আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

২০০৯ থেকে ২০২৪- টানা দেড় দশক বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের দায়িত্ব নিজের হাতে রেখেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তাঁর সামগ্রিক শাসন নিয়ে বিতর্ক, সমালোচনা কিংবা রাজনৈতিক মূল্যায়ন আলাদা বিষয়। কিন্তু ‘বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনা’কে মূল্যায়ন করতে হলে ফিরে তাকাতে হবে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের সেই দীর্ঘ দেড় দশকের পরিবর্তনের দিকে। ২০০৯ সালের বাংলাদেশ আর ২০২৪ সালের বাংলাদেশ- বিদ্যুতের মানচিত্রে ছিল সম্পূর্ণ দুই ভিন্ন বাস্তবতা।

খাম্বা যুগ থেকে শতভাগ বিদ্যুতায়ন

২০০৯ সালে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ছিল প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াটের ঘরে। বিদ্যুতের ঘাটতি ছিল প্রকট। রাজধানীর বাইরে তো বটেই, দেশের বহু গ্রাম তখন নিয়মিত লোডশেডিংয়ের অন্ধকারে ডুবে থাকত। কোথাও বিদ্যুৎ থাকলেও তা ছিল অনিয়মিত। শিল্পকারখানা থেকে কৃষির সেচ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে হাসপাতাল সবখানেই বিদ্যুতের সংকট উন্নয়নের অন্যতম বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল। সেই বাস্তবতা থেকে বাংলাদেশকে বের করে আনার সবচেয়ে বড় সাফল্য ছিল প্রায় সর্বজনীন বিদ্যুতায়ন।

২০২৪ সালের মধ্যে দেশের প্রায় সব মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা সম্ভব হয়েছিল। যে গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই কেরোসিনের বাতি জ্বলত, সেখানে বিদ্যুতের আলো পৌঁছেছে। যে কৃষক সেচের জন্য অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকতেন, তাঁর সেচব্যবস্থায় বিদ্যুৎ যুক্ত হয়েছে। স্কুল, হাসপাতাল, দোকানপাট, ক্ষুদ্র ব্যবসা, শিল্পকারখানা, অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি স্তরে বিদ্যুৎ হয়ে উঠেছে অপরিহার্য অবকাঠামো। এটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর গল্প নয়; এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোর রূপান্তর।

৫ হাজার থেকে ৩০ হাজার মেগাওয়াট

শেখ হাসিনার দেড় দশকে বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার যে বিস্তার ঘটেছিল, তার পরিমাণও ছিল অভূতপূর্ব। প্রায় ৫ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার বাংলাদেশ ২০২৪ সালে এসে প্রায় ৩০ হাজার মেগাওয়াট সক্ষমতার দেশে পরিণত হয়। ভবিষ্যতের ক্রমবর্ধমান চাহিদা মাথায় রেখে ২০৪১ সালের মধ্যে ৬০ হাজার মেগাওয়াটের লক্ষ্যও নির্ধারণ করেছিলেন শেখ হাসিনা যা রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে অত্যান্ত দূরদৃষ্টিতা। পরিকল্পনাটি ছিল শুধু আজকের চাহিদা মেটানো নয়; আগামী দিনের শিল্পায়ন, নগরায়ণ, কৃষি, প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক সম্প্রসারণের জন্য আগাম সক্ষমতা তৈরি করা। এখানেই শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ নীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে। সংকট সামাল দেওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতের জন্য অবকাঠামো নির্মাণ।

রূপপুরঃ বিদ্যুৎ খাতে সবচেয়ে বড় স্বপ্ন

বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনার সময়ের সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী এবং যুগন্ধর প্রকল্পগুলোর একটি নিঃসন্দেহে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। বাংলাদেশের মতো একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প শুধু আরেকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের ঘটনা নয়। এটি প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা এবং বড় পরিসরে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ উৎপাদনের দিকে বাংলাদেশের প্রবেশের প্রতীক। রূপপুরের দুটি ইউনিট মিলিয়ে মোট উৎপাদন সক্ষমতা ২,৪০০ মেগাওয়াট। পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে গেলে এটি জাতীয় গ্রিডে বিপুল পরিমাণ নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সক্ষম হবে এবং দেশের বিদ্যুৎ চাহিদার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পূরণ করবে।

একসময় যে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ সংকটে হিমশিম খেত, সেই বাংলাদেশ পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনের পথে এগিয়ে গিয়েছিল। এই পরিবর্তনের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক সম্পূর্ণ কৃতিত্ব শেখ হাসিনা সরকারের ওপর যেমন বর্তায়, তেমনি এর কৃতিত্বের অংশীদারিত্ব অর্জনে একক বলিষ্ঠ ভবিতব্য কুশলী সিদ্ধান্তের পুরো কৃতিত্ব তাঁকে দিতেই হবে।

এক উৎসের ওপর নির্ভর না করে বহুমুখী জ্বালানি

শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ নীতির আরেকটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল জ্বালানি উৎসের বৈচিত্র্য আনার চেষ্টা। গ্যাসের পাশাপাশি কয়লা, LNG, তরল জ্বালানি, আমদানি করা বিদ্যুৎ, পারমাণবিক শক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানিও ছিল এর একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।

এটিকে শুধু ‘বিদ্যুৎ কেনা’ হিসেবে দেখলে পুরো বিষয়টি বোঝা যায় না। দক্ষিণ এশিয়ার বিদ্যুৎ সহযোগিতা, আন্তঃদেশীয় গ্রিড সংযোগ এবং আঞ্চলিক পাওয়ার ট্রেডিংয়ের যে সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে, তার সঙ্গে এই উদ্যোগ সরাসরি যুক্ত। অথচ রাজনৈতিক বাস্তবতায় ভারতকে ঘিরে নানা ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে। কিন্তু বিদ্যুৎ ও জ্বালানি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে আন্তঃসংযোগ ভবিষ্যতের আঞ্চলিক জ্বালানি নিরাপত্তারই একটি অংশ। আজকের বাংলাদেশ যা হাড়ে হাড়ে অনুধাবন করছে।

