আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

কবি মেহেরুননেসা সেই বিরল মানুষদের একজন, যার জীবন যেমন সংগ্রামের, তেমনি মৃত্যু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে অন্যতম ভয়াবহ, হৃদয়বিদারক ও লোমহর্ষক হত্যাকাণ্ডের প্রতীক।

১৯৪২ সালের ২০ আগস্ট কলকাতার খিদিরপুরে জন্ম নেওয়া ছোট্ট মেয়ে “রানু” কোনো রাজপ্রাসাদের সন্তান ছিলেন না। তিনি জন্মেছিলেন এক মধ্যবিত্ত পরিবারে, যেখানে স্বপ্ন ছিল, সীমাবদ্ধতা ছিল, সংগ্রাম ছিল। কিন্তু জন্মের বহু আগেই যেন নিয়তি তার কপালে লিখে রেখেছিল এক অসাধারণ জীবনের গল্প। যে গল্পের শেষ অধ্যায় লেখা হবে রক্তে, অশ্রুতে এবং স্বাধীনতার লাল-সবুজ পতাকায়।

সেই সময়ের সমাজ মেয়েদের জন্য ছিল সংকীর্ণ। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দরজা তার জন্য প্রায় বন্ধই ছিল। কিন্তু জ্ঞান কখনো চার দেয়ালের অনুমতি চায় না। বাবা আব্দুর রাজ্জাক ও বড় বোন মোমেনা খাতুনের স্নেহে, নিজের অদম্য আগ্রহে ঘরের ভেতরেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক স্বশিক্ষিত আলোকিত মানুষ। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ ছিল না, কিন্তু ছিল জীবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ শিক্ষা।

দেশভাগের বিভীষিকা তার শৈশবকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কলকাতার সচ্ছল ব্যবসায়ী পরিবার মুহূর্তেই হয়ে যায় সর্বস্বান্ত। জ্বলতে থাকে দোকান, লুট হয়ে যায় ঘরবাড়ি, ভেঙে পড়ে নিরাপত্তার সব দেয়াল। বাবার সঙ্গে কয়লার দোকানে কাজ করতে গিয়ে তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন শ্রম, দারিদ্র্য আর মানুষের অবদমিত কান্না। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই জন্ম নেয় সেই অবিস্মরণীয় পঙক্তি-

“কয়লা খনির গভীরে দেখেছি জ্বলতে, জ্বালানীবিহীন মহাজীবনের সলতে।”

এই একটি পঙ্‌ক্তিই যেন বলে দেয় তিনি কেবল কবিতা লিখতেন না; তিনি মানুষের দুঃখকে ভাষা দিতেন।

১৯৫০ সালে পরিবার পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসে। কিন্তু ভাগ্য যেন বারবার তাকে পরীক্ষা নিয়েছে। বাবার ক্যানসার, সংসারের অনটন, ছোট ভাইদের দায়িত্ব, সবকিছুই এক তরুণীর কাঁধে এসে পড়ে। তিনি বাংলা একাডেমিতে অনুলিখন করেছেন, সংবাদপত্রে প্রুফরিডিং করেছেন, চাকরি করেছেন, রাত জেগেছেন, কিন্তু কখনো কলম নামিয়ে রাখেননি।

মাত্র দশ বছর বয়সে তার কবিতা প্রকাশিত হয়। আর মাত্র বারো বছর বয়সেই তিনি লিখে ফেলেন রাষ্ট্রভাষা বাংলার দাবিতে প্রতিবাদী কবিতা। যে বয়সে শিশুরা খেলনা নিয়ে ব্যস্ত থাকে, সে বয়সেই মেহেরুননেসা লিখছিলেন শোষণের বিরুদ্ধে, অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জাতির অধিকারের পক্ষে।

স্বাভাবিকভাবেই পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর চোখে তিনি হয়ে ওঠেন সন্দেহভাজন। পুলিশ বাড়িতে আসে, ভয় দেখায়। কিন্তু ইতিহাস বলে, যে কলম সত্য লিখতে শেখে, তাকে ভয় দিয়ে থামানো যায় না।

ষাটের দশকে তিনি কেবল কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন সাংস্কৃতিক যোদ্ধা, একজন রাজনৈতিক সচেতন সংগঠক, একজন প্রতিবাদী কণ্ঠস্বর। ভাষাশহীদদের উদ্দেশে তার লেখা কবিতায় ছিল প্রতিরোধের দীপ্ত ঘোষণা-

“শহীদ ভাইরা! স্বর্গ শিখর হোতে
চোখ মেলে দ্যাখো আজ বাংলার
পীচমোড় কালো পথে
তোমাদের যত উত্তরসূরী
বুলেটের মুখে হাসে।”

