সুনামগঞ্জে তিন সন্তানকে বিষ খাইয়ে বাবার আত্মহত্যার চেষ্টা, মানিকগঞ্জে স্ত্রী-শিশুকে হত্যার পর প্রবাসীর আত্মহত্যার সন্দেহ

মাত্র তিন দিন আগে মা পাড়ি জমিয়েছেন সৌদি আরবে। মায়ের অনুপস্থিতিতে বাবার সঙ্গে ঘুমাতে যাওয়া তিন শিশুর আর ঘুম ভাঙেনি। পারিবারিক কলহের জেরে তিন সন্তানকে কীটনাশক খাইয়ে হত্যার পর নিজেও বিষপান করেছেন বাবা। একই সময়ে মানিকগঞ্জে স্ত্রী ও দেড় বছরের শিশুকন্যার মরদেহের পাশে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে সৌদিফেরত এক প্রবাসীর মরদেহ।

দুই জেলার পৃথক ঘটনায় মোট ছয়জনের মৃত্যু ঘিরে এলাকায় নেমে এসেছে শোক ও আতঙ্ক। এর মধ্যে সুনামগঞ্জের তাহিরপুরে তিন শিশুকে হত্যার অভিযোগে তাদের বাবা সরফত আলী (৩৫) গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। অন্যদিকে মানিকগঞ্জের ঘটনায় স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার পর একরাম হোসেন (৪০) আত্মহত্যা করেছেন বলে পুলিশের প্রাথমিক ধারণা। তবে নিহতের স্বজনদের দাবি, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার বড়দল উত্তর ইউনিয়নের রজনীলাইন গ্রামে শুক্রবার গভীর রাতে মর্মান্তিক এ ঘটনা ঘটে। নিহত তিন শিশু হলো- ১০ বছরের মাওয়া, সাত বছরের শামীম ও দুই বছরের তামিম।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, সরফত আলীর স্ত্রী ফাতেমা বেগম তিন দিন আগে সৌদি আরবে যান। শুক্রবার রাতে সরফত তাঁর তিন সন্তানকে নিয়ে ঘুমাতে যান। রাত আনুমানিক ১টার দিকে চারজনই কীটনাশক পান করেন বলে জানা গেছে।

বিষপানের পর সরফত ময়মনসিংহে থাকা তাঁর এক ফুফুকে ফোন করে বিষয়টি জানান। পরে তাঁর ফুফু সরফতের ছোট ভাই রহমত আলীকে খবর দিলে তিনি দ্রুত বাড়িতে ছুটে যান। ঘরের দরজা ভেঙে চারজনকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক তিন শিশুকে মৃত ঘোষণা করেন।

সরফতের অবস্থা আশঙ্কাজনক হওয়ায় তাঁকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

স্থানীয়দের দাবি, পারিবারিক কলহের পাশাপাশি সরফতের মাদক ও জুয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টিও এলাকায় আলোচিত ছিল। তাঁর ঘর থেকে লিচুর জুসের বোতলও পাওয়া গেছে। স্থানীয়দের ধারণা, জুসের সঙ্গে কীটনাশক মিশিয়ে শিশুদের পান করানো হয়ে থাকতে পারে। তবে ঘটনার প্রকৃত কারণ তদন্তের পরই নিশ্চিত হওয়া যাবে।

তাহিরপুর থানার ওসি ফারুক আহমদ জানান, তিন শিশুর মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি করে ময়নাতদন্তের জন্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।

এদিকে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার কৃষ্ণপুর ইউনিয়নের জান্নাকান্দি ঘোনাপাড়া এলাকায় শনিবার দুপুরে নিজ বাড়ি থেকে সৌদিফেরত একরাম হোসেন (৪০), তাঁর স্ত্রী সানজিদা আক্তার প্রিয়াঙ্কা (২৫) ও দেড় বছরের মেয়ে আলিজার মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

পরিবারের সদস্যরা জানান, শুক্রবার রাতে একরাম স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে একটি চৌচালা টিনের ঘরে ঘুমাতে যান। শনিবার বেলা গড়িয়ে গেলেও দরজা না খোলায় স্বজনদের সন্দেহ হয়। পরে ঘরের টিনের একটি অংশ ভেঙে উঁকি দিয়ে একরামকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পান তারা। এরপর দরজা ভেঙে ঘরে ঢুকে স্ত্রী ও শিশুকন্যার মরদেহও দেখতে পান।

পুলিশের তথ্যমতে, প্রিয়াঙ্কার মরদেহ পড়ে ছিল ঘরের মেঝেতে, মেয়ে আলিজার মরদেহ ছিল খাটের ওপর। আর একরামের মরদেহ ঝুলছিল ঘরের আড়ার সঙ্গে।

পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে একরাম তাঁর স্ত্রী ও মেয়েকে হত্যার পর স্ত্রীর ওড়না দিয়ে গলায় ফাঁস নিয়ে আত্মহত্যা করে থাকতে পারেন। তবে নিহত প্রিয়াঙ্কার পরিবারের অভিযোগ, তিনজনকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।

প্রিয়াঙ্কার মা আফরোজার দাবি, একরামের সঙ্গে দাম্পত্য কলহের কারণে তাঁর আগের স্ত্রীও চলে গিয়েছিলেন। তিন বছর আগে একরাম প্রিয়াঙ্কাকে বিয়ে করেন। মৃত্যুর দুই দিন আগে প্রিয়াঙ্কা ফোন করে স্বামীর সঙ্গে মনোমালিন্যের কথা জানিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে একরামের ভাই ওষুধ ব্যবসায়ী ওয়াসিম বলেন, তাঁদের চার ভাইয়ের মধ্যে তিনজন বিদেশে থাকেন। দুই মাস আগে একরাম দেশে ফেরেন এবং অধিকাংশ সময় বাড়িতেই থাকতেন। তাঁর সঙ্গে কারও বিরোধের কথা তাঁদের জানা ছিল না।

মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মহরম আলী বলেন, প্রাথমিকভাবে ঘটনাটি পারিবারিক ও দাম্পত্য কলহের জেরে ঘটেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না। ঘটনায় একটি হত্যা মামলা ও একটি অপমৃত্যু মামলার প্রক্রিয়া চলছে।

দুই ঘটনায়ই এখন তদন্তের দিকে তাকিয়ে স্বজন ও স্থানীয়রা। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তের পরই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও ঘটনাগুলোর পেছনে অন্য কারও সম্পৃক্ততা ছিল কি না, তা স্পষ্ট হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version