাবাকে নিজের ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাড়ির ধ্বংসস্তূপে মাসের পর মাস খুঁজতে দেখা গেছে- তার গর্ভবতী স্ত্রী ও পাঁচ সন্তান সেখানে নিহত হয়েছিলেন। যুদ্ধের ধ্বংসযজ্ঞে এমন অসংখ্য পরিবার এখনো প্রিয়জনের দেহাবশেষ উদ্ধারের অপেক্ষায় রয়েছে।
গাজা সিভিল ডিফেন্সের কর্মীদের জন্যও পরিস্থিতি ভয়াবহ। একদিকে তাদের দায়িত্ব হাজারো মানুষের জীবন রক্ষা করা, অন্যদিকে প্রতিদিন তাদের সামনে হাজির হচ্ছে ধ্বংস হওয়া বাড়ি, নিখোঁজ মানুষ এবং মরদেহ উদ্ধারের নির্মম বাস্তবতা। সম্প্রতি একটি ধ্বংসস্তূপ থেকে নিজের ২১ স্বজনের মরদেহ উদ্ধারে অংশ নেওয়া সেই উদ্ধারকর্মীর ঘটনা যেন পুরো গাজার বেদনারই প্রতিচ্ছবি।


