দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রাদুর্ভাব যেন থামার কোনো লক্ষণই দেখাচ্ছে না। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে একের পর এক শিশু হারিয়ে যাচ্ছে এই প্রতিরোধযোগ্য রোগে। হাসপাতালের শয্যায় স্বজনদের আহাজারি, চিকিৎসকদের নিরন্তর চেষ্টা আর অসহায় অভিভাবকদের কান্না-সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক হৃদয়বিদারক পরিস্থিতি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের বৃহস্পতিবার প্রকাশিত নিয়মিত হালনাগাদ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের একজন ঢাকা বিভাগের এবং অন্যজন সিলেট বিভাগের বাসিন্দা। তবে একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে নতুন করে কারও মৃত্যুর তথ্য পাওয়া যায়নি।

এ নিয়ে চলতি বছরের ১৫ মার্চ থেকে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মারা গেছে ৬৫৪ শিশু এবং পরীক্ষায় নিশ্চিত হামে মারা গেছে ৯৩ শিশু। সব মিলিয়ে দেশে হামে ও হামের উপসর্গে মোট ৭৪৭ শিশুর মৃত্যু হয়েছে, যা জনস্বাস্থ্যের জন্য গভীর উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গত ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন এলাকায় আরও ৮১৮ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে পরীক্ষায় ১২৮ জনের শরীরে নিশ্চিতভাবে হাম ধরা পড়েছে।

১৫ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত দেশে ১ লাখ ৮ হাজার ৯৯৮ জনের মধ্যে হামের উপসর্গ দেখা দিয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষায় ১৩ হাজার ১৯৮ জনের হাম নিশ্চিত হয়েছে। গুরুতর অবস্থায় ৯২ হাজার ৩১ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। চিকিৎসা শেষে ৮৮ হাজার ৪১৯ জন সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছেন। তবে এখনও বহু শিশু বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। এদিকে শিশু মৃত্যুর এই মর্মান্তিক পরিস্থিতির জন্য বর্তমান সরকারের অব্যবস্থাপনাকেই দায়ী করছেন সাধারণ জনগণ ।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর)-এর সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, সরকারের সমন্বয়হীনতা ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার কারণেই এত প্রাণহানি ঘটেছে। তার মতে, সংক্রমণ ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়ার পরও হামকে মহামারি ঘোষণা না করা এবং স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থা জারি না করা ছিল একটি বড় নীতিগত ভুল।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, বর্তমান অন্তর্বর্তী কর্তৃপক্ষও এই দায় এড়াতে পারে না। সময়মতো অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক, ফিল্ড হাসপাতাল, জরুরি আইসিইউ সুবিধা এবং কার্যকর চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে পারলে অনেক শিশুর জীবন রক্ষা করা সম্ভব হতো।

অন্যদিকে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ড. মুশতাক হোসেন গুরুতর আক্রান্ত শিশুদের চিকিৎসার জন্য সরকারি হাসপাতালের আইসিইউর একটি অংশ শিশুদের জন্য সংরক্ষণের আহ্বান জানিয়েছেন। পাশাপাশি আইসিইউতে নেওয়ার আগের পর্যায়ের রোগীদের জন্য হাই-ফ্লো অক্সিজেন সুবিধা দ্রুত চালুরও দাবি জানান তিনি।

হাম একটি টিকাদানের মাধ্যমে প্রতিরোধযোগ্য রোগ। কিন্তু সময়মতো টিকাদান নিশ্চিত না হওয়া, দ্রুত শনাক্তকরণে ঘাটতি এবং জরুরি চিকিৎসা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।

দেশজুড়ে শিশু মৃত্যুর এই দীর্ঘ মিছিল থামাতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ, টিকাদান কর্মসূচি জোরদার এবং জরুরি স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের কোনো বিকল্প নেই। না হলে প্রতিদিনই আরও অনেক পরিবারকে তাদের আদরের সন্তান হারানোর অসহনীয় বেদনা বয়ে বেড়াতে হতে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version