রাজধানী থেকে জেলা শহর, জনবহুল এলাকা থেকে প্রত্যন্ত চর- গুলির শব্দ যেন ক্রমেই স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। চলতি বছরের সাত মাস ১৯ দিনেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে অন্তত ১২৩টি গুলির ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় নিহত হয়েছেন ৫৯ জন, আহত হয়েছেন আরও ১৪০ জন। একের পর এক এমন ঘটনায় স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- অবৈধ অস্ত্রের দৌরাত্ম্য ঠেকাতে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসলে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে?

রাজধানীতেই ঘটেছে ১৩টি গুলির ঘটনা। এর মধ্যে ছয়জন নিহত এবং নয়জন আহত হয়েছেন। ৭ আগস্ট মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনে চায়ের দোকানে বসে থাকা বিএনপি নেতা ও ব্যবসায়ী আলমগীর হোসেনকে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়। এর মাত্র দুই সপ্তাহ আগে কাফরুলে দুর্বৃত্তদের গুলিতে নিহত হন যুবদল কর্মী ইউসুফ বেপারী। রাজধানীর মতো স্পর্শকাতর এলাকায় প্রকাশ্যে অস্ত্রের এমন ব্যবহার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

সরকারের পক্ষ থেকে বারবার অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও মাঠের চিত্র যেন ভিন্ন কথা বলছে। আধিপত্য বিস্তার, চাঁদাবাজি, ব্যবসায়িক দ্বন্দ্ব, মাদক, ছিনতাই কিংবা ব্যক্তিগত বিরোধ- প্রায় সব ধরনের সংঘাতেই এখন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারের নজির মিলছে।

অর্থাৎ, অপরাধীদের হাতে অস্ত্র আছে, অস্ত্র ব্যবহারের সাহসও আছে। প্রশ্ন হলো- আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি কোথায়?

৫৫টি গুলির ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে অন্তত ১২টি ঘটনায় আধিপত্য বিস্তারের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। এলাকা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে আটটি এবং বালুমহালের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চারটি ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে নরসিংদী, পাবনা, নাটোর, রাজশাহীসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রাণ গেছে একাধিক মানুষের।

চাঁদাবাজির ঘটনাতেও অস্ত্রের ব্যবহার ভয়াবহভাবে দৃশ্যমান। ঢাকা ও চট্টগ্রামে চাঁদার দাবিতে বা চাঁদা না পেয়ে অন্তত সাতটি গুলির ঘটনা ঘটেছে। ৫০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে চট্টগ্রামে প্রবাসীর বাড়িতে গুলি ছোড়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে।

যদি একজন অপরাধী জানে যে অস্ত্র প্রদর্শন কিংবা গুলি চালানোর পরও দ্রুত তাকে আইনের আওতায় আসতে হবে না, তাহলে অপরাধীর সাহস বাড়বে- এটাই স্বাভাবিক।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট কথিত ছাত্র আন্দোলনে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সময় পুলিশের কাছ থেকে লুট হয়েছিল বিভিন্ন ধরনের ৫ হাজার ৭৬৩টি আগ্নেয়াস্ত্র। পুলিশের হিসাবেই এর মধ্যে ১ হাজার ৩১১টি অস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি।

এসব প্রশ্নের সন্তোষজনক উত্তর জনগণের সামনে স্পষ্ট নয়। অথচ সেই সময়ের লুট হওয়া অস্ত্রের একটি অংশ এখন অপরাধীদের হাতে থাকার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।

সরকার যদি জানে যে হাজারের বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এখনও উদ্ধার হয়নি, তাহলে সেগুলো উদ্ধারে আরও দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দায়ও সরকারের ওপর বর্তায়। কারণ অস্ত্র উদ্ধার না হলে শুধু অপরাধী গ্রেপ্তার করে সমস্যার মূল উৎস বন্ধ করা সম্ভব নয়।

দেশের মধ্যে গুলির ঘটনায় সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত খুলনা। সেখানে ৩৭টি ঘটনায় নিহত হয়েছেন ১৫ জন এবং আহত ২০ জন। চট্টগ্রামে ২৮টি ঘটনায় ১৩ জন নিহত ও ৩৭ জন আহত হয়েছেন।

একটি জেলায় কয়েক ডজন গুলির ঘটনা এবং একাধিক প্রাণহানি- এমন পরিস্থিতি শুধু ‘বিচ্ছিন্ন অপরাধ’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামগ্রিক দুর্বলতা ও অপরাধীদের আত্মবিশ্বাসের বিষয়টিও এখানে সামনে আসে।

পুলিশ বলছে, ১ মে থেকে জুলাই পর্যন্ত বিশেষ অভিযানে ৩২৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ হাজার ৮০২টি গুলি-কার্তুজ উদ্ধার করা হয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ অভিযান।

কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- অস্ত্র উদ্ধারের পরও যদি গুলির ঘটনা থামছে না, তাহলে অস্ত্রের নতুন সরবরাহ বন্ধ হচ্ছে কোথায়?

অস্ত্র উদ্ধার, মামলা ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি অস্ত্রের উৎস, চোরাচালান নেটওয়ার্ক, সরবরাহকারী এবং রাজনৈতিক বা অপরাধী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে এই অভিযান কেবল সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে।

গুলির ঘটনা বেড়ে যাওয়ার দায় কেবল অপরাধীদের ওপর চাপিয়ে দিলেই সরকারের দায়িত্ব শেষ হয় না। নাগরিকের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অপরাধীরা কোথা থেকে অস্ত্র পাচ্ছে, কারা তাদের অস্ত্র সরবরাহ করছে, কারা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দিচ্ছে- এসব প্রশ্নের উত্তর বের করার দায়িত্বও রাষ্ট্রের।

সাড়ে সাত মাসে ১২৩টি গুলির ঘটনা এবং ৫৯ জনের প্রাণহানি তাই নিছক কিছু বিচ্ছিন্ন অপরাধের পরিসংখ্যান নয়। এটি আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েই বড় প্রশ্ন তুলছে।

অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে না পারলে ‘কঠোর অবস্থান’-এর ঘোষণা কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে। আর গুলির শব্দে আতঙ্কিত মানুষ তখন সরকারের আশ্বাস নয়, নিরাপদে বেঁচে থাকার নিশ্চয়তা চাইবে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version