মার্কিন বাহিনীর আনুষ্ঠানিক বিদায়ে ইরাকে উৎসবের আবহ- সার্বভৌমত্ব নিয়ে স্বস্তির পাশাপাশি নিরাপত্তা শূন্যতার আশঙ্কা, লাভবান হতে পারে ইরান

দীর্ঘ দুই দশকের সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটিয়ে ইরাক থেকে পুরোপুরি প্রত্যাহার করেছে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী। ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন সামরিক অভিযান শুরুর পর দেশটিতে মার্কিন সেনাদের যে দীর্ঘস্থায়ী উপস্থিতি ছিল, মঙ্গলবার তার আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে।

শেষ মার্কিন সেনারা ইরাক ছাড়ার পর দেশজুড়ে দেখা দিয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কোথাও চলছে বিজয় ও স্বাধীনতার উদ্‌যাপন, আবার কোথাও তৈরি হয়েছে নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে গভীর উদ্বেগ। এ উপলক্ষে ইরাক সরকার চার দিনের সরকারি ছুটিও ঘোষণা করেছে।

ইরাকের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক মুখপাত্র আলজাজিরাকে জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়সীমা শেষ হওয়ার এক দিন আগেই মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর সর্বশেষ সদস্যরা ইরাক ত্যাগ করেছেন। বর্তমানে দেশটিতে মার্কিন নেতৃত্বাধীন বাহিনীর কোনো সেনা নেই বলেও নিশ্চিত করেছেন তিনি।

ইরাক সরকারের ভাষ্য, মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের মধ্য দিয়ে দেশের সার্বভৌমত্ব আরও সুদৃঢ় করার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি এটিকে ইরাকের জন্য ‘নতুন দিনের সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে, বিদেশি সামরিক উপস্থিতি থেকে মুক্ত হয়ে এখন পুরো ভূখণ্ডের ওপর জাতীয় সার্বভৌমত্ব প্রতিষ্ঠার পথে এগোবে ইরাক।

২০০৩ সালে সাদ্দাম হোসেনের সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে ইরাকে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। পরবর্তী সময়ে দেশটিতে ব্যাপকসংখ্যক মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়। ২০০৭ সালে ইরাকে মার্কিন সেনার সংখ্যা ১ লাখ ৭০ হাজারেরও বেশি হয়েছিল।

এরপর ২০১১ সালে মার্কিন বাহিনীর একটি বড় অংশ ইরাক ছেড়ে যায়। তবে ২০১৪ সালে জঙ্গিগোষ্ঠী ইসলামিক স্টেট (আইএস) দমনের লক্ষ্যে আবারও মার্কিন সেনা মোতায়েন করা হয়।

২০২৪ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের প্রশাসনের সঙ্গে ইরাকের একটি সমঝোতার ভিত্তিতে ধাপে ধাপে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত হয়। ওই সময় ইরাকে প্রায় আড়াই হাজার মার্কিন সেনা ছিল। গত বছর তাদের বড় অংশ সরিয়ে নেওয়া হলেও কুর্দি-অধ্যুষিত আধা স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে কিছু সেনা অবস্থান করছিলেন। শেষ পর্যন্ত তাদেরও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে ইরানের ঘনিষ্ঠ বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠী ‘ঐতিহাসিক জয়’ হিসেবে দেখছে। ইসলামিক রেজিস্ট্যান্সের কমান্ডার আবু মোজতাবা আল-ইয়াসিরি দাবি করেছেন, ৩০ সেপ্টেম্বর ইরাকের ইতিহাসের একটি ‘কালো অধ্যায়ের’ অবসান ঘটবে এবং মার্কিন বাহিনীর প্রস্থান ইরাকিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিজয়।

তবে সবার প্রতিক্রিয়া এতটা স্বস্তিদায়ক নয়। ফালুজা অঞ্চলের একটি আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা আবদুল রহমান আল-জোবাইর বলেছেন, পূর্ণ নিরাপত্তার দায়িত্ব এককভাবে নেওয়ার মতো প্রস্তুতি ইরাকের রয়েছে কি না, তা নিয়ে তাদের উদ্বেগ রয়েছে।

তাঁর আশঙ্কা, মার্কিন বাহিনীর হঠাৎ অনুপস্থিতিতে যে নিরাপত্তা শূন্যতা তৈরি হতে পারে, তা ইরাকের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করবে।

মার্কিন সেনা প্রত্যাহারের ফলে ইরাকে ইরানপন্থি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রভাব আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন কিছু বিশ্লেষক। দেশটিতে তেহরান-সমর্থিত একাধিক সশস্ত্র গোষ্ঠী সক্রিয় রয়েছে, যাদের আঞ্চলিক সংঘাতেও ভূমিকা রয়েছে।

ইরাকি নিরাপত্তা বিশ্লেষক জাসিম আল-বাহাদলি রয়টার্সকে বলেছেন, মার্কিন নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের ইরাক ছাড়ার ফলে কৌশলগতভাবে ইরান লাভবান হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। তাঁর মতে, মার্কিন উপস্থিতি বহু বছর ধরে ইরাকে তেহরানের প্রভাবের বিপরীতে একটি ভারসাম্য তৈরি করে রেখেছিল।

ফলে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার একদিকে ইরাকের দীর্ঘদিনের বিদেশি সামরিক উপস্থিতির অবসান ঘটালেও অন্যদিকে দেশটির নিরাপত্তা কাঠামো, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্যে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।

দুই দশকের যুদ্ধ, দখল, সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান ও সামরিক হস্তক্ষেপের পর ইরাক এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে বিদেশি সেনামুক্ত সার্বভৌমত্বের আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক প্রভাবের নতুন বাস্তবতাও মোকাবিলা করতে হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version