আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম
১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯। মধুর ক্যান্টিন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সেই চিরচেনা আড্ডার ভেতর হঠাৎ উচ্চারিত হলো মাত্র দুটি শব্দ। শব্দ দুটি তখনও কোনো রাষ্ট্রের নাম নয়, কোনো বিজয়ের স্মারক নয়, কোনো পতাকার সঙ্গে জড়িয়ে যায়নি। কিন্তু সেই দুটি শব্দের ভেতর যেন ঘুমিয়ে ছিল একটি ভূখণ্ডের দীর্ঘশ্বাস, একটি জাতির অপমান, একটি জনগোষ্ঠীর স্বপ্ন এবং একটি স্বাধীন দেশের অনাগত ভবিষ্যৎ। ‘জয় বাংলা।’ কে জানত, মধুর ক্যান্টিনে উচ্চারিত সেই দুটি শব্দ একদিন কোটি বাঙালির হৃদয়ের স্পন্দন হয়ে উঠবে? কে জানত, এই স্লোগান একদিন পাকিস্তানি সামরিক শাসনের বুক কাঁপিয়ে রাজপথে ছুটবে, মুক্তিযোদ্ধার মুখে উচ্চারিত হবে, রণাঙ্গনে সাহস জোগাবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের বিজয়ধ্বনিতে পরিণত হবে?
‘জয় বাংলা’ কি সেদিন হঠাৎ জন্ম নিয়েছিল? ইতিহাসের দিকে তাকালে উত্তর আসে, না। তার জন্মের পেছনে ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতি, গোপন স্বপ্ন, রাতের পর রাত চলা বৈঠক, ছাত্রদের মধ্যে স্বাধীনতার বীজ বুনে দেওয়ার এক সুদূরপ্রসারী প্রয়াস। ১৯৬৯ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর মহান শিক্ষা দিবসে ইয়াহিয়া খানের সামরিক জান্তার নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ তৎকালীন ইকবাল হল, বর্তমান সার্জেন্ট জহুরুল হক হলের মাঠে আলোচনা সভা আয়োজন করেছিল। চারদিকে তখন ভয়, উত্তেজনা আর অনিশ্চয়তার ঘন অন্ধকার। কারণ সেদিনই ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতাদের সামরিক আদালতে হাজির হওয়ার খবর দেশের সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় প্রকাশিত হয়েছিল। জহুরুল হক হলের মাঠ। বক্তৃতা করেছিলেন তোফায়েল আহমেদ, শামসুদ্দোহা, মাহবুব উল্লাহসহ অনেকে। সভা শেষ হওয়ার পর হলের ক্যান্টিনের পশ্চিম পাশে, পুকুরের পূর্বদিকে ছাত্রলীগ কর্মী আফতাবের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের কর্মী সমর্থকদের কণ্ঠে চারপাশ কেঁপে উঠেছিল, ‘জয় বাংলা।’ কিন্তু পরে রায়হান ফেরদৌস মধু ভাইয়ের কাছ থেকে জানা যায়, স্লোগানটির প্রথম উচ্চারণ হয়েছিল আরও দুদিন আগে, ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ মধুর ক্যান্টিনে।
সেদিন শিক্ষা দিবসের কর্মসূচি সফল করার জন্য ছাত্রলীগের কর্মীসভা বসেছিল। সভার এক পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আফতাব আহমেদ উচ্চারণ করেন সেই ঐতিহাসিক শব্দযুগল। কিন্তু আফতাব আহমেদ শূন্য থেকে শব্দ দুটি তুলে আনেননি। তৎকালীন ছাত্রলীগ ঢাকা শহর শাখার সংগঠক হাবিব বাবুলের বর্ণনা অনুযায়ী, সিন্ধুর জাতীয়তাবাদী নেতা জি এম সৈয়দের সংগঠন ছিল ‘জিয়ে সিন্ধ’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে পশ্চিম পাকিস্তান সফরে যাওয়া ছাত্রলীগের তৎকালীন সভাপতি আবদুর রউফ মধুর ক্যান্টিনের আড্ডায় সেই অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। ছয় দফা নিয়ে সিন্ধুর জাতীয়তাবাদী নেতাদের সঙ্গে আলোচনার প্রসঙ্গ থেকেই আফতাব আহমেদের উপলব্ধি- সিন্ধীরা যদি ‘জিয়ে সিন্ধ’ বলতে পারে, তাহলে আমরাও বলতে পারি ‘জয় বাংলা’। একটি বাক্য, অথচ তার ভেতরে ছিল একটি রাজনৈতিক দর্শনের বীজ। তবে সবাই তখন উচ্ছ্বসিত হয়নি। একটি অংশ মনে করেছিল, এটি হঠকারিতা। সামনে পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচন, আওয়ামী লীগ নির্বাচনে জয়ী হয়ে পূর্ব পাকিস্তানে সরকার গঠন করতে পারে, অতিরিক্ত স্বাধীনতাপন্থী অবস্থান হয়তো সেই সম্ভাবনাকে বিপন্ন করবে!
