আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

একটি দেশের সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় তার অট্টালিকার উচ্চতায় নয়, তার দুর্বলতম মানুষের নিরাপত্তায়। যে রাষ্ট্রে একজন নারী নিজের শরীর, সম্মান ও জীবনের নিরাপত্তা নিয়ে সংশয়ে থাকেন, সে রাষ্ট্রের উন্নয়নের সমস্ত পরিসংখ্যানের আড়ালেও একটি গভীর অন্ধকার থেকে যায়। বাংলাদেশে গত দুই বছরে নারীদের ওপর অন্তত ৭৩০টি মব হামলা বা গণপিটুনির যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, তা সেই অন্ধকারেরই এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

৭৩০টি সংখ্যা আসলে কোনো সংখ্যা নয়। এর প্রতিটি একটি করে মুখ, একটি করে পরিবার, একটি করে আতঙ্ক, একটি করে ক্ষত। কোনো নারী হয়তো কথিত জনতার হাতে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত হয়েছেন, কেউ হয়েছেন মানসিকভাবে বিধ্বস্ত, কেউ হারিয়েছেন স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সাহস। কোথাও কোথাও এই উন্মত্ততা মৃত্যুর কারণও হয়েছে। অথচ সবচেয়ে ভয়াবহ প্রশ্নটি রয়ে যায়, একজন মানুষকে অপরাধী সাব্যস্ত করার অধিকার এই অপঃ ‘তৌহিদী মোল্লা’র হাতে এলো কোথা থেকে?

আইন আছে, আদালত আছে, বিচারব্যবস্থা আছে। তবু কেন মানুষ আদালতের দরজা এড়িয়ে রাস্তাকেই বিচারালয় বানাচ্ছে? কেন একটি গুজব, একটি ফেসবুক পোস্ট, একটি ভিডিও কিংবা একটি অপপ্রচার মুহূর্তের মধ্যে একজন মানুষকে অপরাধী বানিয়ে ফেলছে? কেন সত্য জানার আগ্রহের চেয়ে শাস্তি দেওয়ার উন্মাদনা আমাদের সমাজে দ্রুততর হয়ে উঠছে? এখানেই আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজের গভীর সংকট।

মব কোনো বিচারব্যবস্থা নয়। মব হলো মুহূর্তের উত্তেজনায় বিবেকের পরাজয়ে ঘটিত সন্ত্রাস। আদালত প্রমাণ খোঁজে, মব খোঁজে শিকার। আদালত সাক্ষ্য শোনে, মব শোনে গুজব। আদালত রায় দেয় আইনের ভিত্তিতে, মব রায় দেয় ক্রোধের ভিত্তিতে। আর যখন সেই মবের লক্ষ্য হন একজন নারী, তখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় তথাকথিত নৈতিকতার আরেকটি নির্মম অস্ত্র। তার পোশাক, তার চলাফেরা, তার সম্পর্ক, তার ব্যক্তিগত জীবন, তার চরিত্র সবকিছুই তখন জনতার বিচার্য হয়ে ওঠে।

এ কেমন সমাজ, যেখানে নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা জনতার অনুমতির ওপর নির্ভর করবে? নারীর মর্যাদা কোনো সামাজিক দয়ার বিষয় নয়। এটি তার অধিকার। কোনো অভিযোগ সত্য হলেও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে তৌহিদী জনতা নামের হিংস্র পশুদের হাতে তুলে দেওয়া যায় না। অপরাধী হলেও তাকে আইনের বিধানেই বিচার করতে হবে। কারণ আইনের বাইরে গিয়ে অপরাধের বিচার করতে শুরু করলে একদিন সেই একই জনতা নিরপরাধ মানুষের ভাগ্যও নির্ধারণ করবে।

আজ যে হাত একজন নারীকে গুজবের ভিত্তিতে আঘাত করছে, কাল সেই হাত আপনার দরজাতেও উঠতে পারে। আজ যে জনতা অন্যের অপরাধের বিচার করছে, কাল সেই জনতাই আপনার বিরুদ্ধে একটি মিথ্যা অভিযোগকে সত্যে পরিণত করতে পারে। মব সন্ত্রাসের সবচেয়ে ভয়ংকর দিক এখানেই। এটি কাউকে নিরাপদ রাখে না।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের প্রথম দায়িত্ব হলো নাগরিককে হিংস্র পশুদের উন্মত্ততা থেকে রক্ষা করা। রাষ্ট্র যদি সেই দায়িত্বে ব্যর্থ হয়, তবে শুধু আইনশৃঙ্খলা দুর্বল হয় না, নাগরিকের রাষ্ট্রের ওপর আস্থাটিও ক্ষয়ে যায়। আর বিচারহীনতা যখন বারবার পুরস্কৃত হয়, তখন অপরাধীর সাহস বাড়ে এবং নিরপরাধ মানুষের ভয় গভীর হয়।

