দিল্লিতে এক মঞ্চে রাশিয়া-চীন-ইরানসহ ১১ দেশ- বিশ্ব জনসংখ্যার ৪৯.৫%, বৈশ্বিক জিডিপির ৪০% ও বাণিজ্যের ২৬% প্রতিনিধিত্বকারী জোটের নেতৃত্বে ভারত; মোদির বার্তা- ‘বিশ্বের কল্যাণের বিষয়টিও এখানে স্থান পাবে’
বিশ্ব যখন ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, বাণিজ্যযুদ্ধ এবং পরাশক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান দ্বন্দ্বে অস্থির, ঠিক তখনই নয়াদিল্লিতে বসেছে অষ্টাদশ ব্রিকস সম্মেলনের মহামঞ্চ। শনিবার ও রোববার ভারত মণ্ডপমে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে মুখোমুখি হচ্ছেন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং, ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেস্কিয়ান এবং আয়োজক দেশ ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।
এবারের সম্মেলনের গুরুত্ব শুধু একটি অর্থনৈতিক জোটের বৈঠকে সীমাবদ্ধ নয়। বরং যুদ্ধ, নিষেধাজ্ঞা, বাণিজ্যিক চাপ, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং পশ্চিমা নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার বিকল্প নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে নতুন সমীকরণ তৈরি হচ্ছে, তখন দিল্লিতে ব্রিকসের এই সমাবেশকে বহুমেরু বিশ্বব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক মঞ্চ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের পররাষ্ট্রনীতির জন্য এবারের সম্মেলনের তাৎপর্য বুঝতে ব্রিকসের সম্মিলিত অর্থনৈতিক ও জনমিতিক শক্তির দিকে তাকানোই যথেষ্ট।
বর্তমানে ব্রিকসের সদস্য ১১টি দেশ- ব্রাজিল, রাশিয়া, ভারত, চীন, দক্ষিণ আফ্রিকা, মিশর, ইথিওপিয়া, ইরান, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও ইন্দোনেশিয়া। এই দেশগুলো সম্মিলিতভাবে বিশ্বের প্রায় ৪৯.৫ শতাংশ জনসংখ্যা, ৪০ শতাংশ বৈশ্বিক জিডিপি এবং ২৬ শতাংশ আন্তর্জাতিক বাণিজ্য প্রতিনিধিত্ব করে।
অর্থাৎ, ব্রিকসকে কোনো ছোট আঞ্চলিক জোট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এশিয়া, ইউরোপ, আফ্রিকা, মধ্যপ্রাচ্য ও লাতিন আমেরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অর্থনীতি ও জ্বালানি-সমৃদ্ধ দেশগুলোকে একই প্ল্যাটফর্মে এনেছে এই জোট।
এই শক্তির অন্যতম কেন্দ্র চীন- বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতি এবং ব্রিকসের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শক্তি। ভারত দ্রুত বর্ধনশীল বৃহৎ অর্থনীতি হিসেবে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। অন্যদিকে রাশিয়া জ্বালানি ও সামরিক সক্ষমতায় এবং সৌদি আরব-সংযুক্ত আরব আমিরাত-ইরান জ্বালানি ও মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বহন করে। ফলে ব্রিকসের সম্মিলিত শক্তিকে শুধু জিডিপির অঙ্ক দিয়ে বিচার করলে এর প্রকৃত প্রভাব পুরোপুরি বোঝা যাবে না।
শুক্রবারই ভারতে পৌঁছেছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই দিনে পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। দুই নেতা অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি, মহাকাশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা করেছেন।
অন্যদিকে, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দিল্লি সফরও বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০২০ সালের সীমান্ত সংঘাতের পর ভারত-চীন সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যে তাঁর উপস্থিতি দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে। মোদি-শি বৈঠকের দিকেও তাই আন্তর্জাতিক মহলের নজর রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেস্কিয়ানের উপস্থিতি। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সঙ্গে সংঘাতের মধ্যে তাঁর দিল্লি সফর ব্রিকসের আলোচনায় পশ্চিম এশিয়ার সংকটকে আরও সামনে নিয়ে এসেছে।