কিন্তু ইতিহাসের গোপন স্রোত তখন আরও অনেক দূর এগিয়ে গেছে। ১৯৬২ সাল থেকেই সিরাজুল আলম খানের নেতৃত্বে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরে গড়ে উঠেছিল গোপন সাংগঠনিক তৎপরতা- ‘নিউক্লিয়াস’, যার পূর্ণ নাম ‘স্বাধীন বাংলা বিপ্লবী পরিষদ’। ফজলুল হক হলের পুকুরপাড়ে, জহুরুল হক হলের মাঠে রাতের নীরবতায় সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও কাজী আরেফ আহমেদরা স্বাধীনতার পরিকল্পনা করতেন। দিনের আলোয় যেখানে পাকিস্তানের রাজনীতি, রাতের অন্ধকারে সেখানে জন্ম নিচ্ছিল অন্য এক ভবিষ্যতের নকশা। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কলেজ, কলেজ থেকে স্কুল, গোপনে কর্মী তৈরি হয়েছে, ছড়িয়েছে স্বাধীনতার লিফলেট, দেয়ালে লেখা হয়েছে স্বাধীনতার কথা। ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থানে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা বাতিল, বঙ্গবন্ধুসহ রাজবন্দীদের মুক্তির দাবিকে গণবিস্ফোরণে রূপ দেওয়ার আন্দোলনেও এই সংগঠিত ধারার ভূমিকা ছিল। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল ছাত্র সমাবেশে তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবুর রহমানকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধিতে ভূষিত করেন। ১৯৬৯-এর সেই গণঅভ্যুত্থান ছিল যেন স্বাধীনতার দিকে ছুটে চলা ইতিহাসের প্রথম বড় বিস্ফোরণ।
তারপর ১৯৭০-এর নির্বাচন। ছাত্রদের প্রত্যক্ষ ভোটে অনুষ্ঠিত প্রথম ডাকসু নির্বাচনে ছাত্রলীগ একটি পদ ছাড়া প্রায় সব পদে জয়ী হলো। আ স ম আবদুর রব সহসভাপতি, আবদুল কুদ্দুস মাখন সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হলেন। কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগে সভাপতি হলেন নূরে আলম সিদ্দিকী, সাধারণ সম্পাদক শাহজাহান সিরাজ। দুটি ধারা, কিছু মতপার্থক্য, কিন্তু সামনে তখন ইতিহাসের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। ১ মার্চ ১৯৭১। ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলেন। সেদিন ডাকসু ও ছাত্রলীগের চার নেতা একত্র হয়ে গঠন করলেন ‘স্বাধীন বাংলাদেশ ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ’। সেই রাতেই জহুরুল হক হলে শেখ ফজলুল হক মণি, সিরাজুল আলম খান, আবদুর রাজ্জাক ও তোফায়েল আহমেদ ছাত্রনেতাদের সঙ্গে মিলিত হলেন। এরপর মার্চের উত্তাল দিনগুলোতে স্বাধীনতার লক্ষ্যে গণআন্দোলন পরিচালিত হলো। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে সেই সাংগঠনিক ধারাই রূপ নেয় বাংলাদেশ লিবারেশন ফোর্সে, যা পরে পরিচিত হয় ”মুজিব বাহিনী” নামে।
