আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

শত্রু সম্পত্তি থেকে অর্পিত সম্পত্তি। নাম বদলেছে, রাষ্ট্র বদলেছে, সরকার বদলেছে; বদলায়নি শুধু দখলের ইতিহাস।

১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি। পাকিস্তানের রাষ্ট্রপতি আইয়ুব খান দুটি গুরুত্বপূর্ণ কাগজে স্বাক্ষর করলেন। প্রথমটি জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের আদেশ। ১৯৬৫ সালের ভারত পাকিস্তান যুদ্ধের সময় যে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল, তার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে আদেশে বলা হলো, সেই পরিস্থিতি আর বিদ্যমান নেই। দ্বিতীয় কাগজটি ছিল একটি অধ্যাদেশ। জরুরি অবস্থার অধিকাংশ বিধান বাতিল হলো। কিন্তু যুদ্ধের সময় প্রবর্তিত ‘শত্রু সম্পত্তি’ সংক্রান্ত বিধান আলাদা করে বহাল রাখা হলো।

অর্থাৎ যুদ্ধ শেষ, জরুরি অবস্থা শেষ, কিন্তু যুদ্ধের অজুহাতে রাষ্ট্র যে সম্পত্তি নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল, তার নিয়ন্ত্রণ শেষ হলো না। আজ ৫৭ বছর পরও সেই জমির উত্তরাধিকার বহন করছে বাংলাদেশ। শুধু নাম বদলেছে। ‘শত্রু সম্পত্তি’ হয়েছে ‘অর্পিত সম্পত্তি’। অর্পণ মানে স্বেচ্ছায় তুলে দেওয়া। কিন্তু এই জমির বড় অংশ কেউ রাষ্ট্রকে স্বেচ্ছায় তুলে দেয়নি। রাষ্ট্র প্রথমে তালিকাভুক্ত করেছে, দখলে নিয়েছে, পরে সেই তালিকার নাম পরিবর্তন করেছে।

সরকারি হিসাবে অর্পিত সম্পত্তির পরিমাণ প্রায় ৬ লাখ ৪৩ হাজার একর। ২০০১ সালে ফেরত দেওয়ার আইন হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল হয়েছে। রায়ও হয়েছে। কিন্তু রায়ের পর জমি ফেরত পাওয়ার গল্পটি যেন আইনের চেয়েও দীর্ঘ। ২১ জেলার আপিল ট্রাইব্যুনালে চূড়ান্তভাবে নিষ্পত্তি হওয়া ২ হাজার ৭৬৮টি মামলার মধ্যে জেলা প্রশাসন জমি বুঝিয়ে দিয়েছে মাত্র ৫৪৮টিতে, প্রায় ১৯ শতাংশ। অথচ আইনে রায়ের ৪৫ দিনের মধ্যে জমি বুঝিয়ে দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অর্থাৎ রায় হয়েছে, কিন্তু জমি ফেরেনি। এখানেই প্রশ্নটি শুধু জমির নয়, প্রশ্নটি রাষ্ট্রের চরিত্রের।

‘পূর্ববঙ্গের জমি হিন্দুদের ছিল’ এই কথাটি এই বিতর্কের দুই পক্ষই বলে। কিন্তু এর অর্থ বুঝতে হলে আরও পেছনে যেতে হয়। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তে কোম্পানি জমিদারদের রাজস্ব আদায়ের অধিকার ও জমিদারি স্বত্বকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেয়। কলকাতাকেন্দ্রিক বণিক ও কেরানি শ্রেণির অনেকে জমিদারি কিনে নেন। তাদের বড় অংশ হিন্দু ছিলেন। তবে ঠিক কত শতাংশ, তার নির্ভরযোগ্য সমকালীন রাজস্ব পরিসংখ্যান নেই। ১৯৩৭ সালের নির্বাচনী প্রচারে এ কে ফজলুল হক জমিদারদের ৯৫ শতাংশ হিন্দু বলেছিলেন, কিন্তু রাজনৈতিক বক্তৃতার এই সংখ্যাকে সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।

