আইন আছে, প্রতিষ্ঠান আছে-তবু নিরাপত্তা কোথায়?

নারী ও শিশু সুরক্ষায় রাষ্ট্রের একের পর এক আইন, নীতিমালা ও সেবাকেন্দ্র চালু থাকার পরও নির্যাতনের ভয়াবহ চিত্র বদলাচ্ছে না। বরং চলতি বছরের প্রথম সাত মাসের পরিসংখ্যানই সামনে এনেছে নিরাপত্তা ও বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন।

জানুয়ারি থেকে জুলাই-মাত্র সাত মাসে নারী ধর্ষণের ৪০০টি ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়েছে ৩৭ জনকে, ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ১৫২টি। একই সময়ে শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে ৬০৬টি। এর মধ্যে ২৪১টি শিশু ধর্ষণ এবং ২১৩টি শিশু হত্যার ঘটনা রয়েছে। নারী ও কিশোরীদের যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তের ঘটনাও ঘটেছে ১৯১টি।

এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে- নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সাংবিধানিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব যাদের, তাদের কার্যক্রম কতটা কার্যকর? এত আইন, এত প্রতিষ্ঠান ও এত সেবা থাকার পরও যদি বছরের পর বছর একই ধরনের নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে থাকে, তাহলে রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার বাস্তব ফলাফল কোথায়?

রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে বুধবার আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) আয়োজিত ‘নারী, শিশু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় ঐক্যবদ্ধ উদ্যোগ, ন্যায়বিচারে প্রবেশাধিকার ও সেবা প্রদান জোরদারকরণ’ শীর্ষক অংশীজন সংলাপে এসব তথ্য উঠে আসে।

সংলাপে আসকের নির্বাহী পরিচালক তাহমিনা রহমান সাত মাসের পরিসংখ্যান তুলে ধরেন। সংখ্যাগুলো শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু অপরাধের হিসাব নয়; বরং নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বিশেষ করে ধর্ষণের পর হত্যার ৩৭টি ঘটনা এবং শিশু হত্যার ২১৩টি ঘটনা দেখাচ্ছে, সহিংসতা প্রতিরোধের পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে কার্যকরভাবে সুরক্ষিত রাখার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে।

নারী ও শিশু নির্যাতনের শিকার মানুষের জন্য সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা সেবা চালু রয়েছে। কিন্তু এসব সেবার মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের ঘাটতি থাকায় ভুক্তভোগীকেই অনেক সময় এক প্রতিষ্ঠান থেকে অন্য প্রতিষ্ঠানে ছুটতে হয়।

দেশে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতার শিকার নারীদের জন্য ৯৫টি ওয়ান-স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার ও সেল রয়েছে। কিন্তু সব কেন্দ্রে চিকিৎসা, ফরেনসিক পরীক্ষা, আইনগত সহায়তা, মনোসামাজিক সেবা ও পুনর্বাসন একসঙ্গে নিশ্চিত করা যায়নি।

কোথাও ২৪ ঘণ্টার সেবা সীমিত, কোথাও ডায়াগনস্টিক সুবিধার ঘাটতি, আবার কোথাও পৃথক কাউন্সেলিংয়ের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। ফলে ‘ওয়ান-স্টপ’ সেবার ধারণা বাস্তবে কতটা এক জায়গায় কার্যকর হচ্ছে, সেটিও প্রশ্নের মুখে।

জাতীয় আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটের তথ্যের বরাত দিয়ে সংলাপে জানানো হয়, ২০০৯ সাল থেকে আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ১৮ লাখ ৪৬ হাজার ৭৯৯ জন আইনগত সহায়তা ও সচেতনতামূলক কার্যক্রমের মাধ্যমে উপকৃত হয়েছেন। কিন্তু সেবার পরিসর বাড়লেও আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একাধিক অনুমোদনের ধাপ, নিয়মিত সভা না হওয়া এবং আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে আপিলের জটিলতার কারণে অনেক ক্ষেত্রে সেবা পেতে দীর্ঘ সময় লাগে বলে সংলাপে উপস্থাপিত নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়।

যে মানুষটি অর্থের অভাবে রাষ্ট্রের বিনামূল্যের আইনগত সহায়তার দ্বারস্থ হন, তাকেই যদি দীর্ঘ প্রক্রিয়া, কাগজপত্র ও প্রশাসনিক জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সেই সেবা বাস্তবে কতটা দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে- এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।

মানব পাচারের চিত্রও উদ্বেগজনক। ২০২৫ সালে এ-সংক্রান্ত ১ হাজার ১২৬টি নতুন মামলা হয়েছে। আর ২০২৬ সালের মে পর্যন্ত বিচারাধীন বা তদন্তাধীন মামলার সংখ্যা ছিল ৫ হাজার ২৮৪টি।

নারী ও শিশু সুরক্ষায় সরকারের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে সেবার তথ্য সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। বিশেষ করে গ্রাম ও প্রত্যন্ত অঞ্চলের বহু মানুষ জানেন না- নির্যাতনের শিকার হলে কোথায় অভিযোগ করতে হবে, কীভাবে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা পাওয়া যায়, কোথায় চিকিৎসা বা মনোসামাজিক সহায়তা মিলবে। ফলে কাগজে-কলমে থাকা সেবা আর বাস্তবে মানুষের নাগালে থাকা সেবার মধ্যে তৈরি হচ্ছে বড় ব্যবধান।

নারী ও শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। তাই ধর্ষণ, হত্যা, যৌন হয়রানি ও সহিংসতার এমন পরিসংখ্যান সামনে আসার পর কেবল নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করলেই দায়িত্ব শেষ হয় না। প্রয়োজন বিদ্যমান ব্যবস্থার বাস্তব ফলাফল পর্যালোচনা এবং কোথায় ব্যর্থতা রয়েছে তা চিহ্নিত করে জবাবদিহি নিশ্চিত করা।

চারশ নারী ধর্ষণের শিকার, ৩৭ জন ধর্ষণের পর নিহত এবং ৬০৬টি শিশু সহিংসতার ঘটনায় আক্রান্ত- এই সংখ্যাগুলো সরকারের সামনে কেবল পরিসংখ্যান নয়, এটি রাষ্ট্রীয় সুরক্ষা ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে সরাসরি জবাবদিহির প্রশ্ন।

আইন থাকলেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। প্রতিষ্ঠান থাকলেই বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত হয় না। আর সেবা চালু থাকলেই ভুক্তভোগীর কাছে তা পৌঁছে যায় না। রাষ্ট্রের প্রকৃত সাফল্য মাপা হবে নির্যাতনের শিকার মানুষ কত দ্রুত সুরক্ষা, চিকিৎসা, আইনি সহায়তা, বিচার ও পুনর্বাসন পাচ্ছেন- সেই বাস্তবতায়।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version