আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

তিনবার ম্যাট্রিকে ব্যর্থতা থেকে সংবিধান প্রণয়ন, সাতবার সংসদ সদস্য, মন্ত্রী এবং সর্বোপরি একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান

মানুষের জীবন সরল পথে চলে না সবসময়। কখনো জীবনের শুরু এত অনাড়ম্বর, এত দুরন্ত, এত ব্যর্থতার ছায়ায় আবৃত থাকে যে তার পরিণতির দীপ্তি কল্পনা করাও কঠিন। জীবনের প্রথম অধ্যায়ে যে কিশোরকে অমনোযোগী বলে মনে হয়, সময়ের প্রবাহে সেই কিশোরই হয়ে উঠতে পারে ইতিহাসের এক উজ্জ্বল চরিত্র। সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামের সন্তান সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন তেমনই এক বিস্ময়কর জীবনের অধিকারী। মেট্রিক পরীক্ষায় তিনবার ব্যর্থ; অথচ সেই দুরন্ত কিশোরই পরবর্তী সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষালাভ করেছেন, আইনজীবী হয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছেন, স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হয়েছেন, সাতবার সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন, মন্ত্রিত্বের দায়িত্ব পালন করেছেন এবং সর্বোপরি বাংলাদেশের সংসদীয় ইতিহাসে নিজের জন্য নির্মাণ করেছেন এক স্বতন্ত্র মর্যাদা। তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় যদি একটি বাক্যে বলতে হয়, তবে তিনি ছিলেন একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান।

শৈশবের ব্যর্থতা মানুষের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে না। পরীক্ষার খাতায় পাওয়া নম্বর জীবনের সমস্ত সম্ভাবনার হিসাব জানে না। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবন যেন সেই চিরন্তন সত্যেরই এক জীবন্ত উপাখ্যান। যে কিশোরের পড়াশোনায় মন বসত না, তার মন পড়ে থাকত নাটক ও যাত্রাপালার মঞ্চে। অভিনয় করতেন, মানুষের সামনে কথা বলতেন, চরিত্র ধারণ করতেন। তখন হয়তো কেউ ভাবেনি, মঞ্চের সেই কিশোর একদিন জাতীয় সংসদের গম্ভীর প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে এমন এক ভাষাশৈলীগত নির্মাণ করবেন, যেখানে যুক্তির সঙ্গে মিশবে রসবোধ, তীক্ষ্ণতার সঙ্গে থাকবে প্রজ্ঞা, আর রাজনৈতিক বক্তব্যের সঙ্গে থাকবে অসাধারণ উপস্থিত বুদ্ধি।

তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল বামপন্থী ধারার মধ্য দিয়ে। ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক অঙ্গনে নিজের অবস্থান তৈরি করেন। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে ন্যাপের প্রার্থী হয়ে প্রাদেশিক পরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। কিন্তু ভবিতব্যতা তখন বাংলার মানুষের জন্য আরও বৃহৎ এক অধ্যায়ের দ্বার খুলে দিচ্ছিল। ১৯৭১ সালে শুরু হলো মহান মুক্তিযুদ্ধ। একটি জাতির অস্তিত্ব, স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রশ্নে যে মহাসংগ্রাম শুরু হয়েছিল, সুরঞ্জিত সেনগুপ্তও সেই সংগ্রামের সঙ্গে যুক্ত হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে।

