দেশের শিল্প ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরেছে বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)। সংস্থাটির পর্যালোচনা অনুযায়ী, নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাসে অর্থনীতির ৩১টি প্রধান সূচকের মধ্যে ১৯টিতেই অবনতি হয়েছে। একই সময়ে দেশের তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক।

সোমবার (২৪ আগস্ট) রাজধানীতে ‘নতুন সরকারের প্রথম ছয় মাস: একটি অর্থনৈতিক পর্যালোচনা’ শীর্ষক সংলাপে এসব তথ্য তুলে ধরে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির পর্যবেক্ষণে শিল্প উৎপাদন, বিনিয়োগ, রাজস্ব আদায় ও কর্মসংস্থান পরিস্থিতিতে বেশ কিছু নেতিবাচক প্রবণতা ধরা পড়েছে।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারি থেকে আগস্ট ২০২৬ সময়কালে গাজীপুর, সাভার-আশুলিয়া এবং নারায়ণগঞ্জ-নরসিংদী- এই তিন প্রধান শিল্পাঞ্চলে ৯৫টি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়েছে। এর ফলে ৬১ হাজার ৮৮১ জন সরাসরি কর্মসংস্থান হারিয়েছেন।

শিল্প খাতের এই পরিস্থিতিকে অর্থনীতির জন্য বড় সতর্কসংকেত হিসেবে দেখছে সিপিডি। প্রতিষ্ঠানটির হিসাবে, শিল্প উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ৪ শতাংশ থেকে কমে শূন্যে নেমেছে। উৎপাদন খাতের প্রবৃদ্ধিও ৩ দশমিক ৫ শতাংশ থেকে শূন্যে নেমে এসেছে।

শিল্প খাতে দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে বলে জানিয়েছে সিপিডি। মহেশখালীর এলএনজি টার্মিনালে কারিগরি সমস্যা, এলএনজি সংগ্রহ ও কার্গো গ্রহণে জটিলতার কারণে গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে টেক্সটাইল, ইস্পাত, কাগজ, পার্টিকেলবোর্ড ও সিরামিকসহ গ্যাসনির্ভর বিভিন্ন শিল্পে।

সিপিডির তথ্য অনুযায়ী, শিল্পে গ্যাসের ব্যবহার ১ হাজার ১৮৬ এমএমসি থেকে কমে ১ হাজার ১৪৮ এমএমসিতে নেমেছে। একই সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদন সূচকের প্রবৃদ্ধিও ৫ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে কমে ঋণাত্মক শূন্য দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে।

শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, বিনিয়োগ পরিস্থিতিতেও উদ্বেগ রয়েছে। সিপিডির পর্যালোচনায় দেখা যায়, নিট বিদেশি বিনিয়োগ ৬৬২ মিলিয়ন ডলার থেকে কমে ৫৯৪ মিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির এলসি খোলার প্রবৃদ্ধি ১৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে নেমে ঋণাত্মক ১৩ দশমিক ৬ শতাংশ হয়েছে।

বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধিও ৬ শতাংশ থেকে কমে ৪ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ শিল্প সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের মধ্যে সতর্কতা বাড়ছে বলে অর্থনৈতিক সূচকগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে।

সিপিডি আশঙ্কা করছে, চলতি অর্থবছরে সরকারের রাজস্ব ঘাটতি ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। বড় ধরনের রাজস্ব ঘাটতি হলে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়নেও চাপ তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সংস্থাটির হিসাবে, সরকারের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রায় ৪২ শতাংশ রাজস্ব প্রবৃদ্ধি প্রয়োজন। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন কঠিন হতে পারে বলে সতর্ক করেছে সিপিডি।

সিপিডির পর্যালোচনায় কিছু ইতিবাচক দিকও উঠে এসেছে। সার্বিক মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৮ দশমিক ৩ শতাংশ এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৭ দশমিক ২ শতাংশে নেমেছে। তবে মজুরি বৃদ্ধির হার কিছুটা বাড়লেও প্রকৃত মজুরি প্রবৃদ্ধি এখনো নেতিবাচক অবস্থায় রয়েছে। ফলে মূল্যস্ফীতি কমলেও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতায় পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি।

অন্যদিকে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ৩ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩ দশমিক ৫ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। তবে আমদানি প্রবৃদ্ধি বেড়ে ১৮ দশমিক ১ শতাংশ হওয়ায় বাণিজ্য ঘাটতি ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ১০ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে।

সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, নতুন সরকারের কাছে মানুষের বড় প্রত্যাশা ছিল অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা। তবে দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে একটি সমন্বিত তথ্যভিত্তিক দলিল না থাকায় বর্তমান অগ্রগতি মূল্যায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছে।

তিনি আরও বলেন, সংস্কার কর্মসূচিতেও সমন্বিত কর্মপরিকল্পনার ঘাটতি রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগের বিষয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিপিডি।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version