মালয়েশিয়ায় বিদেশি শ্রমিকদের ভিসা নবায়ন ও স্বাস্থ্য পরীক্ষায় জালিয়াতির উদ্দেশ্যে সক্রিয় একটি সংঘবদ্ধ পাসপোর্ট জালিয়াতি চক্রের সন্ধান পেয়েছে দেশটির অভিবাসন বিভাগ। প্রায় এক বছর ধরে সক্রিয় এই চক্রটি বিশেষ করে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় ‘অযোগ্য’ ঘোষিত বিদেশি কর্মীদের জন্য ভুয়া পাসপোর্ট তৈরি করে আসছিল। অভিযানে দুই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তাদের একজনকে চক্রটির মূল পরিকল্পনাকারী বা ‘মূলহোতা’ হিসেবে চিহ্নিত করেছে মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ।
অভিবাসন মহাপরিচালক দাতুক জাকারিয়া শাবান জানান, গত ৫ আগস্ট পাসপোর্ট জালিয়াতি ও বিকৃতির অভিযোগে তিন ইন্দোনেশীয় নাগরিককে গ্রেপ্তার করা হয়। তাদের জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে গোয়েন্দা ও বিশেষ অভিযান বিভাগ এক সপ্তাহ ধরে নজরদারি চালায়। পরে কুয়ালালামপুরের তামান ওয়াহ্যু ও কাম্পুং বাতুর দুটি আবাসিক ইউনিটে অভিযান চালিয়ে দুই বাংলাদেশিকে গ্রেপ্তার করা হয়।
তদন্তে জানা গেছে, চক্রটি মূলত ‘ফরেন ওয়ার্কার্স মেডিকেল এক্সামিন মনিটরিং এজেন্সি’- ফোমেমার স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অযোগ্য ঘোষিত বিদেশি শ্রমিকদের টার্গেট করত। এ ক্ষেত্রে অযোগ্য ব্যক্তির পাসপোর্টে ছবি পরিবর্তন করে একই পরিচয় বজায় রাখা হতো। এরপর একজন সুস্থ ব্যক্তি ওই পরিচয় ব্যবহার করে স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অংশ নিতেন। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বিভ্রান্ত করতে জাল পাসপোর্টে ভুয়া প্রবেশ ও প্রস্থানের ইমিগ্রেশন সিলও ব্যবহার করা হতো।
প্রতিটি লেনদেনে চক্রটি ২০০ থেকে ৩০০ মালয়েশিয়ান রিঙ্গিত পর্যন্ত আদায় করত বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ। গ্রাহক সংগ্রহে তারা প্রকাশ্যে কোনো বিজ্ঞাপন দিত না; বরং ফ্রিল্যান্স এজেন্ট ও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে গোপনে গ্রাহক সংগ্রহ করত।
অভিযানে বিপুল পরিমাণ জালিয়াতির সরঞ্জাম উদ্ধার করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দুটি আসল বাংলাদেশি পাসপোর্ট, নয়টি জাল বাংলাদেশি পাসপোর্ট, তিনটি মোবাইল ফোন, দুটি ল্যাপটপ, একটি প্রিন্টার, প্রায় ৭০০টি পাসপোর্ট পৃষ্ঠা এবং বিভিন্ন দেশের প্রায় ৩০০টি ভুয়া পাসপোর্ট কভার।
এ ছাড়া কুয়ালালামপুর আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবেশের সন্দেহজনক জাল ইমিগ্রেশন স্ট্যাম্প এবং ইন্দোনেশিয়ার বাতাম ও বাংলাদেশের ঢাকা থেকে প্রস্থানের নকল সিলও উদ্ধার করা হয়েছে। মূল পরিকল্পনাকারীর একটি ই-ওয়ালেট অ্যাকাউন্ট থেকে অবৈধভাবে অর্জিত প্রায় ২ লাখ রিঙ্গিতও জব্দ করেছে তদন্তকারীরা।
কর্তৃপক্ষের ধারণা, উদ্ধার করা উপকরণের পরিমাণ দেখে বোঝা যায়- চক্রটির কার্যক্রম ছিল যথেষ্ট বিস্তৃত। এসব উপকরণ দিয়ে প্রায় ২ হাজার জাল পাসপোর্ট তৈরির সক্ষমতা তাদের ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমনকি কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটি পাসপোর্টকে নিখুঁতভাবে জাল করার সক্ষমতাও চক্রটির ছিল বলে জানিয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
গ্রেপ্তার দুই বাংলাদেশির মধ্যে একজন প্রায় নয় বছর ধরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন এবং তার কাছে নির্মাণ খাতের একটি অস্থায়ী কর্মসংস্থান ভ্রমণ পাস ছিল। অপর ব্যক্তির ভিসার মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়ে গিয়েছিল।
গ্রেপ্তারদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার অভিবাসন আইন ১৯৫৯/৬৩ অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। মূল পরিকল্পনাকারীর বিরুদ্ধে আইনের ৫৫ডি ও ৫৬(১)(ডি) ধারায় এবং অপর ব্যক্তির বিরুদ্ধে ১৫(১)(সি) ধারায় তদন্ত চলছে।
মালয়েশিয়ার অভিবাসন বিভাগ বলছে, বিদেশি শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা, ভিসা নবায়ন ও বৈধ অভিবাসন প্রক্রিয়াকে প্রতারণার মাধ্যমে পাশ কাটাতে এমন চক্রের তৎপরতা গুরুতর হুমকি তৈরি করছে। তাই চক্রটির সঙ্গে জড়িত অন্য সদস্য ও তাদের গ্রাহকদের শনাক্ত করতে তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।


