বাংলাদেশের রাজনীতিতে “জামায়াতে ইসলামী” নামটি উচ্চারণ মানেই ভণ্ডামি, বিশ্বাসঘাতকতা এবং ধর্মের অপব্যবহারের এক দীর্ঘ ও অন্ধকার অধ্যায় সামনে চলে আসে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—এই দলটি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকেই জনগণের মুক্তি, স্বাধীনতা কিংবা ন্যায়বিচারের পক্ষে নয়, বরং সবসময় প্রতিক্রিয়াশীল ও ষড়যন্ত্রমূলক শক্তির ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকা, এমনকি স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রব্যবস্থার বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া—সব ক্ষেত্রেই জামায়াত প্রমাণ করেছে তারা বাংলাদেশের শত্রু, জনগণের নয়।
*প্রতিষ্ঠার শুরুতেই ভণ্ডামি:*
১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট, লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী “জামায়াতে ইসলামী হিন্দ” প্রতিষ্ঠা করেন। উদ্দেশ্য ছিল ইসলামকে কেবলমাত্র রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে একটি সংগঠন গড়ে তোলা। কিন্তু প্রতিষ্ঠার কয়েক বছরের মধ্যেই মওদুদী পাকিস্তান সরকারের নিরাপত্তা আইনে গ্রেফতার হয়ে দুই বছরের সাজা ভোগ করেন। এটি স্পষ্ট প্রমাণ—প্রতিষ্ঠার শুরুতেই জামায়াত ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিল এবং জনগণের কল্যাণ নয়, তাদের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা দখল।
*পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা:*
১৯৪৫ সালে উপমহাদেশের মুসলমানরা প্রাণপণ লড়াই করছিল পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য। অথচ জামায়াত প্রকাশ্যে এই আন্দোলনের বিরোধিতা করে। তারা দাবি তোলে—ধর্মীয় রাষ্ট্র আলাদা করে গঠনের প্রয়োজন নেই। এভাবে তারা মুসলমানদের দীর্ঘদিনের আত্মনিয়ন্ত্রণের আন্দোলনকেই বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করে। এটি প্রমাণ করে—জামায়াত জন্ম থেকেই ভণ্ডামি ও বিভ্রান্তিকর রাজনীতির ধারক-বাহক।
*মুক্তিযুদ্ধের সময়ের বিশ্বাসঘাতকতা:*
১৯৫৭ সালে গোলাম আজম জামায়াতের পূর্ব পাকিস্তান শাখার সেক্রেটারি জেনারেল হন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গোলাম আজম পাকিস্তানি সেনাদের সবচেয়ে বড় সহযোগী ছিলেন। তার নেতৃত্বে গড়ে ওঠে আলবদর ও আলশামস বাহিনী, যারা মুক্তিকামী বুদ্ধিজীবী হত্যাযজ্ঞ চালায়। দেশের গ্রাম-গঞ্জে গণহত্যা, নারীদের ওপর পাশবিক নির্যাতন এবং লুটপাটে সরাসরি অংশ নেয় এই বাহিনী।
বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য ৩০ লাখ শহীদের রক্ত এবং ২ লাখ মা-বোনের ইজ্জ্বত লুন্ঠনের আর্তনাদ আজও প্রমাণ করে—জামায়াত এই দেশের দল নয়, বরং পাকিস্তানি দোসর একটি অপশক্তি।
*জনগণের কাছে অজনপ্রিয়তা:*
জামায়াত কখনোই জনগণের দল ছিল না। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে তারা ১৫১টি আসনে প্রার্থী দিলেও মাত্র ৪টি আসনে জয়ী হয়। এটি প্রমাণ করে—পাকিস্তান আমলেও সাধারণ মানুষ জামায়াতকে ঘৃণা করত ও প্রত্যাখ্যান করেছিল। তাদের জনসমর্থন সবসময় সীমিত ও কৃত্রিম ছিল।
*চারবার নিষিদ্ধ হওয়ার ইতিহাস:*
রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ডের জন্য জামায়াত চারবার নিষিদ্ধ হয়।