আসল বিষয়টি ছিল শ্রেণি। পূর্ববঙ্গের কৃষক সমাজের বড় অংশ ছিল মুসলমান। জমিদারি ও মহাজনি ব্যবস্থার বড় অংশ ছিল শহরকেন্দ্রিক এবং সেখানে হিন্দুদের প্রাধান্য ছিল। ত্রিশের মহামন্দায় পাটের দাম পড়ে গেলে পূর্ববঙ্গের মুসলিম কৃষকরা হিন্দু মহাজনের ঋণে আটকে পড়েছিলেন। পশ্চিমবঙ্গের কৃষকরাও নিজ নিজ অঞ্চলের মহাজনি ঋণের চাপে পড়েছিলেন। একই অর্থনৈতিক সংকট দুই অঞ্চলে দুই রকম সামাজিক ও রাজনৈতিক ভাষা পেল। ১৯৩৭ সালে ফজলুল হকের রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল জমিদারি উচ্ছেদ। ১৯৪৬ সালে মুসলিম লীগের রাজনীতির কেন্দ্রে উঠে এলো পাকিস্তানের দাবি। অর্থনৈতিক ক্ষোভ ধীরে ধীরে ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভাষা পেল।

পাকিস্তান ১৯৫০ সালের আইনের মাধ্যমে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত করল, যা ১৯৫৬ সালে কার্যকর হয়। তাই ১৯৬৫ সালের পর যে সম্পত্তি ‘শত্রু সম্পত্তি’ হলো, তার বড় অংশকে শুধু জমিদারদের জমি হিসেবে দেখলে ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাদ পড়ে যায়। এগুলো ছিল কৃষকের জমি, দোকানির জমি, চিকিৎসকের বাড়ি, সাধারণ মানুষের বসতভিটা।

‘চিত্রা নদীর পারে’ সিনেমার শশীকান্ত সেনগুপ্তের গল্পটি তাই শুধু একটি পরিবারের গল্প নয়। এটি একটি দীর্ঘ আইনি ও সামাজিক প্রক্রিয়ার গল্প। ১৯৪৮ সালে রিকুইজিশন আইন এলো। জনস্বার্থে রাষ্ট্র সম্পত্তি নেওয়ার ক্ষমতা পেল। ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পর নেহরু লিয়াকত চুক্তিতে যারা চলে গিয়েছিলেন তাদের ফিরে এসে সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের সুযোগ রাখা হয়েছিল। ১৯৫১ সালের ইভাকিউয়ি আইন চলে যাওয়া মানুষের সম্পত্তিকে সরকারি ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে এলো। ১৯৫২ সাল থেকে সীমান্তে পাসপোর্ট ব্যবস্থা চালু হলো। ফলে সাময়িকভাবে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেওয়া মানুষও নির্ধারিত সময়ে ফিরতে না পারলে আইনের চোখে ‘ইভাকিউয়ি’ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়লেন। ১৯৫৮ সালে আদালতের প্রতিকার পাওয়ার ক্ষমতাও সীমিত হয়ে গেল। তারপর ১৯৬৪ সালের দাঙ্গার মধ্যে সংখ্যালঘুদের সম্পত্তি বিক্রয়ের ওপর নতুন বিধিনিষেধ এলো। অর্থাৎ ‘হঠাৎ’ দেশ ফাঁকা হয়ে যায়নি। ১৯৪৮ থেকে ১৯৬৪ পর্যন্ত আইন, অধ্যাদেশ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা ধাপে ধাপে মানুষের সম্পত্তির ওপর নিয়ন্ত্রণ তৈরি করেছে।

