মাত্র এক সপ্তাহে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার বেড়ে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ উঠেছে রেকর্ড ৭৮৫.৭ বিলিয়ন ডলারে। এই নজিরবিহীন উল্লম্ফনের ফলে রাশিয়াকে পেছনে ফেলে বিশ্বে সর্বোচ্চ বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভধারী দেশের তালিকায় চতুর্থ অবস্থানে উঠে এসেছে ভারত।
ভারতের অর্থনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে রিজার্ভের এই রেকর্ড। রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার (RBI) প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ৪ সেপ্টেম্বর শেষ হওয়া সপ্তাহে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে প্রায় ৪৪.৯ বিলিয়ন ডলার, যা এক সপ্তাহে বৃদ্ধির হিসাবে দেশটির ইতিহাসে সর্বোচ্চ। এর ফলে মোট রিজার্ভ দাঁড়িয়েছে ৭৮৫.৭১ বিলিয়ন ডলার।
এর আগে ২৮ আগস্ট শেষ হওয়া সপ্তাহে ভারতের রিজার্ভ ছিল প্রায় ৭৪০.৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ মাত্র সাত দিনের ব্যবধানে রিজার্ভে যোগ হয়েছে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন ডলার।
রিজার্ভের এই রেকর্ড বৃদ্ধির ফলে ভারত এখন চীন, জাপান ও সুইজারল্যান্ডের পর বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভধারী দেশ। এর আগে চতুর্থ অবস্থানে ছিল রাশিয়া।
বর্তমানে শীর্ষে রয়েছে চীন, যার রিজার্ভ প্রায় ৩.৮৫ ট্রিলিয়ন ডলার। দ্বিতীয় জাপানের রিজার্ভ প্রায় ১.২১ ট্রিলিয়ন ডলার এবং তৃতীয় সুইজারল্যান্ডের প্রায় ১.০৯ ট্রিলিয়ন ডলার।
এই রেকর্ড বৃদ্ধির পেছনে বড় ভূমিকা রেখেছে রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার বিশেষ বৈদেশিক মুদ্রা সোয়াপ ব্যবস্থা এবং বিদেশে থাকা ভারতীয়দের আমানত থেকে আসা বিপুল ডলার প্রবাহ।
জুন থেকে আগস্টের শেষ পর্যন্ত RBI-এর বিশেষ ব্যবস্থার মাধ্যমে মোট প্রায় ১৩৬.৩ বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা প্রবাহ সংগঠিত হয়। এর মধ্যে প্রায় ১২৭ বিলিয়ন ডলার এসেছে FCNR(B) আমানত থেকে।
এই বিপুল ডলার প্রবাহ ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদকে দ্রুত বাড়িয়ে দিয়েছে। শুধু সর্বশেষ সপ্তাহেই বৈদেশিক মুদ্রার সম্পদ প্রায় ৪৭.৪ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। অন্যদিকে, একই সময়ে স্বর্ণের রিজার্ভ প্রায় ২.৬ বিলিয়ন ডলার কমেছে, ফলে স্পষ্ট যে সর্বশেষ রেকর্ড বৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি ছিল ডলারভিত্তিক সম্পদ।
বৈদেশিক মুদ্রার বড় রিজার্ভ একটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক নিরাপত্তা বলয় হিসেবে কাজ করে। আমদানি ব্যয় মেটানো, বৈদেশিক ঋণের চাপ সামলানো এবং আন্তর্জাতিক বাজারে মুদ্রার অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হাতে বাড়তি সক্ষমতা তৈরি হয়।
ভারতের ক্ষেত্রে এর তাৎপর্য আরও বেশি, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে তেলের দাম বৃদ্ধি ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার কারণে রুপির ওপর চাপ তৈরি হয়েছে। ১৫ সেপ্টেম্বর রুপি প্রতি ডলারে প্রায় ৯৫.৯২ পর্যন্ত দুর্বল হয়েছিল। এমন পরিস্থিতিতে বিপুল বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ RBI-কে বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী ডলার সরবরাহ করে অতিরিক্ত অস্থিরতা ঠেকানোর সুযোগ দেয়।
তবে রেকর্ড রিজার্ভ মানেই সব চাপ কেটে গেছে এমন নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক রিজার্ভ বৃদ্ধির বড় অংশ এসেছে বিশেষ নীতি ও আমানত-ভিত্তিক ডলার প্রবাহ থেকে। ফলে এই বৃদ্ধির কতটা দীর্ঘমেয়াদি এবং কতটা সাময়িক, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।
একদিকে যখন আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম বাড়ছে এবং রুপির ওপর চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ভারতের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে- এই বৈপরীত্যই বর্তমানে ভারতীয় অর্থনীতির অন্যতম আলোচিত বিষয়।
শক্তিশালী রিজার্ভ ভারতের বাহ্যিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক ধাক্কা সামলানোর সক্ষমতা বাড়ায়। তবে তেলের উচ্চমূল্য, বৈদেশিক বিনিয়োগের প্রবাহ এবং আন্তর্জাতিক সুদের হার- এসব বিষয় আগামী দিনে রিজার্ভ ও রুপির ওপর বড় প্রভাব ফেলতে পারে।


