আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

দীপের কথা মনে আছে?
বুয়েটের সেই তরুণ, যে শুধু ফেসবুকে লিখেই থেমে থাকেনি; বিশ্বাস করেছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে নীরব থাকা মানেই অন্যায়কে শক্তিশালী করা। যে নিজের ক্যাম্পাসে মৌলবাদ, উগ্রবাদ এবং সহিংস রাজনীতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছিল।

হ্যাঁ, তাঁর নাম আরিফ রায়হান দীপ।

বুয়েটে ধর্মভিত্তিক উগ্র রাজনীতির বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছিলেন তিনি। ক্যাম্পাসে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনায় তিনি প্রকাশ্যে প্রতিবাদ করেছিলেন। বিশেষ করে হেফাজতে ইসলামের লংমার্চকে ঘিরে বুয়েটের এক ইমামের ভূমিকার সমালোচনা করে তিনি আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসেন। তাঁর সেই প্রতিবাদের পর প্রশাসন সংশ্লিষ্ট ইমামের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় বলে সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। কিন্তু সেই ঘটনার পর থেকেই দীপকে ঘিরে শুরু হয় উত্তেজনা, বিতর্ক এবং হুমকির অভিযোগ।

দীপ একবার বলেছিলেন, “আমি শুকরের সঙ্গে সহবাসের ফতোয়া অস্বীকার করি।” এই বক্তব্য নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে বিদ্বেষমূলক প্রচারণা চালানোর অভিযোগ ওঠে। অপরিচিত নম্বর থেকে হত্যার হুমকিও পেয়েছিলেন তিনি। এরপর আসে সেই ভয়াবহ দিন।

২০১৩ সালের ৯ এপ্রিল। বুয়েটের নজরুল ইসলাম হলের নিজ কক্ষে ধারালো অস্ত্রের হামলার শিকার হন আরিফ রায়হান দীপ। মাথা, চোখ ও পিঠে গুরুতর আঘাত নিয়ে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর শরীরে ছিল অসংখ্য গভীর ক্ষত। ৮৪ দিন মৃত্যুর সঙ্গে লড়াই করে ২০১৩ সালের ২ জুলাই তিনি পৃথিবী থেকে বিদায় নেন।

একটি স্বপ্ন থেমে যায়।
একটি কণ্ঠ স্তব্ধ হয়ে যায়।
কিন্তু একটি প্রশ্ন বেঁচে থাকে।

তৎকালীন সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া বুয়েট শিক্ষার্থী মেজবাহ উদ্দিন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছিলেন। সেখানে তিনি দাবি করেছিলেন, ধর্মীয় দায়িত্ববোধ থেকেই তিনি এই হামলা চালিয়েছেন। সেই বক্তব্য আজও বাংলাদেশের জন্য এক গভীর উদ্বেগের বিষয়। যখন কোনো তরুণ বিশ্বাস করতে শেখে যে ভিন্নমতের জবাব অস্ত্র দিয়ে দিতে হবে, তখন সেটি শুধু একজন মানুষের জন্য নয়, পুরো সমাজের জন্য বিপদের সংকেত।

দীপের মৃত্যু তাই কেবল একটি হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়। এটি আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ ও শিক্ষাঙ্গনের সামনে রেখে যাওয়া এক নির্মম প্রশ্ন। কেন একজন শিক্ষার্থীকে তাঁর মতপ্রকাশের জন্য প্রাণ দিতে হবে? আজও যখন সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা ছড়ানোর চেষ্টা হয়, যখন ভিন্নমতকে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা দেখা যায়, তখন দীপের স্মৃতি নতুন করে মনে করিয়ে দেয়- উগ্রবাদ কখনো একটি মানুষের জীবনেই থেমে থাকে না; এটি ধীরে ধীরে পুরো সমাজকে গ্রাস করতে চায়।

দীপ আজ নেই। কিন্তু তাঁর সাহস, তাঁর প্রতিবাদ এবং ভয়কে অস্বীকার করার শক্তি আজও অনেক মানুষকে অনুপ্রাণিত করে। যে তরুণ নিজের বিশ্বাসের পক্ষে দাঁড়াতে গিয়ে জীবন হারিয়েছিল, আমরা তাঁকে কেবল একটি নাম হিসেবে মনে রাখব না; বরং এমন এক প্রতীক হিসেবে স্মরণ করব, যে মনে করিয়ে দিয়েছিল মতের বিরুদ্ধে মত থাকতে পারে, কিন্তু মতের বিরুদ্ধে চাপাতি কখনো সভ্যতার ভাষা হতে পারে না। আমরা যেন দীপকে ভুলে না যাই। এই দীপ যেন।কিছুতেই নিভে না যায়! দীপ নিভলে প্রগাঢ় অন্ধকার আমাদের রাহুগ্রাসে গিলে খাবে।।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার
রাজনৈতিক বিশ্লেষক।।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version