১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হলো। একই দিনে জারি হলো জরুরি অবস্থা ও প্রতিরক্ষা বিধি। ‘শত্রু’ বলতে পাকিস্তানের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত ব্যক্তি বা রাষ্ট্রকে বোঝানো হলো। যুদ্ধ শেষ হলো মাত্র ১৭ দিনে। কিন্তু শত্রু সম্পত্তির ধারণা থেকে গেল। ভারতে বসবাসকারী মানুষের সম্পত্তি পাকিস্তানে ‘শত্রু সম্পত্তি’ হিসেবে তালিকাভুক্ত হতে থাকল। প্রাথমিক আইনি ভাষায় ধর্মের উল্লেখ ছিল না। কিন্তু ১৯৬৬ সালের একটি প্রশাসনিক সার্কুলারে ভারতে বসবাসকারী পাকিস্তানি মুসলিম নাগরিকদের সম্পত্তিকে এই ব্যবস্থার বাইরে রাখা হলো। ফলে একই ভৌগোলিক বাস্তবতায় একজন মুসলিমের সম্পত্তি নিরাপদ, আর একজন হিন্দুর সম্পত্তি ‘শত্রু সম্পত্তি’ হয়ে উঠল।

এর সঙ্গে যুক্ত হলো হিন্দু যৌথ পরিবারের উত্তরাধিকার ও বাটোয়ারার জটিলতা। পরিবারের একজন সদস্য ভারতে চলে গেলে তার অবিভক্ত অংশ আলাদা করা কঠিন ছিল। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পুরো যৌথ সম্পত্তিই তালিকাভুক্ত হওয়ার ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে আদালত বলেছে, আইনগত বাটোয়ারা ছাড়া যৌথ সম্পত্তিকে এভাবে শত্রু সম্পত্তি ঘোষণা করা যায় না। কিন্তু ততদিনে তালিকা তৈরি হয়ে গেছে।

এরপর শুরু হলো ইজারা। কাগজে ইজারাদার ছিলেন সবচেয়ে দুর্বল পক্ষ। ইজারা সাধারণত এক বছরের, স্থায়ী মালিকানা নেই, মেয়াদ শেষে উচ্ছেদের সুযোগ আছে। কিন্তু বাস্তব রাজনীতিতে কাগজের দুর্বল পক্ষ অনেক সময় শক্তিশালী হয়ে ওঠে। ১৯৬৫ থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে মোট বেদখলের বড় অংশ ঘটে যাওয়ার কথা বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে উঠে এসেছে। একজনের জমি রাষ্ট্রের তালিকায় উঠল, অন্যজন সেই জমির ইজারা পেল, বছরের পর বছর ইজারা নবায়ন হলো, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি হলো এবং দখল সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে গেল।

১৯৭১ সালে পাকিস্তান চলে গেল, বাংলাদেশ এলো। কিন্তু সম্পত্তির তালিকা রয়ে গেল। ১৯৭২ সালের রাষ্ট্রপতির আদেশে পাকিস্তান সরকারের অধীনে থাকা সম্পত্তি বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসে। ১৯৭৪ সালে ‘শত্রু সম্পত্তি’র নাম বদলে হলো ‘অর্পিত সম্পত্তি’। নাম বদলাল, কিন্তু দখল কি বদলাল? ১৯৭৬ সালে জিয়াউর রহমানের আমলে সংশোধনের মাধ্যমে সরকার বা সরকারনির্দেশিত কর্তৃপক্ষকে এই সম্পত্তি হস্তান্তর বা অন্যভাবে নিষ্পত্তির সুযোগ দেওয়া হলো। ফলে শুধু ধরে রাখা নয়, ইজারা দেওয়া ও হস্তান্তরের বাস্তব ক্ষমতাও প্রশাসনের হাতে আরও বিস্তৃত হলো।

এরশাদ আমলে নতুন তালিকাভুক্তি বন্ধের উদ্যোগ নেওয়া হলো। একই সঙ্গে নিয়মিত ইজারা নবায়নের মাধ্যমে অনেক ইজারাদারের দখল দীর্ঘস্থায়ী হয়ে ওঠে। এক বছরের ইজারা বাস্তবে বহু বছরের দখলে পরিণত হলো। ২০০১ সালে অর্পিত সম্পত্তি প্রত্যর্পণ আইন হলো। আশা তৈরি হলো, এবার জমি ফেরত যাবে। কিন্তু আইনের ভেতরেই এমন বিধান থাকল, যার ফলে সরকার কর্তৃক স্থায়ীভাবে হস্তান্তর বা ইজারা দেওয়া সম্পত্তির বড় অংশ প্রত্যর্পণের বাইরে চলে গেল। অর্থাৎ যিনি একসময় দুর্বল ইজারাদার ছিলেন, সময়ের সঙ্গে তিনি এমন অবস্থানে পৌঁছালেন যেখানে তার দখল আইনি সুরক্ষা পেল। অন্যদিকে প্রকৃত মালিকের জন্য শুরু হলো মামলা, ট্রাইব্যুনাল, কাগজপত্র এবং সময়সীমার দৌড়।