৭৩০টি মব হামলার তথ্য তাই শুধু নারীর নিরাপত্তার সংকট নয়। এটি বাংলাদেশের আইনের শাসনের জন্য একটি কঠিন সতর্কবার্তা। এটি প্রশ্ন তোলে প্রশাসনের সক্ষমতা নিয়ে, বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে, সামাজিক মূল্যবোধ নিয়ে এবং সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন তোলে আমাদের নীরবতা নিয়ে।

আমরা কি কেবল তখনই প্রতিবাদ করব, যখন আক্রান্ত মানুষটি আমাদের আপনজন হবে? মানবিকতার সবচেয়ে বড় পরীক্ষা তো সেখানেই, যেখানে আক্রান্ত মানুষটি আমার কেউ নন।

একটি গুজব যখন একজন নারীর জীবন বিপন্ন করে, তখন সেই গুজব ছড়ানো ব্যক্তি যেমন দায়ী, তেমনি দায়ী সেই সমাজও, যে যাচাই না করেই বিশ্বাস করে। যে হাত আঘাত করে সে অপরাধী, কিন্তু যে চোখের সামনে আঘাত দেখে নীরব থাকে তার নৈতিক দায়ও অস্বীকার করা যায় না।

বাংলাদেশকে এই ভয়ংকর পথ থেকে ফিরতেই হবে। রাষ্ট্রকে স্পষ্ট করে দিতে হবে, কোনো পরিস্থিতিতেই মব হামলা গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুত তদন্ত, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং বিচার নিশ্চিত করার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব ও অপপ্রচারের বিরুদ্ধে নাগরিক সচেতনতা তৈরি করতে হবে। তবে কেবল আইন দিয়ে এই সংকটের সমাধান হবে না। প্রয়োজন বিবেকের পুনর্জাগরণ।

আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে, কোনো নারীকে অপমান করা পৌরুষ নয়। দুর্বলকে দলবদ্ধভাবে আঘাত করা সাহস নয়। গুজব বিশ্বাস করা ন্যায়বিচার নয়। আর জনতার হাতে আইন তুলে দেওয়া কখনো সভ্যতার লক্ষণ নয়। কারণ রাষ্ট্রের সবচেয়ে বড় শক্তি তার অস্ত্র নয়, তার আইন। আর আইনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার শাস্তি নয়, মানুষের বিশ্বাস। সেই বিশ্বাস আজ আহত।

নারীর ওপর ৭৩০টি মব হামলা তাই আমাদের সামনে শুধু একটি পরিসংখ্যান হয়ে দাঁড়ায় না। এটি যেন আয়নার মতো আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে, আমরা আসলে কোন বাংলাদেশ নির্মাণ করছি? এমন বাংলাদেশ, যেখানে আদালতের আগে রাস্তায় রায় ঘোষণা হয়? এমন বাংলাদেশ, যেখানে একজন নারীর নিরাপত্তা জনতার বিবেকের ওপর নির্ভর করে? নাকি এমন বাংলাদেশ, যেখানে মানুষ জানবে, তার বিরুদ্ধে যত বড় অভিযোগই উঠুক, তার বিচার হবে আইনের আলোয়, অন্ধ জনতার হাতে নয়?উত্তরটি শুধু সরকারের নয়, আমাদের সবার।

একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে সভ্য হয়, যখন তার সবচেয়ে অসহায় মানুষটিও নিশ্চিন্তে বলতে পারেন, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকতে পারে, কিন্তু আমাকে বিচার করার অধিকার কথিত জনতার নয়; আইনের।

বাংলাদেশের রাস্তায় তাই আর জনতার আদালত নয়, ফিরে আসুক আইনের শাসন। বিচার হোক আদালতে। প্রতিশোধ নয়, প্রতিষ্ঠিত হোক ন্যায়।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version