এই কয়েকটি লাইন যেন পুরো একটি প্রজন্মের আত্মপরিচয়।

মিরপুরের মতো অবাঙালি-অধ্যুষিত এলাকায় দাঁড়িয়ে তিনি গড়ে তুলেছিলেন অ্যাকশন কমিটি। ৭ মার্চ তিনি ছুটে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষণ শুনতে। ২৩ মার্চ পাকিস্তানের পতাকার পরিবর্তে নিজের বাড়ির ছাদে উড়িয়েছিলেন স্বাধীন বাংলার মানচিত্রখচিত পতাকা। সেই পতাকা ছিল কেবল কাপড়ের টুকরো নয়; সেটি ছিল এক নারীর অবিচল সাহসের ঘোষণা।

কিন্তু সাহসেরও মূল্য দিতে হয়। ২৫ মার্চের গণহত্যার পর মিরপুর কার্যত মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়। তাকে নিরাপদ স্থানে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু একজন মেয়ের কাছে তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল- মাকে আর ছোট দুই ভাইকে রেখে কোথায় যাবেন?

তিনি যাননি। কারণ তিনি শুধু কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন একজন কন্যা, একজন বোন, একজন দায়িত্ববান মানুষ।

তারপর আসে ২৭ মার্চ। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন কিছু দিন আছে, যেগুলো লিখতে গেলেও কলম কেঁপে ওঠে। সেদিন উন্মত্ত বিহারী ও রাজাকাররা তার বাড়িতে ঢুকে প্রথমে দুই ভাইকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। মায়ের চোখের সামনে সন্তানদের হত্যা করা হয়। মায়ের জীবনও রক্ষা পায়নি।

সবশেষে মেহেরুননেসার ওপর নেমে আসে পাশবিকতার চূড়ান্ত রূপ। তাকে অকথ্য নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়। তারপর তার খণ্ডিত মস্তক নিজের চুলের বেণি দিয়ে সিলিং ফ্যানে ঝুলিয়ে রেখে হত্যাকারীরা উল্লাস করে।

মানবসভ্যতার ইতিহাসে বর্বরতার অসংখ্য অধ্যায় রয়েছে। কিন্তু কিছু দৃশ্য এমন থাকে, যা ভাষাকেও পরাজিত করে। মেহেরুননেসার হত্যাকাণ্ড সেই ইতিহাসেরই একটি নির্মম প্রতীক।

তার মৃত্যু ছিল না কেবল একজন কবির মৃত্যু; সেদিন হত্যা করা হয়েছিল একটি সম্ভাবনাকে, একটি আলোকিত ভবিষ্যৎকে, একটি জাতির সাংস্কৃতিক আত্মাকে।

আজ স্বাধীন বাংলাদেশের আকাশে লাল-সবুজ পতাকা ওড়ে। আমরা স্বাধীন দেশে দাঁড়িয়ে কবিতা লিখি, গান গাই, মত প্রকাশ করি। কিন্তু সেই স্বাধীনতার প্রতিটি রঙের ভেতরে লুকিয়ে আছে অসংখ্য অজানা ও অল্পচর্চিত শহীদের রক্ত। মেহেরুননেসা তাদেরই একজন, যিনি বন্দুক হাতে যুদ্ধ করেননি, কিন্তু তার কলম ছিল একটি জাতির মুক্তির অস্ত্র।

আমরা প্রায়ই মুক্তিযুদ্ধের সামরিক বীরদের স্মরণ করি। কিন্তু সাংস্কৃতিক যোদ্ধাদের, কবিদের, লেখকদের আত্মত্যাগ অনেক সময় ইতিহাসের প্রান্তিক পাতায় হারিয়ে যায়। অথচ একটি জাতিকে মুক্ত করার জন্য যেমন অস্ত্র প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন চেতনার আগুন জ্বালানো শব্দেরও। সেই আগুন জ্বালিয়েছিলেন মেহেরুননেসা।

তিনি বেঁচে থাকলে হয়তো বাংলা সাহিত্যের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র হয়ে উঠতেন। কিন্তু নিয়তি তাকে অন্য এক অমরত্ব দিয়েছে, তিনি আজ স্বাধীন বাংলাদেশের রক্তলেখা ইতিহাসের এক অনির্বাণ শিখা।

মেহেরুননেসাকে স্মরণ করা মানে শুধু একজন শহীদ কবিকে স্মরণ করা নয়; বরং স্মরণ করা সেই অবিনাশী সত্যকে, স্বাধীনতার বৃক্ষ কখনো বিনা মূল্যে জন্মায় না। তার শেকড়ে মিশে থাকে কবির কালি, মায়ের অশ্রু, ভাইয়ের রক্ত এবং এক অদম্য জাতির মুক্তির স্বপ্ন।

আর তাই ইতিহাস যতদিন বেঁচে থাকবে, বাংলাদেশের লাল-সবুজ পতাকা যতদিন আকাশে উড়বে, ততদিন কবি মেহেরুননেসার নাম উচ্চারিত হবে গভীর শ্রদ্ধায়, নীরব অশ্রুতে এবং অবিনাশী কৃতজ্ঞতায়।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার, রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version