ভারতের কূটনৈতিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ তৎপরতা দেখা দিয়েছে। একই দিনে দেশটির জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল চীন সফরে গেছেন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সীমান্ত ইস্যুতে চীনের সঙ্গে সংলাপ এবং রাশিয়ার সঙ্গে কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক- দুই দিকেই সমান গুরুত্ব দিচ্ছে নয়াদিল্লি।
দুই দিনের সফরে সোমবার বেইজিং পৌঁছান অজিত দোভাল। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সীমান্ত ইস্যুতে ভারতের বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে তিনি চীনা কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। মঙ্গলবার চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই এবং ভাইস প্রেসিডেন্ট হান ঝেংয়ের সঙ্গে তার বৈঠকের কথা রয়েছে।
২০২০ সালে লাদাখের গালওয়ান উপত্যকায় প্রাণঘাতী সংঘর্ষের পর ভারত ও চীনের মধ্যে সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়ে একাধিক দফায় আলোচনা হয়েছে। দীর্ঘদিনের এই বিরোধ নিরসনে সামরিক ও কূটনৈতিক পর্যায়ে সংলাপ অব্যাহত রেখেছে দুই দেশ। বেইজিংও জানিয়েছে, সীমান্ত ইস্যুতে উভয় পক্ষ গভীর আলোচনা চালিয়ে যাবে এবং সীমান্ত এলাকায় শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার চেষ্টা করবে।
ভারত ও চীনের মধ্যকার প্রায় ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমান্ত বহু বছর ধরে দুই দেশের সম্পর্কের অন্যতম সংবেদনশীল বিষয়। তবে সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধপূর্ণ বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সামাল দেওয়ার পাশাপাশি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে উভয় দেশ।
অন্যদিকে, একই দিনে মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর। বৈঠকে দুই দেশের বাণিজ্য, কৃষি ও সার সরবরাহসহ পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠক শেষে পুতিন জানান, চলতি বছরে ভারত-রাশিয়া দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। ভারতের কৃষি খাতের প্রয়োজন মেটাতে রাশিয়া সার সরবরাহ আরও বাড়াতে আগ্রহী বলেও জানান তিনি। এর মধ্য দিয়ে খাদ্য ও কৃষি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রেও দুই দেশের সহযোগিতা আরও বিস্তৃত হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
রুশ প্রেসিডেন্ট আরও জানিয়েছেন, আসন্ন সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) সম্মেলনের ফাঁকে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তার বৈঠকের সম্ভাবনা রয়েছে। পাশাপাশি ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেশকভ জানিয়েছেন, সেপ্টেম্বরে নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠেয় ব্রিকস সম্মেলনে পুতিনের অংশগ্রহণের বিষয়ে মস্কো আশাবাদী।
আগামী মাসে ভারতে ব্রিকস সম্মেলন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সম্মেলনে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ও রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের অংশগ্রহণ নিয়ে দিল্লি ইতিবাচক প্রত্যাশা করছে। ফলে সম্মেলনের আগে ভারতের শীর্ষ দুই কূটনীতিকের চীন ও রাশিয়া সফরকে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
চীনের সঙ্গে সীমান্ত উত্তেজনা কমিয়ে সংলাপের পরিবেশ বজায় রাখা এবং একই সঙ্গে রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহ্যগত বন্ধুত্ব ও কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী করা- দুই ক্ষেত্রেই ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি অনুসরণ করছে ভারত।
বিশেষ করে রাশিয়ার সঙ্গে প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, বাণিজ্য, কৃষি ও প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিনের সহযোগিতা রয়েছে ভারতের। অন্যদিকে, চীনের সঙ্গে সীমান্ত বিরোধ থাকলেও দুই দেশের অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক স্বার্থের কারণে যোগাযোগ ও সংলাপ অব্যাহত রাখার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে।
সব মিলিয়ে অজিত দোভালের বেইজিং সফর এবং জয়শঙ্করের মস্কো সফর ভারতের বহুমুখী কূটনৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করেছে। একদিকে সীমান্ত বিরোধ নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা, অন্যদিকে রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ও কৌশলগত সহযোগিতা- দুই পথেই নিজেদের জাতীয় স্বার্থকে সামনে রেখে এগোচ্ছে নয়াদিল্লি।


