রাজশাহীর চারঘাট পৌরসভায় বর্জ্য ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের জন্য বরাদ্দ দেওয়া ৪ হাজার ৪০০ ডাস্টবিনের মধ্যে ১ হাজার ৬৬৮টির কোনো হদিস মিলছে না। বিনামূল্যে নাগরিকদের মধ্যে বিতরণের কথা থাকলেও ডাস্টবিন বিতরণে অনিয়ম, রাজনৈতিক প্রভাব, অর্থ আদায় এবং যথাযথ তদারকির অভাবের অভিযোগ উঠেছে।

২০০৪ সালের ৫ আগস্টের পর ডাস্টবিন বিতরণে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নামও উঠে এসেছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। তবে কারা কতগুলো ডাস্টবিন নিয়েছেন বা বিতরণ করেছেন, তার সুনির্দিষ্ট নথি না থাকায় বিষয়টি নিয়ে তৈরি হয়েছে নানা প্রশ্ন।

এলজিইডির নগর পরিচালন ও অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (আইইউজিআইপি) আওতায় ২০২৪ সালে চারঘাট পৌরসভায় ২০ লিটারের ৪ হাজার ছোট এবং ১২০ লিটারের ৪০০টি বড় ডাস্টবিন দেওয়া হয়। উদ্দেশ্য ছিল নাগরিকদের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি এবং পৌর এলাকার বর্জ্য সংগ্রহব্যবস্থা আরও কার্যকর করা।

কিন্তু পৌরসভার হিসাবেই দেখা যাচ্ছে বড় ধরনের অসঙ্গতি। পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, ৪০০টি বড় ডাস্টবিনের মধ্যে ২০৬টি বিতরণ করা হয়েছে। সে হিসাবে ১৯৪টি ডাস্টবিন পৌরসভার গুদামে থাকার কথা। অথচ বর্তমানে একটি বড় ডাস্টবিনও সংরক্ষিত নেই।

অন্যদিকে ৪ হাজার ছোট ডাস্টবিনের মধ্যে ৯৯২টি বিতরণ করা হয়েছে বলে পৌরসভার পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে সংরক্ষিত আছে ১ হাজার ৫৩৪টি। অর্থাৎ হিসাব অনুযায়ী ১ হাজার ৪৭৪টি ছোট ডাস্টবিনের কোনো সন্ধান নেই। বড় ডাস্টবিনের ১৯৪টি যোগ করলে মোট ১ হাজার ৬৬৮টি ডাস্টবিনের হিসাব মিলছে না।

এমনকি পৌরসভার সীমানার বাইরে নিমপাড়া ও ভায়ালক্ষ্মীপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন দোকান এবং সদরের তালবাড়িয়া এলাকার বসতবাড়িতেও এসব ডাস্টবিন ব্যবহারের দেখা মিলেছে। স্থানীয়দের দাবি, আগের সময়ে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাদের সুপারিশে যেমন কিছু ডাস্টবিন দেওয়া হয়েছে, তেমনি ৫ আগস্টের পর নতুন করে বিএনপির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কিছু ব্যক্তি ও কর্মীর সুপারিশে অর্থের বিনিময়ে ডাস্টবিন সরবরাহের অভিযোগও উঠেছে।

তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে সরকারি সম্পদ বিতরণ করা হয়ে থাকলে, সংশ্লিষ্ট যে পক্ষই হোক, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও অভিযোগ, বিনামূল্যে বিতরণের কথা থাকলেও ডাস্টবিন নিতে গিয়ে অনেকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে। ছোট ডাস্টবিনের জন্য ১০০ টাকা এবং বড় ডাস্টবিনের জন্য ৩০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন তারা।

পৌরসভার ৯ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সেলিম রেজা বলেন, ডাস্টবিন বিনামূল্যে দেওয়ার কথা থাকলেও বৈধভাবে নিতে গেলে টাকা দিতে হয়েছে। তাঁর দাবি, প্রভাবশালী অনেক ব্যক্তি কোনো টাকা না দিয়েই ডাস্টবিন নিয়ে গেছেন।

পৌর এলাকার বিভিন্ন স্থানে ঘুরে দেখা গেছে, অনেক ডাস্টবিন ময়লার স্তূপের পাশে পড়ে আছে। কোথাও সেগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না, আবার কোথাও ডাস্টবিনের চারপাশেই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আবর্জনা।

৬ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম রায়হানের অভিযোগ, কিছু মাদকাসক্ত ব্যক্তি ডাস্টবিন সংগ্রহ করে ভাঙারির দোকানে বিক্রি করছেন। অথচ সরকারি সম্পদ এভাবে নষ্ট বা বিক্রি ঠেকাতে কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।

পৌরসভার বাইরে ডাস্টবিন বিতরণের নিয়ম না থাকলেও ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন এলাকায় এগুলো কীভাবে গেল, কারা সরবরাহ করল এবং বিনামূল্যে বিতরণের সরকারি সম্পদ থেকে কারা আর্থিক সুবিধা নিল- এসব প্রশ্নের উত্তরও এখনো মেলেনি।

পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, বিতরণ করা ডাস্টবিন থেকে বর্জ্য সংগ্রহের জন্য মাসে প্রায় ২৫ হাজার টাকা আয় হচ্ছে। কিন্তু বাস্তবে ডাস্টবিন থেকে নিয়মিত বর্জ্য সংগ্রহ, পরিবহন ও স্যানিটারি ল্যান্ডফিলে ফেলার কার্যকর ব্যবস্থা চোখে পড়ছে না।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version