খুন, ধর্ষণ, ডাকাতি ও কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্যে পর্যটন নগরীর ভাবমূর্তি প্রশ্নের মুখে বর্তমান বিএনপি সরকার; জনবল সংকট ও দুর্বল আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনায় বাড়ছে উদ্বেগ।

কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ক্রমাবনতিতে সাধারণ মানুষের উদ্বেগ দিন দিন বাড়ছে। পর্যটননির্ভর এই জেলায় গত পাঁচ মাসে ৫৩টি হত্যাকাণ্ড, ৭টি ডাকাতি এবং ১৪টি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেছে বলে জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির তথ্য থেকে জানা গেছে। অপরাধের লাগামহীন বিস্তারকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন উঠেছে- বর্তমান প্রশাসন ও সরকারের অধীনে কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসছে না।

সম্প্রতি কক্সবাজারের নবগঠিত মাতামুহুরী উপজেলার পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নে সংঘটিত একটি ভয়াবহ ডাকাতি ও সংঘবদ্ধ ধর্ষণের ঘটনা জেলাজুড়ে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। ৮ জুন গভীর রাতে সশস্ত্র ডাকাতরা একটি বাড়ির জানালার গ্রিল কেটে প্রবেশ করে নগদ অর্থ ও স্বর্ণালংকার লুট করে। অভিযোগ রয়েছে, লুটপাটের পর তারা গৃহবধূ ও তাঁর স্কুলপড়ুয়া মেয়েকে দলবদ্ধ ধর্ষণ করে। ঘটনাটি শুধু আইনশৃঙ্খলার অবনতিই নয়, নারীর নিরাপত্তা নিয়েও নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।

এর কয়েকদিন পর পেকুয়া উপজেলার শিলখালী ইউনিয়নেও আরেকটি ডাকাতির ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ছাত্রদল নেতা মোহাম্মদ সাকিবের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ডাকাতরা পরিবারের সদস্যদের অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে নগদ অর্থ, স্বর্ণালংকার ও মোবাইল ফোন লুট করে নিয়ে যায়। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দ্রুত সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রশাসনিক উদাসীনতা লক্ষ্য করা গেছে।

স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দাবি, জানুয়ারি থেকে জুনের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত শুধু চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া এলাকাতেই অন্তত এক ডজন ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু পুলিশের পরিসংখ্যানের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতার উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। এ অবস্থায় অপরাধের প্রকৃত চিত্র আড়াল করা হচ্ছে কি না, সে প্রশ্নও উঠতে শুরু করেছে।

জেলা আইনশৃঙ্খলা কমিটির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ডিসেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সময়ে ধারাবাহিকভাবে হত্যা, ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। জানুয়ারিতে ১৫টি, ফেব্রুয়ারিতে ১০টি, মার্চে ১২টি এবং এপ্রিলে ১০টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। এসব ঘটনায় বহু ক্ষেত্রে প্রকৃত অপরাধীরা এখনও আইনের আওতার বাইরে রয়ে গেছে।

রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলেও এ পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। সম্প্রতি এক মতবিনিময় সভায় বক্তারা কক্সবাজারে খুন, ধর্ষণ, ছিনতাই ও ডাকাতির লাগামহীন বৃদ্ধিকে ভয়াবহ সংকেত হিসেবে উল্লেখ করেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরাধীরা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠেছে এবং সাধারণ মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে।

মাতামুহুরীর পূর্ব বড় ভেওলা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হারুন উর রশিদ অভিযোগ করেন, অতীতে রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় বেড়ে ওঠা প্রভাবশালী সন্ত্রাসীরা এখনও সক্রিয় রয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় নতুন অপরাধী চক্রও মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। ফলে খুন, ডাকাতি, চুরি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চকরিয়া থানার ওসি মো. মনির হোসেনও স্বীকার করেছেন যে গ্রেপ্তারের পর অনেক আসামি দ্রুত জামিনে মুক্ত হয়ে আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। এতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, জেলা সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু ও কুতুবদিয়াসহ বিভিন্ন এলাকায় হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জমি বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, প্রেমঘটিত দ্বন্দ্ব, অপহরণের পর হত্যা এবং সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্রের তৎপরতা এসব ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুর রহমান বলেন, যেভাবে অপরাধ বাড়ছে তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন জেলার জন্য এই পরিস্থিতি শুধু স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তাকেই হুমকির মুখে ফেলছে না, বরং দেশের ভাবমূর্তিকেও ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

অপরাধ দমনে দৃশ্যমান সাফল্যের অভাব, জনবল সংকট, বিচারিক প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণে ব্যর্থতা- সব মিলিয়ে কক্সবাজারে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ক্রমেই নাজুক হয়ে উঠছে। জনগণের প্রত্যাশা ছিল প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপে অপরাধ কমবে, কিন্তু বাস্তবে হত্যাকাণ্ড, ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের পরিসংখ্যান উল্টো উদ্বেগ বাড়াচ্ছে। ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারের কার্যকারিতা ও সক্ষমতা নিয়ে জনমনে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version