– পাকিস্তান আমলে: ১৯৫৮ ও ১৯৬৪ সালে
– স্বাধীন বাংলাদেশে: ১৯৭৩ ও সর্বশেষ ২০২৪ সালে
কোনো রাজনৈতিক দল যদি বারবার নিষিদ্ধ হয়, তাহলে তা স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়—তাদের আদর্শ জনগণের বিপক্ষে এবং রাষ্ট্রের জন্য হুমকি।
*বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পুনর্জন্ম:*
১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার পর জামায়াতের নেতারা ধীরে ধীরে দেশে ফিরতে শুরু করে। গোলাম আজম ১৯৭৬ সালে নাগরিকত্ব চাইলে তা প্রত্যাখ্যাত হয়। কিন্তু মেজর জিয়াউর রহমানের প্রত্যক্ষ সহায়তায় তিনি পাকিস্তানি পাসপোর্টে ১৯৭৮ সালে বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। এরপর ১৯৭৯ সালে জিয়ার আশ্রয়ে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ পুনর্গঠিত হয়।
প্রকাশ্যে আব্বাস আলী খানকে ভারপ্রাপ্ত আমির করা হলেও, গোলাম আজম গোপনে দলের নেতৃত্ব দেন। এর মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয়—জামায়াত সবসময়ই রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার আঁতাতের মাধ্যমে টিকে থাকতে চেয়েছে।
*বিএনপি’র আশ্রয়ে টিকে থাকা:*
১৯৯৪ সালে বিএনপি সরকারের আমলে আদালতের রায়ে গোলাম আজম নাগরিকত্ব ফিরে পান। এরপর থেকে জামায়াত বিএনপির ছায়াতলে টিকে থাকার চেষ্টা করে। জনগণের সমর্থন না পাওয়ায় তারা ধর্মকে রাজনৈতিক ঢাল বানিয়ে ক্ষমতার রাজনীতিতে অংশ নেয়। বিএনপি-জামায়াত জোট গড়ে ওঠে মূলত এ ধরনের সুবিধাভোগী আঁতাতের ভিত্তিতে।
*ধর্মের নামে প্রতারণা:*
জামায়াত কেবল বাংলাদেশের জনগণকেই প্রতারিত করেনি, পাকিস্তানসহ অন্যান্য দেশেও তারা জনসমর্থনহীন। মূলধারার ইসলামি দলগুলো পর্যন্ত জামায়াতকে ইসলামপন্থী দল হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি। বরং অনেকে তাদের মুনাফেক ও ভণ্ড বলে আখ্যা দিয়েছে।
এ থেকে স্পষ্ট—জামায়াতের আসল শক্তি ইসলাম নয়, বরং ধর্মকে ব্যবহার করে মানুষের আবেগকে প্রভাবিত করে ক্ষমতায় যাওয়ার নোংরা রাজনীতি।
*বাংলাদেশের মানুষের প্রতি প্রশ্ন:*
বাংলাদেশের মানুষের সামনে আজ এক অনিবার্য প্রশ্ন দাঁড়িয়ে আছে—
👉 পাকিস্তান আন্দোলনের বিরোধিতা করা,
👉 বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় গণহত্যা ও ধর্ষণে পাকিস্তানি সেনাদের সহযোগিতা করা,
👉 চারবার নিষিদ্ধ হয়ে বারবার ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে টিকে থাকার চেষ্টা করা—
এসব অপরাধে দোষী একটি দলকে কি দেশের রাজনীতিতে থাকার অধিকার দেওয়া যায়?
পরিশেষে, জামায়াতে ইসলামী কোনো রাজনৈতিক দল নয়, এটি ভণ্ডামি ও বিশ্বাসঘাতকতার প্রতিচ্ছবি। তাদের ইতিহাস রক্তে ভেজা, তাদের আদর্শ পাকিস্তানকেন্দ্রিক, আর তাদের কর্মকাণ্ড বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও জনগণের বিপরীতে। বাংলাদেশের মানুষ রক্ত দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে। সেই স্বাধীনতার সঙ্গে যারা বিশ্বাসঘাতকতা করেছে, তাদের কোনো স্থান এ মাটিতে নেই।
জামায়াত মানেই ভণ্ডামি। জামায়াত মানেই বিশ্বাসঘাতকতা। জামায়াত মানেই বাংলাদেশের ইতিহাসের এক কলঙ্কিত অধ্যায়। এটি বাঙালী জাতি যতদিন মনে রাখতে পারবে ততোদিন তারা ভালো থাকতে পারবে।


