মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক দমন-পীড়নের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার সেই মানবিক সিদ্ধান্তের নয় বছর পূর্ণ হয়েছে। ২০১৭ সালের আগস্টে ভয়াবহ নির্যাতনের মুখে লাখ লাখ রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করলে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার তাদের জন্য সীমান্ত উন্মুক্ত করে দেয়। মানবিক এই উদ্যোগ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রশংসা কুড়ায় এবং শেখ হাসিনাকে বিভিন্ন মহলে ‘মাদার অব হিউম্যানিটি’ হিসেবে অভিহিত করা হয়।

২০১৭ সালের আগস্টের শেষ দিকে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানের পর রাখাইন থেকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে প্রবেশ করতে শুরু করেন। কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় সাত-আট লাখের বেশি মানুষ। এর আগে বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের যুক্ত করলে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া জনগোষ্ঠীর সংখ্যা প্রায় ১১ লাখে পৌঁছে।

বাংলাদেশ তখন নিজেই নানা আর্থসামাজিক ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মধ্যে ছিল। এরপরও বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষের জীবন রক্ষায় সরকার আশ্রয়শিবির স্থাপন, খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, চিকিৎসা, স্যানিটেশন এবং নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে। পরে জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা দেশগুলো এই মানবিক কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে এগিয়ে আসে।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত শুধু বাংলাদেশে নয়, আন্তর্জাতিক পরিসরেও ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম ও মানবিক সংস্থা শেখ হাসিনার ভূমিকার প্রশংসা করে। মানবিকতার প্রতি বাংলাদেশের এই অবস্থানকে সে সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা হয়।

আশ্রয় দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ শুরু থেকেই রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী সমাধানের ওপর জোর দিয়ে আসছে। শেখ হাসিনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সম্মেলন ও জাতিসংঘের ফোরামে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, মর্যাদাপূর্ণ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছেন।

বাংলাদেশের অবস্থান ছিল- মানবিক কারণে রোহিঙ্গাদের সাময়িক আশ্রয় দেওয়া হলেও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান বাংলাদেশে তাদের স্থায়ীভাবে বসবাস নয়; বরং মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করে তাদের নিজ ভূমিতে ফেরত পাঠানো।

রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার নয় বছর পরও প্রত্যাবাসন প্রশ্নে বড় ধরনের অগ্রগতি হয়নি। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকটে কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে জনসংখ্যার চাপ, খাদ্য ও অর্থায়নের সংকট, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাত ও রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতি রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের পথকে আরও জটিল করে তুলেছে।

তবে ২০১৭ সালে বিপুলসংখ্যক নিপীড়িত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের মানবিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে আছে। সীমিত সম্পদের দেশ হয়েও বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত মানুষকে আশ্রয় দেওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মহলে মানবিক রাষ্ট্র হিসেবে প্রশংসা পায়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version