আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

একটি মানুষকে ইতিহাস থেকে মুছে ফেলা যায় না শুধু একটি অপ-রায় দিয়ে। একটি রাজনৈতিক অধ্যায়কে অস্বীকার করা যায় না শুধু ক্ষমতার পালাবদলে। আর একটি দেশের গত দেড় দশকের সামাজিক-অর্থনৈতিক রূপান্তরকে অদৃশ্য করে দেওয়া যায় না রাজনৈতিক বয়ান বদলে দিয়ে। শেখ হাসিনাকে নিয়ে বাংলাদেশের ইতিহাস তাই এক কঠিন সত্যের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তাঁর শাসনামল নিয়ে নির্বাচন ও জবাবদিহি নিয়ে বিতর্ক আছে হয়তো; এসব প্রশ্ন ইতিহাসের বাইরে রাখা যাবে না। কিন্তু একই সঙ্গে যে বাংলাদেশের অর্থনীতি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন, ডিজিটাল রূপান্তর এবং আন্তর্জাতিক অবস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে, সেই পরিবর্তনের প্রধান রাজনৈতিক নেতৃত্বকে অস্বীকার করাও বেইমানী।

২০০৯ সালে শেখ হাসিনা যখন আবার রাষ্ট্রক্ষমতায় ফেরেন, বাংলাদেশ তখন বিদ্যুৎ সংকট, অবকাঠামোগত দুর্বলতা, দারিদ্র্য ও উন্নয়ন ঘাটতির সঙ্গে লড়াই করছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সংযোগ সম্প্রসারণ, সড়ক, সেতু, রেল, বন্দর, ডিজিটাল সেবা এবং বৃহৎ অবকাঠামোতে ব্যাপক বিনিয়োগ হয়েছে। পদ্মা সেতু এই পরিবর্তনের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতীক। আন্তর্জাতিক অর্থায়ন সংকটের পর নিজস্ব অর্থায়নে এমন একটি বৃহৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের নতুন অধ্যায় তৈরি করে। পদ্মা সেতু তাই শুধু নদীর ওপর নির্মিত একটি অবকাঠামো নয়; এটি ছিল বাংলাদেশের সক্ষমতার ওপর রাজনৈতিক আস্থার প্রতীক। ‘ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ’ও একইভাবে একটি স্লোগানের বাইরে গিয়ে কোটি মানুষের দৈনন্দিন বাস্তবতায় পরিবর্তন এনেছে।

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি অবশ্যই এই একক ব্যক্তির সৃষ্টি। তৈরি পোশাকশিল্প, প্রবাসী আয়, কৃষি, বেসরকারি উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্রঋণ, নারীর শ্রমবাজারে প্রবেশ, সবকিছু মিলেই এই সাফল্যের ভিত্তি তৈরি করেছে। রাষ্ট্রীয় নীতি, অবকাঠামো, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ, রপ্তানি পরিবেশ ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা সরকারের ভূমিকা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তাঁর দীর্ঘ শাসনামলে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বেড়েছে, দারিদ্র্য কমেছে এবং মানুষের জীবনযাত্রায় দৃশ্যমান পরিবর্তন এসেছে। তাই শেখ হাসিনাকে এই পরিবর্তনের একমাত্র কারিগর বলা যেমন সরলীকরণ, তেমনি তাঁর নেতৃত্বকে বাদ দিয়ে উন্নয়নের গল্প লেখা বাস্তবতাকে অস্বীকার।

নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রেও পরিবর্তনটি ছিল গভীর। তৈরি পোশাকশিল্পে লাখ লাখ নারী প্রবেশ করেছেন, নিজের আয় করেছেন এবং পরিবারের সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা বাড়িয়েছেন। মেয়েদের শিক্ষায় উপবৃত্তি ও সামাজিক কর্মসূচি তাদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখার পাশাপাশি বাল্যবিবাহ বিলম্বিত করা এবং ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরিতে ভূমিকা রেখেছে। শিক্ষা থেকে কর্মসংস্থান, কর্মসংস্থান থেকে আয়, আর আয় থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতার এই ধারাটি বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামোতে নীরব বিপ্লব ঘটিয়েছে। স্বাস্থ্য খাতেও মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যু হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, টিকাদান এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের মতো অর্জন বাংলাদেশের মানব উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বের আরেকটি স্মরণীয় অধ্যায় ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকট। মিয়ানমারের সামরিক অভিযানের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিলে সীমিত সম্পদের দেশ হয়েও বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেয়। কক্সবাজারে বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ শরণার্থী বসতি গড়ে ওঠে। এই সিদ্ধান্তের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য বাংলাদেশকে দিতে হয়েছে এবং এখনো দিতে হচ্ছে; প্রত্যাবাসনও অনিশ্চিত। তবু মানবিকতার বিচারে এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। একইভাবে জলবায়ু পরিবর্তনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী করাও শেখ হাসিনা সরকারের সময়ের উল্লেখযোগ্য কূটনৈতিক অর্জন। জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর পক্ষে বাংলাদেশের কণ্ঠস্বর আন্তর্জাতিক আলোচনায় দৃশ্যমান হয়েছে।