২০০৯ সালের পর ট্রাইব্যুনাল ব্যবস্থা চালু হলো। দাবির শেষ সময় নির্ধারিত হলো। যার জমি তালিকায় নেই, তার পথ বন্ধ। যিনি সময়সীমার মধ্যে আবেদন করতে পারেননি, তার পথও বন্ধ। আইন তার অধিকার স্বীকার করল, কিন্তু অধিকার প্রয়োগের দরজা একসময় বন্ধ হয়ে গেল।

২০১৭ সালে হাইকোর্ট ১৯৭৪ সালের পর নতুন করে তালিকাভুক্ত করা সম্পত্তিকে অবৈধ ঘোষণা করে। ২০২২ সালে আপিল বিভাগও সেই অবৈধতার সিদ্ধান্ত বহাল রাখে। অর্থাৎ রাষ্ট্র যে তালিকায় মানুষের জমি তুলেছিল, আদালত পরে বলল তার একটি বড় অংশ আইনসম্মত ছিল না। কিন্তু সেই অবৈধ তালিকা থেকে নিজের জমি ফেরত পাওয়ার দাবি জানানোর আইনগত সময়সীমা অনেক আগেই শেষ। ফলে রাষ্ট্রের তালিকাভুক্তি অবৈধ, কিন্তু সেই অবৈধ তালিকা থেকে জমি ফেরত চাওয়ার সময়সীমাও শেষ। আইনের দৃষ্টিতে দুটি সিদ্ধান্তই কার্যকর হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারের প্রশ্ন সেখানেই শেষ হয় না। কারণ জমিটি তখনও রাষ্ট্রের দখলে।

অর্পিত সম্পত্তির প্রশ্নকে শুধু ধর্মীয় প্রশ্ন হিসেবে দেখলেও পুরো সমস্যাটি ধরা যায় না। এটি নাগরিকত্ব, জাতিগত পরিচয়, ভূমি অধিকার এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রশ্নও। জাতিসংঘের জাতিগত বৈষম্য বিলোপ কমিটিও অর্পিত সম্পত্তি আইন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং হিন্দু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর জমি দখলের অভিযোগের প্রসঙ্গ তুলেছে। পার্বত্য চট্টগ্রামেও ভূমি অধিকার নিয়ে দীর্ঘদিনের সংকট রয়েছে। অর্থাৎ সমস্যার চরিত্র এক জায়গায় গিয়ে মিলে যায়, অধিকার আছে, কিন্তু অধিকার কার্যকর করার পথ নেই।

৫৭ বছরে জমিটির আইনি পরিচয় বদলেছে। শত্রু সম্পত্তি থেকে অর্পিত সম্পত্তি। রাষ্ট্র বদলেছে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ। সরকার বদলেছে একের পর এক। কিন্তু জমির দখল নিয়ে রাষ্ট্রের মৌলিক অবস্থান খুব বেশি বদলায়নি। এক সরকার তালিকা করেছে, আরেক সরকার ইজারা দিয়েছে, কেউ নতুন তালিকাভুক্তি বন্ধ করেছে, কেউ প্রত্যর্পণের আইন করেছে, কেউ সেই আইনের সময়সীমা বদলেছে, কেউ ট্রাইব্যুনাল করেছে, আদালত অবৈধতা ঘোষণা করেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বহু জমির বাস্তব দখল ফেরেনি।

এখানে সবচেয়ে বড় অন্যায়টি সম্ভবত এই নয় যে কোনো এক সরকার ভুল করেছে। সবচেয়ে বড় অন্যায় হলো রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা অন্যায়ের ক্ষেত্রেও ধারাবাহিক থেকেছে। সরকার বদলেছে, প্রশাসনিক দখল বদলায়নি। রাজনৈতিক দল বদলেছে, জমির তালিকা রয়ে গেছে।