স্বাধীনতার পরে তাঁর সামনে আরেকটি দরজা। যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত নতুন রাষ্ট্রকে শুধু পতাকা ও মানচিত্র দিলেই তো রাষ্ট্র পূর্ণতা পায় না। প্রয়োজন তার নিজস্ব সংবিধান, রাষ্ট্রদর্শন, নাগরিক অধিকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোর সুস্পষ্ট কাঠামো। সেই মহৎ রাষ্ট্র নির্মাণের কর্মযজ্ঞে তিনি যুক্ত হলেন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণয়ন কমিটির সদস্য হিসেবে। ইতিহাসের কী অপূর্ব পরিহাস, যে কিশোর একদিন পরীক্ষার খাতায় বারবার ব্যর্থ হয়েছিল, সেই মানুষটিই একদিন স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রের মৌলিক দলিল প্রণয়নের কাজে অংশ নেওয়ার সুযোগ পেলেন। এ যেন জীবনের নিজের হাতে লেখা এক উত্তর, যেখানে ব্যর্থতার সমস্ত অঙ্ক শেষ পর্যন্ত গিয়ে মিশেছে সাফল্যের এক বিস্ময়কর সমীকরণে।

তবে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয়ের সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় সংসদ। তিনি ছিলেন শুধু একজন সংসদ সদস্য নন, ছিলেন একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান। বাংলাদেশের সংসদীয় রাজনীতিতে এমন এক মানুষ তিনি যাঁর আসন কেবল তাঁর দলের প্রতিনিধিত্ব দিয়ে পূর্ণ হয় না, তাঁর উপস্থিতিই সংসদের প্রাণবন্ত বিতর্ককে সমৃদ্ধ করে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ছিলেন এমনই একজন। সংসদে তাঁর বক্তব্যে থাকত আইন ও সংবিধানের জ্ঞান, রাজনৈতিক ইতিহাসের পাঠ, যুক্তির দৃঢ়তা, শব্দের কারুকার্য এবং সর্বোপরি ছিল সময়কে বুঝে কথা বলার অসাধারণ ক্ষমতা। তিনি জানতেন কখন যুক্তিকে কঠিন করতে হয়, কখন ভাষাকে সহজ করতে হয়, কখন একটি তীক্ষ্ণ বাক্য দিয়ে রাজনৈতিক অবস্থান স্পষ্ট করতে হয় এবং কখন একটি রসিকতার মধ্য দিয়ে উত্তপ্ত পরিবেশে সামান্য হাসির অবকাশ সৃষ্টি করতে হয়। তাঁর বক্তৃতা কেবল বক্তব্য ছিল না, ছিল এক ধরনের সংসদীয় শিল্প। তিনি কথা বলতেন, কিন্তু শুধু নিজের দলের জন্য নয়, সংসদীয় বিতর্কের বৃহত্তর সংস্কৃতির জন্যও। এ কারণেই তাঁর কণ্ঠ রাজনৈতিক মতভেদের সীমানা অতিক্রম করে বহু মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করত।

দীর্ঘ সংসদীয় জীবনে সাতবার জনগণের প্রতিনিধি নির্বাচিত হওয়া তাঁর রাজনৈতিক গ্রহণযোগ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু তাঁর শক্তি কেবল নির্বাচনী সংখ্যায় ছিল না। তাঁর প্রকৃত শক্তি ছিল সংসদীয় জ্ঞান, বিতর্কের গভীরতা এবং রাজনৈতিক বক্তব্যকে মানুষের বোধগম্য করে তোলার ক্ষমতায়। তিনি সংসদকে কেবল আইন তৈরির জায়গা হিসেবে দেখেননি; সংসদকে তিনি দেখেছিলেন যুক্তি, মত, বিরোধিতা ও গণতান্ত্রিক বিতর্কের এক জীবন্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে।

জাতীয় রাজনীতিতে শুরুতে তাঁর পরিচিতি ছিল ‘ছোট দলের বড় নেতা’ হিসেবে। সাংগঠনিক শক্তির বিচারে দল হয়তো বৃহৎ ছিল না প্রারম্ভে; কিন্তু আওয়ামী ঘরানায় আসার পরে সংসদে তাঁর কণ্ঠ কখনো ক্ষীণ ছিল না। সংখ্যার রাজনীতির বাইরে ব্যক্তিত্বের যে একটি নিজস্ব শক্তি থাকে, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। তিনি প্রমাণ করেছিলেন, সংসদে বড় হওয়ার জন্য শুধু দলের প্রয়োজন হয় না, প্রয়োজন জ্ঞান, যুক্তি, অভিজ্ঞতা এবং কথা বলার শিল্প।

তবে তাঁর জাতীয় পরিচয়ের পাশাপাশি ছিল এক গভীর আঞ্চলিক পরিচয়। দিরাই ও শাল্লার মানুষের কাছে তিনি ছিলেন আপনজন, ‘সেনদা’, ‘দুখু সেন’। হাওরের জল, কাদামাটি, বর্ষার বিস্তার, কৃষকের অনিশ্চিত জীবন এবং প্রান্তিক মানুষের দীর্ঘশ্বাস তাঁর রাজনীতির সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে যুক্ত ছিল। ঢাকার রাজনীতির ব্যস্ততম কেন্দ্রেও তাঁর ভেতরে বেঁচে ছিল আনোয়ারপুরের সেই মাটি। মানুষ যত দূরেই যাক, তার শেকড় তার ভেতরে নীরবে কথা বলে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ক্ষেত্রেও সেই শেকড় কখনো শুকিয়ে যায়নি।

তাঁর জীবনের শেষ অধ্যায়টি যেন সমস্ত রাজনৈতিক কোলাহলকে ছাপিয়ে এক অপূর্ব মানবিক প্রতীকে পরিণত হয়েছে। নিজের বাড়ির উঠানে তিনি একদিন একটি চন্দনগাছের চারা রোপণ করেছিলেন। একটি ছোট্ট চারা। হয়তো সেদিন তিনি ভাবেননি, এই গাছ তাঁর জীবনের শেষ গল্পের একটি চরিত্র হয়ে উঠবে। গাছ বড় হলো। সময় এগিয়ে গেল। রাজনীতি বদলাল। দেশ বদলাল। সংসদে তাঁর কণ্ঠ বহুবার উচ্চারিত হলো। তারপর একদিন সব কণ্ঠ থেমে গেল। ২০১৭ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করলেন সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের পর্দা নামল। কিন্তু তাঁর শেষযাত্রার গন্তব্য হলো তাঁরই জন্মভূমি দিরাইয়ের আনোয়ারপুর। সেখানে সম্পন্ন হলো তাঁর শেষকৃত্য। আর তখনই যেন জীবনের এক আশ্চর্য বৃত্ত সম্পূর্ণ হলো। নিজের হাতে লাগানো সেই চন্দনগাছের কাঠ দিয়েই তাঁর দাহ সম্পন্ন করা হল।

কী অদ্ভুত এই ফিরে আসা! মানুষ সারাজীবন দূরে যায়। ক্ষমতার কেন্দ্র থেকে ক্ষমতার আরও কেন্দ্রে যায়। রাজধানীর রাজপথ পেরিয়ে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ প্রতিষ্ঠানের দরজায় পৌঁছায়। তার নামের পাশে একের পর এক পরিচয় যুক্ত হয়। সংসদ সদস্য, মন্ত্রী, নেতা, পার্লামেন্টারিয়ান। কিন্তু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সমস্ত পরিচয়ের আড়াল থেকে বেরিয়ে আসে সবচেয়ে সহজ পরিচয়টি। সে ফিরে যায় তার জন্মভূমিতে। ফিরে যায় সেই মাটিতে, যে মাটি তার প্রথম পদচিহ্ন ধারণ করেছিল। আর সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের ক্ষেত্রে সেই প্রত্যাবর্তনের সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেল তাঁর নিজের হাতে লাগানো একটি চন্দনগাছ। যে হাতে গাছের চারা মাটিতে বসেছিল, সেই হাত আর নেই। যে চোখ গাছটির বেড়ে ওঠা দেখেছিল, সেই চোখও বন্ধ। কিন্তু গাছটি রয়ে গেছে। আর তার কাঠের চন্দনসুবাস মিশে গেছে তাঁর শেষ বিদায়ের আগুনে। প্রকৃতি যেন মানুষটির জীবনের শেষ বাক্যটি নিজেই লিখে দিয়েছে। রয়ে গেছে সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের চির আরাধ্যের ‘সোনার বাংলা’।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্তের জীবন কেবল একজন রাজনীতিকের জীবনী নয়। এটি সম্ভাবনার গল্প। এটি ব্যর্থতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়যাত্রার গল্প। এটি এক দুরন্ত কিশোরের ধীরে ধীরে নিজেকে নির্মাণ করে একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ানে পরিণত হওয়ার গল্প। এটি মুক্তিযুদ্ধের প্রজন্মের গল্প। এটি স্বাধীন রাষ্ট্রের সাংবিধানিক যাত্রার গল্প। এটি সংসদীয় বিতর্কের এক স্বর্ণালি কণ্ঠের গল্প। এবং সবশেষে এটি শেকড়ে ফিরে যাওয়ার গল্প।

আজ তিনি নেই। নেই জাতীয় সংসদের সেই পরিচিত কণ্ঠ, নেই তর্কের উত্তাপে হঠাৎ ঝরে পড়া তাঁর রসিকতা, নেই রাজনৈতিক মঞ্চে তাঁর দীর্ঘ অভিজ্ঞতার দীপ্তি। কিন্তু মানুষের জীবন কেবল তার উপস্থিতিতে শেষ হয় না। কোনো কোনো মানুষ চলে যাওয়ার পরও তাঁর কথাগুলো বাতাসে থেকে যায়, তাঁর পদচিহ্ন মাটিতে থেকে যায়, তাঁর স্মৃতি মানুষের মুখে মুখে বেঁচে থাকে। আনোয়ারপুরের সেই চন্দনগাছের গল্প যেন আজও আমাদের কানে এক নীরব বাণী উচ্চারণ করে। মানুষকে তার প্রথম ব্যর্থতা দিয়ে বিচার করতে নেই। একটি পরীক্ষার ফল দিয়ে তার ভবিষ্যৎ লিখে দিতে নেই। মানুষের ভেতরে যে সম্ভাবনা সুপ্ত থাকে, তার পরিমাপ কোনো খাতার কয়েকটি সংখ্যায় হয় না। তিনবার মেট্রিকে ব্যর্থ সেই দুরন্ত ছেলেটি একদিন সংবিধান প্রণয়নের টেবিলে বসেছিলেন। সাতবার মানুষের ভোটে সংসদে গিয়েছিলেন। মন্ত্রী হয়েছিলেন। আর সর্বোপরি হয়ে উঠেছিলেন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একজন বিজ্ঞ পার্লামেন্টারিয়ান; যাকে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম এখনো শাণিত শব্দচয়নের জন্য অনুসরণ করে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত শেষবার ফিরলেন তাঁর আনোয়ারপুরে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সমাপ্তি এটাই। যত দূরেই যাক, শেষ পর্যন্ত সে ফিরে আসে তার নিজের কাছে, তার নিজের মাটির কাছে, তার নিজের শেকড়ের কাছে। সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত তাই কেবল একটি নাম নন, একটি দীর্ঘ যাত্রার স্মারক। ব্যর্থতার অন্ধকার থেকে সম্ভাবনার আলোয় উঠে আসা এক মানুষের উপাখ্যান। আর তাঁর চন্দনগাছটি যেন সেই উপাখ্যানের শেষ পঙ্‌ক্তি হয়ে আজও বলে যায়, মানুষ চলে যায়, কিন্তু তার জীবন কখনো নিঃশেষ হয় না। সে থেকে যায় ইতিহাসে, স্মৃতিতে, মানুষের ভালোবাসায় এবং কোনো এক পুরোনো উঠানের নীরব সবুজে।

সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত রইলেন বাংলার উড়ন্ত পতপত করা লাল-সবুজের উপক্রমণিকায়, রইবেন সংসদের সাহিত্যের রবীন্দ্রনাথের মত দীপ্ত উচ্চারণে নির্ভীক সচলায়তনে।

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version