তবে এখানেই ইতিহাসের কঠিন প্রশ্নটি আসে। উন্নয়ন কি গণতন্ত্রের বিকল্প? অবশ্যই নয়। একজন রাষ্ট্রনায়কের উন্নয়নমূলক অর্জন তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা মানবাধিকার বা রাজনৈতিক অধিকার সংক্রান্ত অভিযোগকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল করে না। আবার এসব অভিযোগও তাঁর সময়ের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অগ্রগতিকে অদৃশ্য করে দিতে পারে না। শেখ হাসিনা কেন, যেকারো বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তার তদন্ত হওয়া উচিত। কিন্তু সেই বিচার হতে হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ, প্রমাণনির্ভর এবং ন্যায়বিচারের আন্তর্জাতিক মানদণ্ডসম্মত। কারণ বিচার যদি প্রতিহিংসার হাতিয়ার হিসেবে দেখা দেয়, তাহলে একটি মামলার নিষ্পত্তি হলেও রাষ্ট্রের ন্যায়বিচারের প্রশ্ন শেষ হয় না; বরং আরও বড় প্রশ্নের জন্ম নেয়।

একটি আদালত একটি নির্দিষ্ট মামলার প্রমাণ ও আইনের ভিত্তিতে রায় দেয়। কিন্তু ইতিহাসের আদালত অনেক বড়। ইতিহাস জিজ্ঞেস করে একজন নেতা ক্ষমতায় এসে কী পেয়েছিলেন, কী নির্মাণ করেছিলেন, কী পরিবর্তন ঘটিয়েছিলেন এবং সেই পরিবর্তনের মূল্য সমাজকে কীভাবে দিতে হয়েছিল? সেই বিচারে শেখ হাসিনাকে শুধু ‘উন্নয়নের নায়ক’ অথবা শুধু কথিত ‘স্বৈরশাসক’ কোনো একটি বাক্যে বন্দী করা ইতিহাসের প্রতি সুবিচার নয়। তাঁর সময়ের অর্জন যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে বিতর্ক, ব্যর্থতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও। কিন্তু একটি বিষয় অস্বীকার করার উপায় নেই, বাংলাদেশের আধুনিক রূপান্তরের ইতিহাসে শেখ হাসিনাই কেন্দ্রীয় চরিত্র। তাঁকে বাদ দিয়ে গত দেড় দশকের বাংলাদেশের ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। তাঁর নাম মুছে ফেলা যেতে পারে সরকারি নথি থেকে, তাঁর ছবি নামিয়ে ফেলা যেতে পারে দেয়াল থেকে, রাজনৈতিক ভাষ্য বদলে দেওয়া যেতে পারে; কিন্তু পদ্মা সেতু মুছে ফেলা যাবে না, মানুষের ঘরে পৌঁছে যাওয়া বিদ্যুৎ মুছে ফেলা যাবে না, অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হয়ে ওঠা পরিবারগুলোর জীবন মুছে ফেলা যাবে না, কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করা লাখো নারীর অভিজ্ঞতা মুছে ফেলা যাবে না।

রাজনৈতিক ক্ষমতা বদলায়। সরকার আসে, সরকার যায়। রাজনৈতিক স্লোগান বদলায়। ইতিহাসের ব্যাখ্যাও সময়ের সঙ্গে বদলায়। কিন্তু মানুষের জীবনে ঘটে যাওয়া বাস্তব পরিবর্তনকে পুরোপুরি মুছে ফেলা যায় না। শেখ হাসিনার সবচেয়ে বড় উত্তরাধিকার সেখানেই। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দৃশ্যমান সাক্ষ্য কোনো দলীয় পোস্টার নয়; বাংলাদেশের বদলে যাওয়া বাস্তবতা।

তাই প্রশ্ন শুধু, শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে সাজানো পাতানো আদালতের রায় কী হলো? আরও বড় প্রশ্ন হলো ইতিহাসের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তাঁর নির্মিত বাংলাদেশের সাক্ষ্যও কি সমান গুরুত্ব পাবে? যদি পায়, তাহলে সেই বিচার অনেক বেশি জটিল হবে। সেখানে থাকবে রাজনৈতিক বিতর্ক, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের প্রশ্ন; একই সঙ্গে থাকবে বিদ্যুৎ, পদ্মা সেতু, অবকাঠামো, দারিদ্র্য হ্রাস, নারী ক্ষমতায়ন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রোহিঙ্গাদের আশ্রয় এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের দৃশ্যমান উত্থানের দলিল।

একজন রাষ্ট্রনায়ককে তাঁর পতনের মুহূর্ত দিয়ে বিচার করা যায়; কিন্তু তাঁর নির্মাণের সময়কে বাদ দিয়ে নয়। শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিকভাবে মেটিকুলাস ডিজাইন দিয়ে সাময়িক পরাজিত করা সম্ভব হতে পারে। তাঁর বিরুদ্ধে সাজানো রায়ও হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মানুষের জীবনে তাঁর শাসনামলে ঘটে যাওয়া পরিবর্তনের ইতিহাসকে মুছে ফেলা এত সহজ নয়। কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে শক্তিশালী দলিল কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য নয়; মানুষের জীবন, রাষ্ট্রের অবকাঠামো এবং সময়ের রেখে যাওয়া বাস্তব পরিবর্তন।

শেখ হাসিনার ইতিহাস তাই শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার একার ইতিহাস নয়; এটি বদলে যাওয়া বাংলাদেশেরও ইতিহাস। আর সেই ইতিহাস থেকে তাঁকে মুছে ফেলতে হলে শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি সময়কেই মুছে ফেলতে হবে।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version