টাঙ্গাইলের বাসাইলে নির্মাণাধীন সেতুতে অনিয়মের অভিযোগ; সরেজমিনে বাঁশ ব্যবহারের সত্যতা পাওয়ার কথা প্রশাসনের, নিম্নমানের কাজ ভেঙে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ

টাঙ্গাইলের বাসাইলে প্রায় ১০ কোটি ৯ লাখ ৯২ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণাধীন একটি সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরিতে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। শুধু অভিযোগ নয়- উপজেলা প্রশাসন সরেজমিনে গিয়ে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে বলে জানিয়েছে। ফলে ঘটনাটি এখন নিছক ঠিকাদারের অনিয়মের অভিযোগে সীমাবদ্ধ নেই; সরকারি প্রকল্পের তদারকি, মান নিয়ন্ত্রণ এবং অর্থ ব্যয়ের জবাবদিহি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

ঘটনাটি ঘটেছে বাসাইল পৌরসভার মাইজখাড়া এলাকায় মরাগাঙ্গী নদীর ওপর নির্মাণাধীন ৯০ দশমিক ০৬ মিটার দীর্ঘ গার্ডার সেতুতে। প্রকল্পটির কাজ পেয়েছে মেসার্স ইউনুছ আল মামুন-মেসার্স জাকির এন্টারপ্রাইজ (জেবি)। কাজ শুরু হয়েছিল ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে এবং নির্ধারিত সময় ছিল ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি; পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০ সেপ্টেম্বর রাত সাড়ে ১০টার দিকে সেতুর ফুটপাতের স্ল্যাব তৈরির কাজ চলছিল। তখনই তাঁদের নজরে আসে- যেখানে রড থাকার কথা, সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে বাঁশ। স্থানীয়দের প্রতিবাদের মুখে কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও পরে আবার রাতে ঢালাই করা হয়। ঘটনাটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচনায় আসে।

ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ২১ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ইকবাল হোসেন ও উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমান ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন।

উপজেলা প্রকৌশলী কাজী ফাত্তাউর রহমানের বক্তব্য আরও গুরুত্বপূর্ণ। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে রাতে ঢালাইয়ের কাজ করেছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী আগে নির্দিষ্ট স্থানে সঠিকভাবে ঢালাই করে পরে ফুটপাতের স্ল্যাব বসানোর কথা থাকলেও এখানে সরাসরি বাঁশ ও কাঠ দিয়ে শাটারিং করে তার ওপর ঢালাই করা হয়েছে।

তিনি বলেন, যেসব জায়গায় নিম্নমানের কাজ হয়েছে সেগুলো ভেঙে পুনরায় নির্মাণ করা হবে এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।,

ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়ে শাটারিং-সংক্রান্ত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। তবে স্থানীয় প্রকৌশল দপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সেতুর নির্মাণকাজে রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের বিষয়টির সত্যতা তাঁরা পেয়েছেন।

তবে উপজেলা প্রকৌশলীর বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাস্থলে যে পদ্ধতিতে কাজ করা হয়েছে তা নিয়মসঙ্গত হয়নি এবং নিম্নমানের কাজ ভেঙে পুনরায় করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ফলে পুরো বিষয়টির প্রকৃত কারিগরি ও আর্থিক দায় নির্ধারণে তদন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

তাই এখন মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত- কোন অংশে বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে, সেটি প্রকল্পের নকশা ও স্পেসিফিকেশনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, এবং ওই কাজের জন্য কোনো অনুমোদন ছিল কি না।

একটি সেতু নির্মাণে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহারের অভিযোগকে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ সেতুটি ব্যবহার করবে সাধারণ মানুষ। নির্মাণকাজে কোনো গুরুতর ত্রুটি থাকলে তার প্রভাব ভবিষ্যতে মানুষের নিরাপত্তার ওপর পড়তে পারে।

১০ কোটি টাকার সেতুতে রডের বদলে বাঁশ- এটি কেবল নির্মাণকাজের একটি বিচ্ছিন্ন অনিয়মের অভিযোগ নয়; এটি সরকারি অর্থ ব্যয়ের স্বচ্ছতা এবং প্রকল্প তদারকির সক্ষমতার ওপর বড় প্রশ্ন।

জনগণের টাকায় নির্মিত অবকাঠামোতে যদি মানসম্মত রডের পরিবর্তে বাঁশ ব্যবহারের মতো ঘটনা সত্যিই ঘটে, তাহলে ‘উন্নয়ন’ শব্দটি শুধু বাজেটের অঙ্কে থাকলেই হবে না- তার প্রতিটি ইট, রড ও কংক্রিটের হিসাবও জনগণের কাছে পরিষ্কার থাকতে হবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version