‘যাদের কাছ থেকে জমি গেছে তাদের একটাই ধর্ম, আর যারা জমি পেয়েছে তাদের দল যখন যে সরকার’ কথাটি রাজনৈতিকভাবে তীক্ষ্ণ। কিন্তু ইতিহাসকে আরও গভীরে পড়লে দেখা যায়, এটি শুধু ধর্মের গল্প নয়। এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার গল্প। একজন মানুষ দেশ ছাড়লেন, তার জমি রাষ্ট্রের তালিকায় উঠল, অন্য একজন সেই জমি ইজারা নিলেন, বছরের পর বছর ইজারা নবায়ন হলো, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা তৈরি হলো, দখল সামাজিকভাবে স্বাভাবিক হয়ে গেল, তারপর আইন এসে দখলকে আরও শক্তিশালী করল। অন্যদিকে প্রকৃত মালিক বা উত্তরাধিকারী আদালতের দরজায় গিয়ে দাঁড়ালেন। কিন্তু তার হাতে ছিল দলিল, অন্য পক্ষের হাতে ছিল দখল, আর রাষ্ট্রের হাতে ছিল সময়সীমা। শেষ পর্যন্ত অনেক ক্ষেত্রে দখল জিতেছে, দলিল হেরেছে।

১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের জরুরি অবস্থা প্রত্যাহারের কাগজে বলা হয়েছিল, যে পরিস্থিতির কারণে জরুরি অবস্থা জারি হয়েছিল, তা আর নেই। যুদ্ধ শেষ হয়েছিল ১৯৬৫ সালেই। কিন্তু যুদ্ধের সময়কার সম্পত্তি ব্যবস্থা টিকে গেল। তারপর পাকিস্তান গেল, বাংলাদেশ এলো, আইনের নাম বদলাল, রাষ্ট্রপতি বদলালেন, সরকার বদলাল, সংবিধান বদলাল, আদালত রায় দিল। কিন্তু বহু মানুষের জমি ফেরত এলো না।

তাই অর্পিত সম্পত্তির ইতিহাসকে শুধু হিন্দু মুসলমানের ইতিহাস হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে একটি মৌলিক প্রশ্নের ইতিহাস। রাষ্ট্র কি জরুরি পরিস্থিতিতে নাগরিকের কাছ থেকে যে অধিকার নিয়েছিল, পরিস্থিতি শেষ হওয়ার পর সেই অধিকার ফিরিয়ে দিতে বাধ্য? যদি উত্তর হয় হ্যাঁ, তাহলে ৫৭ বছর পরও এত জমি কেন রাষ্ট্রের দখলে? আর যদি উত্তর হয় না, তাহলে জরুরি অবস্থার নামে রাষ্ট্র নাগরিকের কাছ থেকে যে সম্পত্তি নেয়, তার মেয়াদ কোথায় শেষ?

একটি যুদ্ধ শেষ হতে ১৭ দিন লেগেছিল। জরুরি অবস্থা শেষ হয়েছে বহু আগেই। কিন্তু সেই যুদ্ধের ছায়ায় যাদের জমি রাষ্ট্রের তালিকায় উঠেছিল, তাদের জন্য যুদ্ধ যেন এখনো শেষ হয়নি।

কারণ তাদের যুদ্ধ বন্দুকের বিরুদ্ধে নয়। তাদের যুদ্ধ কাগজের বিরুদ্ধে, তালিকার বিরুদ্ধে, সময়সীমার বিরুদ্ধে এবং সবচেয়ে বেশি একটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার বিরুদ্ধে, যে ব্যবস্থা ৫৭ বছর ধরে নাম বদলেছে, কিন্তু প্রশ্নটির উত্তর বদলায়নি।

জমি যদি মানুষের হয়, তবে রাষ্ট্রের কাছে তার ফেরত যাওয়ার শেষ তারিখ কে ঠিক করে?

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version