এরপর আর শুধু স্লোগান নয়, একে একে সামনে এলো স্বাধীনতার প্রতীক ও কাঠামো। ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা মেঘনা যমুনা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘বাঁশের লাঠি তৈরি কর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ”তোমার নেতা, আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব “– স্লোগানগুলো হয়ে উঠল একটি জাতির রাজনৈতিক অভিধান। তারপর পতাকা, জাতীয় সংগীত, স্বাধীনতার ইশতেহার, সশস্ত্র প্রতিরোধ, মুক্তিযুদ্ধ। একটি জাতি রাজপথে, একটি পতাকা বাতাসে, আর মানুষের মুখে একটি শব্দ- “জয় বাংলা”। সেই শব্দ তখন আর কোনো কল্পনার শব্দ ছিল না। সীমান্তের প্রশিক্ষণ শিবির থেকে রণাঙ্গন, শহরের অন্ধকার গলি থেকে গ্রামের কাঁচা ঘর- সবখানে এটি হয়ে উঠেছিল সাহস, প্রতিরোধ, স্বপ্ন ও মুক্তির ভাষা।
আর তারপর ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১। পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর মানচিত্রে জন্ম নিল বাংলাদেশ। তখন হয়তো অনেকেই বুঝতে পারেননি, একটি স্লোগানের জন্মের মুহূর্তও কখনো কখনো একটি রাষ্ট্রের জন্মের প্রথম শব্দ হয়ে উঠতে পারে। ১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ মধুর ক্যান্টিনে আফতাব আহমেদের কণ্ঠে উচ্চারিত সেই দুটি শব্দের ভেতরে ছিল ১৯৬২-এর গোপন প্রস্তুতি, ১৯৬৯-এর গণঅভ্যুত্থান, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্ব, ছাত্রসমাজের অস্থির তারুণ্য এবং স্বাধীনতার অদম্য আকাঙ্ক্ষা। ইতিহাস কখনো কখনো কত ছোট একটি দরজা দিয়ে প্রবেশ করে, একটি ক্যান্টিন, কয়েকজন তরুণ, একটি কর্মীসভা, আর মাত্র দুটি শব্দ।
‘’জয় বাংলা।’’
সেদিন কেউ জানত না, এই শব্দ দুটির শেষ কোথায়। কিন্তু ইতিহাস জানত এই দুটি শব্দ একদিন রাজপথ কাঁপাবে, মুক্তিযোদ্ধার মুখে মৃত্যুভয়কে অস্বীকার করবে, একটি জাতিকে একত্র করবে এবং শেষ পর্যন্ত একটি স্বাধীন দেশের বিজয়ধ্বনি হয়ে উঠবে।
১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৬৯ মধুর ক্যান্টিনে যে কণ্ঠ প্রথম বলেছিল ‘জয় বাংলা’, সেই কণ্ঠ আসলে ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের দরজায় প্রথম কড়া নাড়ছিল। তারপর কেটে গেছে রক্ত, অশ্রু, আগুন আর মৃত্যুর একাত্তর। শেষ পর্যন্ত দরজা খুলেছে। ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে একটি দেশ।
“বাংলাদেশ”
আর তার জন্মের দীর্ঘ ইতিহাসের গভীরে আজও প্রতিধ্বনিত হয় সেই প্রথম ডাক-
“জয় বাংলা”
বাঙালীর মুক্তির স্লোগান, বাঙালীর আত্ত্বিক আয়ত্ত্বের মর্মধ্বজিনীর স্লোগান। বাঙালীর জন্য একটি দেশের জগন্মোহিত জন্ম-স্লোগান।
জয় বাংলা।
আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক


