সিন্ধু নদীর পানি বণ্টনকে কেন্দ্র করে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে উত্তেজনা নতুন মাত্রা পেয়েছে। পাকিস্তানের রাজনৈতিক নেতৃত্বের পর এবার দেশটির সামরিক বাহিনীও পানি অধিকার রক্ষার প্রশ্নে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। ইসলামাবাদ থেকে একের পর এক কড়া বার্তা দেওয়া হলেও ভারত এ ধরনের বক্তব্যকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে না বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে।
সম্প্রতি ইসলামাবাদে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ের ২৭৬তম কোর কমান্ডার্স কনফারেন্স অনুষ্ঠিত হয়। দেশটির সেনাপ্রধান ও ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ওই বৈঠকে সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠক শেষে আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানায়, পাকিস্তানের জনগণের আকাঙ্ক্ষা ও সরকারের নীতির আলোকে দেশের ন্যায্য পানির অধিকার রক্ষায় সশস্ত্র বাহিনী সর্বাত্মকভাবে প্রস্তুত রয়েছে।
এর আগে পাকিস্তান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান বিলাওয়াল ভুট্টো জারদারিও ভারতের বিরুদ্ধে কঠোর ভাষায় বক্তব্য দেন। এক জনসভায় তিনি অভিযোগ করেন, ভারত পানি প্রবাহকে রাজনৈতিক ও কৌশলগত অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে চাইছে। তিনি বলেন, সিন্ধু পানি চুক্তির প্রশ্নে পাকিস্তান কোনো আপস করবে না এবং প্রয়োজন হলে সব ধরনের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত থাকবে।
পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিটি (এনএসসি) আগেই ঘোষণা করেছে, সিন্ধু নদ ব্যবস্থার পানি প্রবাহ বন্ধ করা বা অন্যদিকে সরিয়ে দেওয়ার যেকোনো প্রচেষ্টাকে তারা ‘যুদ্ধের শামিল’ হিসেবে বিবেচনা করবে। দেশটির সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সেই অবস্থানেরই পুনরাবৃত্তি দেখা যাচ্ছে।
তবে পাকিস্তানের এসব হুঁশিয়ারির প্রতি ভারত দৃশ্যত নির্লিপ্ত অবস্থান বজায় রেখেছে। নয়াদিল্লি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে, সীমান্তপারের সন্ত্রাসবাদ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকতা ফিরে আসবে না। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, পাকিস্তানকে প্রথমে আন্তঃসীমান্ত সন্ত্রাসবাদের বিষয়ে বিশ্বাসযোগ্য পদক্ষেপ নিতে হবে। ভারতের মতে, বর্তমান নিরাপত্তা বাস্তবতা উপেক্ষা করে পুরোনো কাঠামোয় সম্পর্ক পরিচালনা করা সম্ভব নয়।
পাকিস্তানের সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টির প্রচেষ্টা হলেও ভারত বর্তমানে নিজের কৌশলগত অবস্থান থেকে সরে আসার কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না। বরং দেশটি সিন্ধু অববাহিকায় বিভিন্ন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের মধ্যস্থতায় ১৯৬০ সালে স্বাক্ষরিত সিন্ধু পানি বণ্টন চুক্তি অনুযায়ী রাভি, সুতলেজ ও বিয়াস নদীর পানি ব্যবহারের অধিকার ভারতের হাতে এবং সিন্ধু, ঝিলাম ও চেনাব নদীর পানি ব্যবহারের অধিকার পাকিস্তানের জন্য নির্ধারিত হয়। দীর্ঘ কয়েক দশক ধরে ভারত-পাকিস্তান সম্পর্ক নানা সংকটের মুখে পড়লেও এই চুক্তি কার্যকর ছিল।
কিন্তু কাশ্মীরের পহেলগামে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর ভারত চুক্তির কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক স্থগিত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে পাকিস্তানের সঙ্গে বন্যার আগাম তথ্য ও পানি প্রবাহসংক্রান্ত কিছু তথ্য বিনিময়ও সীমিত হয়ে যায়।
পাকিস্তানের কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তা ব্যাপকভাবে সিন্ধু নদ ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। দেশটির প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কৃষি উৎপাদন এই নদী অববাহিকার পানির মাধ্যমে পরিচালিত হয়। একই সময়ে তারবেলা ও মাংলার মতো প্রধান জলাধারগুলোতে পানির স্তর কমে যাওয়ায় ইসলামাবাদের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তান আন্তর্জাতিক মহলে সমর্থন আদায়ে সক্রিয় কূটনৈতিক প্রচারণা চালিয়ে যাচ্ছে। জাতিসংঘ, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরাম এবং আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টি তুলে ধরার চেষ্টা করছে দেশটি। তবে এখন পর্যন্ত ভারত নিজের অবস্থানে অনড় রয়েছে এবং পাকিস্তানের যুদ্ধংদেহী বক্তব্যকে কার্যত কোনো গুরুত্ব দিচ্ছে না বলেই পর্যবেক্ষকদের ধারণা।
দক্ষিণ এশিয়ার দুই পরমাণু শক্তিধর প্রতিবেশীর মধ্যে এই বিরোধ ভবিষ্যতে কোন দিকে গড়ায়, তা এখন আন্তর্জাতিক মহলেরও নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে।


