বিয়ের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ডেঙ্গুতে প্রাণ গেল শিক্ষিকার, মৃত্যুর পর প্রসব মৃত ছেলেসন্তান; দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত ৫০ হাজার ছাড়িয়েছে, মৃত্যু ১৪৩

বিয়ের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই মিঠুন চৌধুরী ও অর্পিতা দাশের সংসারে আসার কথা ছিল নতুন অতিথি। অনাগত সন্তানকে ঘিরে স্বপ্ন আর আনন্দে দিন কাটছিল দুই পরিবারের। কিন্তু ঘাতক ডেঙ্গু মুহূর্তেই নিভিয়ে দিল সেই স্বপ্নের আলো। মাত্র ২৫ বছর বয়সেই প্রাণ হারালেন অর্পিতা। তাঁর মৃত্যুর পর পেট থেকে প্রসব করা হয় মৃত ছেলেসন্তান।

গত শুক্রবার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান অর্পিতা দাশ। তাঁর মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে চট্টগ্রাম নগরীর পাথরঘাটার আশরাফ আলী রোডের আর সি সার্চ এলাকার পরিবার ও স্বজনদের মধ্যে। স্ত্রীর মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন চট্টগ্রাম কাস্টমসে কর্মরত মিঠুন চৌধুরী।

আগামী ২৪ সেপ্টেম্বর অর্পিতার ২৬তম জন্মদিন ছিল। সন্তান জন্মের সম্ভাব্য তারিখ নির্ধারিত ছিল ১২ অক্টোবর। তার আগেই মা ও অনাগত সন্তানকে হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছে একটি পরিবার।

স্বজনদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ সেপ্টেম্বর হঠাৎ জ্বরে আক্রান্ত হন অর্পিতা। শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে ৬ সেপ্টেম্বর তাঁর ডেঙ্গু শনাক্ত হয়। পরদিন তাঁকে চট্টগ্রাম নগরীর আগ্রাবাদ মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার আরও অবনতি হলে ৯ সেপ্টেম্বর তাঁকে হাসপাতালের এইচডিইউতে নেওয়া হয়।

এ সময় দ্রুত কমতে থাকে তাঁর রক্তের প্লাটিলেট। শুরু হয় শ্বাসকষ্ট। পরে সংকটাপন্ন অবস্থায় তাঁকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে স্থানান্তর করা হয়। গত বৃহস্পতিবার রাতে তাঁকে প্লাটিলেট দেওয়া হয়। চিকিৎসকেরা আরও রক্তের প্রয়োজন হতে পারে জানালে স্বামী মিঠুন পরিচিত কয়েকজনকে রক্তদানের জন্য প্রস্তুত রেখেছিলেন। কিন্তু সব চেষ্টা ব্যর্থ করে পরদিনই মৃত্যু হয় অর্পিতার।

হাসপাতালের আইসিইউ বিভাগের চিকিৎসকেরা জানান, অর্পিতা ‘এক্সপান্ডেড ডেঙ্গু সিনড্রোমে’ আক্রান্ত হয়ে মারা গেছেন। ডেঙ্গুর এই জটিল পর্যায়ে একাধিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে এবং এটি জীবনঘাতী হতে পারে।

অর্পিতা দাশ সানরাইজ গ্রামার স্কুলের পাথরঘাটা শাখার ইউনিট-৪-এর সহকারী শিক্ষক ছিলেন। গত বছরের ১৬ অক্টোবর মিঠুন চৌধুরীর সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। বিয়ের পর নতুন সংসার গুছিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি সন্তান আগমনের অপেক্ষায় ছিলেন তাঁরা।

অর্পিতার মা দিপালী দাশ বড় মেয়েকে হারিয়ে প্রায় অচেতন হয়ে পড়েছেন। দুই মেয়েকে নিয়ে অনেক কষ্টে সংসার চালিয়ে আসছিলেন তিনি। ২০১৯ সালে ভারতে হৃদরোগের জটিল অস্ত্রোপচারের সময় মারা যান অর্পিতার বাবা। স্বামী, মা ও স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পাথরঘাটার পরিবেশ।

অর্পিতার মর্মান্তিক মৃত্যুর মধ্যেই দেশে ডেঙ্গুর ভয়াবহ বিস্তার অব্যাহত রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক ড্যাশবোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন আরও ১ হাজার ৫৬ জন। এ নিয়ে চলতি বছরে হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৫০ হাজার ২৭৬।

