মেয়ের আবদার পূরণ করতে নিজের কষ্টার্জিত তিন মণ ধান বিক্রি করে এক কেজি ইলিশ মাছ কিনেছেন লক্ষ্মীপুরের কৃষক মো. হাসান। বাবার বাড়িতে বেড়াতে আসা মেয়েকে বহুদিন পর লক্ষ্মীপুরের বিখ্যাত ইলিশ খাওয়ানোর ইচ্ছা থেকেই তাঁর এই উদ্যোগ। ঘটনাটি শুধু একজন বাবার ভালোবাসার গল্প নয়, একই সঙ্গে কৃষিপণ্যের সঙ্গে মাছের দামের বড় ব্যবধানের চিত্রও তুলে ধরেছে।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার হামছাদী গ্রামের কৃষক মো. হাসান। তাঁর মেয়ে ঢাকায় থাকেন এবং বিয়ের পর দীর্ঘদিন পর বাবার বাড়িতে বেড়াতে এসেছেন। লক্ষ্মীপুর ইলিশের জন্য বিখ্যাত হলেও মেয়ের সেখানে ইলিশের স্বাদ নেওয়ার সুযোগ হচ্ছিল না। তাই মেয়ে বাড়িতে এলে তাঁর জন্য একটি ইলিশ কিনবেন- এমন সিদ্ধান্ত আগেই নিয়ে রেখেছিলেন হাসান।

অবশেষে মেয়ের আগমনে সেই ইচ্ছা পূরণ করেন তিনি। ইলিশ কেনার টাকা জোগাড় করতে স্থানীয় হাটে তিন মণ ধান বিক্রি করেন। তিন মণ ধান বিক্রি করে তিনি পান ৩ হাজার ৫০০ টাকা। এর মধ্যে ২ হাজার ৮০০ টাকা দিয়ে কেনেন এক কেজি ওজনের একটি ইলিশ। কৃষক হাসান জানান, চলতি বছরে এটিই তাঁর কেনা প্রথম ইলিশ মাছ।

অর্থাৎ একজন কৃষক যদি প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি করেন, তাহলে এক কেজি ইলিশ কিনতে তাঁকে প্রায় দুই মণ ধান বিক্রি করতে হয়। হাসানের ক্ষেত্রে তিন মণ ধান বিক্রি করে পাওয়া ৩ হাজার ৫০০ টাকা থেকে ২ হাজার ৮০০ টাকা খরচ হয়েছে একটি ইলিশ কিনতে।

মাঠে ধান উৎপাদনে সার, শ্রমিক, সেচসহ বিভিন্ন খাতে ব্যয় বাড়ছে। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার পর ন্যায্য দাম না পেলে সেই উৎপাদন খরচের তুলনায় কৃষকের আয় কমে যায়। ফলে ধান বিক্রি করে পরিবারের নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোই কঠিন হয়ে পড়ে। এর মধ্যে ইলিশের মতো তুলনামূলক দামি মাছ অনেক কৃষক পরিবারের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।

তিন মণ ধান বিক্রি করে মেয়ের জন্য একটি ইলিশ কেনার ঘটনা তাই শুধু বাজারদরের হিসাব নয়। এর ভেতরে রয়েছে একজন কৃষক বাবার সন্তানের প্রতি গভীর ভালোবাসা এবং সীমিত সামর্থ্যের মধ্যেও মেয়ের ছোট্ট একটি ইচ্ছা পূরণ করার চেষ্টা।

একদিকে কৃষকের উৎপাদিত ধানের দাম যেখানে মণপ্রতি ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা, অন্যদিকে সেই কৃষকের পরিবারের টেবিলে এক কেজি ইলিশ তুলতে প্রয়োজন হচ্ছে প্রায় দুই মণ ধান। ফলে মো. হাসানের ঘটনা একই সঙ্গে বাবার ভালোবাসার আবেগ এবং কৃষকের ক্রয়ক্ষমতার সংকট- দুই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version