সম্মেলনের আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের রাষ্ট্রপ্রধানেরা ব্রিকস সম্মেলনে সমবেত হবেন এবং তিনি আশা করেন, বিভিন্ন বিষয়ে ইতিবাচক ও অর্থপূর্ণ আলোচনা হবে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, বিশ্বের কল্যাণের বিষয়টিও আলোচনায় স্থান পাবে।
ভারতের এই অবস্থান অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ নয়াদিল্লি একই সময়ে রাশিয়া, ইরান ও চীনের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগাযোগ বজায় রাখছে; আবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও কৌশলগত ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করছে। অর্থাৎ ভারত কোনো একক শক্তির শিবিরে নিজেকে আটকে না রেখে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনের নীতি ধরে রাখার চেষ্টা করছে।
ব্রিকসের ২০২৬ সালের সভাপতিত্ব করছে ভারত। ভারতের এবারের সভাপতিত্বের মূল থিম-“Building for Resilience, Innovation, Cooperation and Sustainability”। অর্থাৎ স্থিতিস্থাপকতা, উদ্ভাবন, সহযোগিতা ও টেকসই উন্নয়নকে সামনে রেখে ব্রিকসকে আরও কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়েছে দিল্লি।
একদিকে, দিল্লি রাশিয়ার সঙ্গে ঐতিহাসিক কৌশলগত সম্পর্ক বজায় রেখেছে। অন্যদিকে চীনের সঙ্গে সীমান্ত ও বাণিজ্যিক বিরোধ থাকলেও কূটনৈতিক যোগাযোগ বাড়ানোর চেষ্টা করছে। ইরানের সঙ্গেও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি ও আঞ্চলিক যোগাযোগের স্বার্থ রয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সঙ্গেও ভারতের সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
এই বহুমুখী সম্পর্কের কারণে ব্রিকসের মতো প্ল্যাটফর্মে ভারত এমন একটি অবস্থানে রয়েছে, যেখানে পশ্চিম ও অ-পশ্চিম- দুই পক্ষের সঙ্গেই কথা বলার সক্ষমতা নয়াদিল্লির রয়েছে।
এবারের ব্রিকস আলোচনায় জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য বাড়ানো, অর্থনৈতিক সহযোগিতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, সরবরাহব্যবস্থা এবং পশ্চিমা-নির্ভর আর্থিক কাঠামোর বিকল্প তৈরির বিষয়গুলো গুরুত্ব পাচ্ছে। রাশিয়া ও চীন ব্রিকসকে পশ্চিমা আধিপত্যের ভারসাম্য তৈরির একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখছে। ইরানও পশ্চিমা আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা কমানোর পক্ষে অবস্থান নিয়েছে।
তবে ভারত ব্রিকসকে সরাসরি কোনো ‘পশ্চিমবিরোধী জোটে’ রূপান্তরের বিষয়ে সতর্ক। কারণ ভারতের স্বার্থ হলো- বিশ্বব্যবস্থায় নিজের প্রভাব বাড়ানো, কিন্তু একই সঙ্গে সব বড় শক্তির সঙ্গে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্পর্ক ধরে রাখা।
এ কারণেই দিল্লির ব্রিকস কূটনীতি শুধু রাশিয়া-চীনকে কাছে টানার কৌশল নয়; বরং ভারতকে বিশ্ব রাজনীতির মধ্যমণি হিসেবে প্রতিষ্ঠার বৃহত্তর প্রচেষ্টা।
ব্রিকসের সম্মিলিত শক্তি নিঃসন্দেহে বিশাল। কিন্তু এই জোটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জও অভ্যন্তরীণ মতপার্থক্য। চীন-ভারত সম্পর্ক, ইরান-সংকট, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বিভিন্ন সদস্যের ভিন্ন সম্পর্ক এবং অর্থনৈতিক স্বার্থের পার্থক্য ব্রিকসের ঐক্যের সামনে বড় পরীক্ষা তৈরি করছে।
তাই দিল্লির সম্মেলন শেষ হওয়ার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হবে- ব্রিকস কি শুধু বিশ্বের অর্ধেক জনসংখ্যা ও ৪০ শতাংশ অর্থনীতিকে এক ছাতার নিচে আনার একটি জোট হিসেবেই থাকবে, নাকি সত্যিই বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেওয়ার মতো শক্তিতে পরিণত হবে?
আর সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মঞ্চ এখন নয়াদিল্লি- যেখানে যুদ্ধের উত্তাপের মধ্যেও ভারত এক টেবিলে বসাচ্ছে পুতিন, জিনপিং, পেজেস্কিয়ানসহ বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ শক্তিগুলোকে।