গত বছর অক্টোবর মাসে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়েছিল। এবার এক মাস আগেই সেই সীমা অতিক্রম করল। একই সময়ে ডেঙ্গুতে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে চলতি বছর মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৪৩।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, বছরের শুরুতে ডেঙ্গুর প্রকোপ তুলনামূলক কম থাকলেও জুনের পর থেকে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে থাকে। আগস্টে সর্বোচ্চ ২০ হাজার ৫৩৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ৪৩ জন। চলতি সেপ্টেম্বরের প্রথম ১২ দিনেই হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১৪ হাজার ৪৩০ জন, মৃত্যু হয়েছে ৪৬ জনের।

গত ৮ সেপ্টেম্বর এক দিনে সর্বোচ্চ ১ হাজার ৫৭১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হন। ওই দিন সর্বোচ্চ ৯ জনের মৃত্যুর তথ্যও পাওয়া যায়।

চলতি বছর ডেঙ্গুতে মৃত ১৪৩ জনের মধ্যে নারী ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ এবং পুরুষ ৪৮ দশমিক ৬ শতাংশ। গত ২৪ ঘণ্টায় মারা যাওয়া দুজনই পুরুষ। তাঁদের একজনের বয়স ৬ থেকে ১০ বছর এবং অন্যজনের বয়স ৫৬ থেকে ৬০ বছরের মধ্যে।

বিভাগভিত্তিক হিসাবে সবচেয়ে বেশি মৃত্যু হয়েছে ঢাকা বিভাগে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকার হাসপাতালে ৪৮ জন, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৮ জন এবং সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় আটজন মারা গেছেন। এ ছাড়া খুলনায় ২৫, ময়মনসিংহে ১৪, বরিশালে ১২, চট্টগ্রামে ১০, রাজশাহীতে ছয় এবং রংপুর ও সিলেটে একজন করে মারা গেছেন।

এ বছর হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৫০ হাজার ২৭৬ রোগীর মধ্যে ৪৬ হাজার ৬৯৯ জন সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছেন।

একসময় রাজধানীকেন্দ্রিক থাকলেও ডেঙ্গু এখন দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বিশেষ করে গত বছর থেকে ঢাকার বাইরে রোগটির বিস্তার ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান (আইইডিসিআর) গত চার বছরের তথ্য বিশ্লেষণ করে জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহগুলোতে দেশের কয়েকটি এলাকায় ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার তালিকায় রয়েছে ঢাকা, খুলনা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, ময়মনসিংহ, পিরোজপুর, নারায়ণগঞ্জ, ঝালকাঠি, কক্সবাজার, সিরাজগঞ্জ, কুমিল্লা, বরিশাল, বরগুনা, বান্দরবান ও পটুয়াখালী। এসব এলাকায় মশা নিধন কার্যক্রম জোরদার এবং হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা প্রস্তুতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।

ডেঙ্গু প্রতিরোধে নিজ নিজ বাড়ির আঙিনা পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার পাশাপাশি গণসচেতনতা গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল।

গতকাল নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ উপজেলার পাড়াগাঁও ঈদগাহ মাঠে আয়োজিত ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্পে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ আহ্বান জানান। বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রূপগঞ্জ উপজেলা বিএনপির উদ্যোগে এবং রূপগঞ্জ প্রাইভেট হসপিটাল ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক অ্যাসোসিয়েশনের আয়োজনে ক্যাম্পটি অনুষ্ঠিত হয়।

দেশব্যাপী ডেঙ্গু প্রতিরোধ ও পরিচ্ছন্নতা অভিযানের প্রথম দিনে গতকাল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভ্রাম্যমাণ আদালত ধানমন্ডির রাপা প্লাজা কর্তৃপক্ষকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন। প্লাজার পার্কিং জোনে জমে থাকা পানিতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়ায় এ জরিমানা করা হয়।

একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এলাকায় মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে দায়িত্ব পালনে গাফিলতির প্রমাণ পাওয়ায় ডিএসসিসির স্বাস্থ্যকর্মী সুশীল চন্দ্র রবিদাসকে বরখাস্ত করা হয়েছে।

ডেঙ্গুর ক্রমবর্ধমান সংক্রমণ ও মৃত্যুর এই পরিস্থিতিতে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু হাসপাতালে চিকিৎসা নয়, মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, নিয়মিত পরিচ্ছন্নতা অভিযান এবং জনসচেতনতা বাড়ানোর সমন্বিত উদ্যোগই পারে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version