যশোরের কালেক্টরেট অফিসে দিনের বেলা হিসাবের খাতা, আর রাত নামলেই চোখ আকাশের দিকে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি ছাড়াই অধ্যবসায়, বইপড়া ও নিরলস পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান মহলে নিজের জায়গা করে নিয়েছিলেন রাধাগোবিন্দ চন্দ্র। তাঁর জীবন প্রমাণ করে- জ্ঞানচর্চার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার পাশাপাশি প্রবল আগ্রহ ও অধ্যবসায়ও হতে পারে বড় শক্তি।

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ১৮৭৮ সালের ১৭ জুলাই যশোরের বাগচর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। শৈশব থেকেই আকাশ, নক্ষত্র ও মহাকাশের প্রতি তাঁর গভীর আকর্ষণ তৈরি হয়। স্কুলজীবনে অক্ষয়কুমার দত্তের জ্যোতির্বিজ্ঞানবিষয়ক লেখা পড়েই তাঁর আগ্রহ আরও গভীর হয়ে ওঠে।

কর্মজীবনে তিনি যশোর কালেক্টরেট অফিসে হিসাবের কাজ করতেন। কিন্তু দিনের চাকরির ব্যস্ততা তাঁর আকাশ পর্যবেক্ষণের আগ্রহকে কখনো থামাতে পারেনি। রাত হলেই তিনি দূরবীন নিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে নক্ষত্র ও বিভিন্ন জ্যোতিষ্কের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করতেন।

১৯১০ সালের এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত ছোট দূরবীন দিয়ে যশোর থেকে তিনি হ্যালির ধূমকেতু পর্যবেক্ষণ করেন। পরে ১৯১২ সালে মাত্র ১৩ পাউন্ডে ইংল্যান্ড থেকে একটি ৩ ইঞ্চি দূরবীন কিনে তাঁর পর্যবেক্ষণ আরও বিস্তৃত করেন।

তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৯১৮ সালের ৭ জুন। সেদিন ঈগল নক্ষত্রমণ্ডলে তিনি একটি অচেনা উজ্জ্বল তারা দেখতে পান। পরবর্তীতে সেটি নোভা অ্যাকুইলা ৩ নামে পরিচিতি পায়। এই আবিষ্কার তাঁর জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণকে আন্তর্জাতিক মহলে আরও পরিচিত করে তোলে।

তবে রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল পরিবর্তনশীল তারার উজ্জ্বলতা পর্যবেক্ষণ ও নথিবদ্ধকরণ। ১৯১৯ থেকে ১৯৫৪ সালের মধ্যে তিনি ৩৭ হাজার ২১৫টি প্রশিক্ষিত পর্যবেক্ষণ জমা দেন। আবার আমেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অব ভ্যারিয়েবল স্টার অবজারভারসের (AAVSO) নথিতে তাঁর মোট পর্যবেক্ষণের সংখ্যা ৪৯ হাজার ৭০০-এর বেশি বলে উল্লেখ রয়েছে।

যশোরের ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে তাঁর পর্যবেক্ষণ ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ইউরোপ ও আমেরিকার পর্যবেক্ষণ-সময়ের মধ্যবর্তী যে ঘাটতি থাকত, তাঁর তথ্য সেই শূন্যতা পূরণে কার্যকর ভূমিকা রাখত। ফলে যশোরের একটি সাধারণ কর্মস্থল থেকে করা তাঁর রাতের আকাশ পর্যবেক্ষণ পৌঁছে যায় আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণার তথ্যভান্ডারে।

তাঁর কাজের স্বীকৃতিও আসে আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকে। ১৯২৬ সালে যুক্তরাষ্ট্র থেকে তাঁর জন্য একটি ৬ ইঞ্চি দূরবীন পাঠানো হয়, যা পরবর্তীতে এলমার-চন্দ্র দূরবীন নামে পরিচিত হয়। ১৯২৮ সালে ফরাসি সরকার তাঁকে অফিসার দ্য একাডেমিক উপাধিতে সম্মানিত করে। ১৯৪৭ সালে হার্ভার্ডে অনুষ্ঠিত AAVSO-এর বার্ষিক সভায় তাঁকে সম্মানসূচক সদস্য করা হয়।

রাধাগোবিন্দ চন্দ্র ১৯৭৫ সালের ৩ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া পর্যবেক্ষণ ও জ্যোতির্বিজ্ঞানচর্চার দৃষ্টান্ত আজও অনন্য।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিগ্রি ছিল না, ছিল না বড় কোনো গবেষণাগারও। ছিল শুধু আকাশের প্রতি অদম্য কৌতূহল, হাতে দূরবীন আর বছরের পর বছর নিরলস পর্যবেক্ষণ। যশোরের এক হিসাবরক্ষক থেকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত জ্যোতির্বিজ্ঞানী হয়ে ওঠার রাধাগোবিন্দ চন্দ্রের গল্প তাই বাঙালির জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে এক অনন্য অধ্যায়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version