উন্নয়ন মানে শুধু বড় অবকাঠামো নয়

বিদ্যুতের উন্নয়নকে অনেক সময় কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংখ্যা কিংবা মেগাওয়াটের হিসাব দিয়ে দেখা হয়। কিন্তু এর প্রকৃত প্রভাব আরও গভীরে। বিদ্যুৎ পৌঁছানো মানে একটি গ্রামের শিশুর রাতে পড়ার সুযোগ তৈরি হওয়া, একজন কৃষকের সেচ নিশ্চিত হওয়া, একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্রে চিকিৎসা সরঞ্জাম চালু রাখা, একটি কারখানায় উৎপাদন অব্যাহত রাখা, একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তার ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ পাওয়া, একটি স্কুলে ডিজিটাল শিক্ষা চালু হওয়া, একটি দোকান বা বাজারে রাত পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড চলা।

অর্থাৎ বিদ্যুৎ নিজে কোনো শেষ লক্ষ্য নয়; এটি অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নের অন্যতম মৌলিক ভিত্তি। এই জায়গা থেকেই ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের বিদ্যুৎ খাতের পরিবর্তনকে মূল্যায়ন করতে হবে।

কারণ একটি রাষ্ট্রের উন্নয়ন মূল্যায়নের ক্ষেত্রে প্রশ্নটা শুধু হওয়া উচিত নয় কোথায় ভুল হয়েছে?প্রশ্নটা হওয়া উচিত- কোথায় কী পরিবর্তন ঘটেছে? আর সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজলে ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের বিদ্যুৎ খাতের রূপান্তরকে ছোট করে দেখার তো সুযোগ নেই; বরং বিদ্যুৎখাতকে এত দ্রুত উন্নয়নের মাইলফলকে পৌছানোর জন্য শেখ হাসিনা কুর্নিশ পাবেন।

আজকের বাস্তবতা তাই আরও বেশি প্রশ্ন তৈরি করে

লোডশেডিং বাংলাদেশে নতুন কোনো শব্দ নয়। কিন্তু যে বাংলাদেশ একসময় বিদ্যুতের ভয়াবহ সংকট থেকে বেরিয়ে এসেছিল, সেই বাংলাদেশ যদি আবার দীর্ঘ লোডশেডিং, বিদ্যুৎ বিভ্রাট, শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হওয়া কিংবা গ্রামাঞ্চলে অনিশ্চিত সরবরাহের সমস্যায় পড়ে, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, আমরা কোন দিকে যাচ্ছি? বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলের বাস্তবতা আরও কঠিন। পল্লী বিদ্যুৎ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত মানুষের অভিযোগ, স্থানীয় পর্যায়ের বিদ্যুৎকর্মীদের নিরাপত্তা, অভিযোগ ব্যবস্থাপনা এবং সরবরাহের ধারাবাহিকতা, সবকিছু মিলিয়ে বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান বাস্তবতা নতুন করে ভাবার দাবি রাখে। ভাবায়, কি চমৎকার গোছানো কৌশলে শেখ হাসিনা সামগ্রিক বিদ্যুৎখাতকে কত বড় উচ্চতায় নিয়ে গেছিলেন!

দেশ চালানো কেবল প্রশাসনিক দক্ষতার বিষয় নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, সংকট ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ভবিষ্যৎ দেখতে পারার সক্ষমতার সমন্বয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসন নিয়ে ইতিহাস নিশ্চয়ই বহু প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে। তাঁর রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, সাফল্য, ব্যর্থতা, বিতর্ক এবং সমালোচনা সবকিছুরই আলোচনা সমালোচনা হবে। কিন্তু বিদ্যুৎ খাতের ক্ষেত্রে একটি বাস্তবতা অস্বীকার করা কঠিন। ২০০৯ সালের বিদ্যুৎ সংকটে জর্জরিত বাংলাদেশ থেকে ২০২৪ সালের প্রায় সর্বজনীন বিদ্যুতায়নের বাংলাদেশে পৌঁছানো কোনো ছোট পরিবর্তন ছিল না। এটা ছিল একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন। এটি ছিল একটি রাষ্ট্রীয় অবকাঠামোগত নব-রূপান্তর। আর সেই রূপান্তরের রাজনৈতিক স্থপতিদের তালিকায় শেখ হাসিনার নাম চিরকাল থাকবেই।

ইতিহাস শেখ হাসিনাকে শেষ পর্যন্ত কীভাবে মূল্যায়ন করবে, সেই সিদ্ধান্ত সময়ের হাতে। কিন্তু বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের ২০০৯-২০২৪ অধ্যায় লিখতে গেলে শেখ হাসিনাকে বাদ দিয়ে সেই ইতিহাস লেখা সম্ভব নয়। কারণ একসময় যে দেশে সন্ধ্যা নামলেই অন্ধকার নেমে আসত, সেই দেশের কোটি মানুষের ঘরে আলো পৌঁছানোর গল্পটিও বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসেরই বিশালতর অংশ।

আর সেই গল্পের সবচেয়ে বড় অধ্যায়ের নাম- শেখ হাসিনার বিদ্যুৎ বিপ্লব। অবিস্মরণীয়, অসাধারণ বিদ্যুৎমন্ত্রী শেখ হাসিনা।।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version