দেশের শিল্প খাতে তীব্র গ্যাস সংকটের পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গ্যাসের পর্যাপ্ত সরবরাহ না থাকায় আজ শনিবারও দেশের অধিকাংশ ভারী শিল্পকারখানা স্বাভাবিক উৎপাদনে ফিরতে পারছে না। চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, সাভার, আশুলিয়া, হবিগঞ্জ ও নরসিংদীসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। কোথাও কারখানা পুরোপুরি বন্ধ, আবার কোথাও সীমিত পরিসরে চলছে উৎপাদন।

শিল্প উদ্যোক্তারা বলছেন, কারখানা চালু রাখার মতো গ্যাসের নিশ্চয়তা এখনও পাওয়া যায়নি। দ্রুত পরিস্থিতির উন্নতি না হলে শুধু শিল্প উৎপাদন নয়, ভোজ্যতেল, আটা-ময়দা, চিনি, লবণসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহেও বড় ধরনের সংকট তৈরি হতে পারে। এতে বাজারে পণ্যের ঘাটতি ও মূল্যবৃদ্ধির চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন তারা।

মহেশখালীর দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনালকে ঘিরে তৈরি হওয়া সংকট পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলেছে। বৃহস্পতিবার বিকেল থেকে বন্ধ থাকা সামিট এলএনজি টার্মিনাল শুক্রবার সন্ধ্যায় আবার গ্যাস সরবরাহ শুরু করলেও এর মধ্যেই কারিগরি ত্রুটির কারণে বন্ধ হয়ে গেছে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল।

সামিটের সরবরাহ ধীরে ধীরে বাড়িয়ে মধ্যরাত নাগাদ প্রায় ৫০ কোটি ঘনফুটে নেওয়ার আশা করা হচ্ছে। এতে ঘাটতি কিছুটা কমতে পারে। তবে এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল দ্রুত চালু না হলে সামগ্রিক পরিস্থিতির বড় ধরনের উন্নতি হবে না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের ৬০ থেকে ৭০টি কারখানার মধ্যে ভোগ্যপণ্য খাতের সঙ্গে যুক্ত ১৫টি কারখানার বেশির ভাগই বন্ধ রয়েছে। কিছু কারখানা দিনে মাত্র ছয় থেকে সাত ঘণ্টা চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে। সব মিলিয়ে গ্রুপটির উৎপাদন অর্ধেকের নিচে নেমে এসেছে।

গ্রুপটির মহাব্যবস্থাপক মুজিবুর রহমান জানান, আটা-ময়দা, ভোজ্যতেল, চিনি, লবণসহ বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের কারখানায় গ্যাস সংকটের প্রভাব পড়েছে। পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে মেশিন চালানোও সম্ভব হচ্ছে না। তাঁর আশঙ্কা, পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে বাজারে পণ্যের সরবরাহে বড় ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে।

টিকে গ্রুপের ২৮ থেকে ২৯টি কারখানার মধ্যে বর্তমানে মাত্র পাঁচ থেকে সাতটি চালু রয়েছে। গত বুধবার থেকে বেশির ভাগ কারখানাই পুরোপুরি বন্ধ রাখা হয়েছে।

গ্রুপটির দুটি ভোজ্যতেল কারখানার মধ্যে একটি কোনোভাবে চালু থাকলেও অন্যটি বন্ধ। স্টিল, পার্টিক্যাল বোর্ড ও কেমিক্যালসহ অন্যান্য শিল্প ইউনিটের উৎপাদনও বন্ধ রয়েছে। গ্যাস সরবরাহ না বাড়লে কিছু কারখানার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছুটি দেওয়ার কথাও ভাবছে কর্তৃপক্ষ।

প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের কারখানাগুলোতেও গ্যাস সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে। গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আরএন পাল জানিয়েছেন, তাদের উৎপাদন বর্তমানে প্রায় ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে।

হবিগঞ্জ, নরসিংদী ও গাজীপুরে গ্রুপটির গুরুত্বপূর্ণ কারখানাগুলো অবস্থিত। এসব এলাকায় তাদের মোট উৎপাদনের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ হয়ে থাকে। কিন্তু গ্যাসনির্ভর বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যবস্থা অচল হয়ে পড়ায় কারখানাগুলোতে উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

উৎপাদন সচল রাখতে ডিজেল ও পল্লী বিদ্যুতের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।

সীকম গ্রুপের চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, গ্যাস সংকটে তাঁর কিছু কারখানায় উৎপাদন কমেছে এবং কিছু কারখানা বন্ধ রয়েছে। সয়াবিন বীজ ভাঙানো ও সিমেন্ট উৎপাদনেও সংকট দেখা দিয়েছে।

তিনি বলেন, একটি কারখানা বন্ধ হওয়ার প্রভাব শুধু শিল্প মালিকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর সঙ্গে কর্মসংস্থান, সরবরাহব্যবস্থা, বাজার এবং সামগ্রিক অর্থনীতি জড়িত। ভোজ্যতেল, সিমেন্ট, ইস্পাতসহ গুরুত্বপূর্ণ শিল্পের উৎপাদন কমে গেলে পুরো সরবরাহব্যবস্থায় তার প্রভাব পড়ে।

তাঁর মতে, দীর্ঘদিন নতুন গ্যাস অনুসন্ধান ও কূপ খননে পর্যাপ্ত গুরুত্ব না দেওয়ায় দেশ ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে। দ্রুত নতুন গ্যাস অনুসন্ধান, নবায়নযোগ্য জ্বালানির উৎপাদন বৃদ্ধি, শিল্পে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার এবং এলএনজি অবকাঠামোর সক্ষমতা কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

গ্যাস সংকট থেকে পোশাক ও বস্ত্র খাতও মুক্ত নয়। বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম জানিয়েছেন, স্বাভাবিক উৎপাদন চালুর মতো পরিস্থিতি এখনও তৈরি হয়নি। তবে এখন পর্যন্ত কারখানা বন্ধ বা ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ পাওয়া গেলে শনিবার কারখানা চালু রাখার প্রস্তুতি রয়েছে।

বস্ত্রকল মালিকদের সংগঠন বিটিএমএর তথ্য অনুযায়ী, হবিগঞ্জ শিল্পাঞ্চলের সব কারখানাই শতভাগ বন্ধ ছিল।

গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক হলে দ্রুত উৎপাদনে ফেরার জন্য অনেক কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের প্রস্তুত থাকতে বলেছে। তবে পরিস্থিতি রোববার পর্যন্তও স্বাভাবিক না হলে কিছু কারখানায় কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিকদের ছুটি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

উদ্যোক্তাদের আশঙ্কা, গ্যাস সংকট দ্রুত কাটিয়ে উঠতে না পারলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর চাপ আরও বাড়বে। বিশেষ করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের উৎপাদন ব্যাহত হলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে বাজারে। ফলে এখন শিল্প উদ্যোক্তাদের প্রধান দাবি- দ্রুত গ্যাস সরবরাহ স্বাভাবিক করে উৎপাদন সচল রাখার ব্যবস্থা করা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version