বিশ্বকাপের মঞ্চে আরেকটি বড় অঘটনের সাক্ষী হলো ফুটবল বিশ্ব। ম্যাচজুড়ে একের পর এক সুযোগ নষ্ট করা ব্রাজিলকে শেষ দিকে শাস্তি দিলেন নরওয়ের মহাতারকা আর্লিং হালান্ড। তাঁর দুর্দান্ত জোড়া গোলে পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে ইতিহাসের পাতায় নাম লিখিয়েছে নরওয়ে। প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে জায়গা করে নেওয়ার পাশাপাশি তারা শেষ করে দিয়েছে ব্রাজিলের ‘হেক্সা’ স্বপ্নও।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে অনুষ্ঠিত শেষ ষোলোর এই মহারণে শুরু থেকেই নিজেদের পরিকল্পনা মাফিক খেলতে থাকে নরওয়ে। বলের দখলে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও সংগঠিত রক্ষণ আর দ্রুত পাল্টা আক্রমণে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখে মার্টিন ওডেগার্ড ও আর্লিং হালান্ডরা।
ম্যাচের তৃতীয় মিনিটেই ব্রাজিল শিবিরে শঙ্কা নেমে আসে। আলেকজান্ডার সরলথ বল জালে পাঠালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। অল্পের জন্য বেঁচে যায় সেলেসাওরা। তবে সেই সতর্কবার্তা যেন গুরুত্ব দেয়নি ব্রাজিল।
উল্টো ১০ মিনিটে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নেওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছিল তারা। বক্সের ভেতরে ম্যাথিউস কুনহাকে ফাউল করলে ভিএআর পর্যালোচনার পর পেনাল্টির নির্দেশ দেন রেফারি। কিন্তু স্পট কিক থেকে ব্রুনো গিমারাইসের নেওয়া দুর্বল শট অসাধারণ দক্ষতায় ঠেকিয়ে দেন নরওয়ের গোলরক্ষক অরিয়ান নাইল্যান্ড। সেই মুহূর্তেই যেন ম্যাচের ভাগ্যের মোড় ঘুরতে শুরু করে।
প্রথমার্ধে ব্রাজিল একাধিকবার গোলের খুব কাছাকাছি গিয়েও সফল হতে পারেনি। ৩১ মিনিটে গ্যাব্রিয়েল মার্টিনেল্লির শট রুখে দেন নাইল্যান্ড। এরপর ৪০ মিনিটে ভিনিসিয়ুস জুনিয়রের দুর্দান্ত প্রচেষ্টা পোস্টে লেগে ফিরে আসে। অন্যদিকে বিরতির ঠিক আগে ওডেগার্ডের নিশ্চিত গোলের সুযোগ ঠেকিয়ে ব্রাজিলকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখেন গোলরক্ষক আলিসন বেকার।
বিরতির পর আক্রমণের গতি বাড়াতে কোচ কার্লো আনচেলত্তি পরিবর্তন আনেন। তরুণ ফরোয়ার্ড এন্দ্রিককে মাঠে নামানো হলেও কাঙ্ক্ষিত ফল আসেনি। বরং ৫৯ মিনিটে ভিনিসিয়ুসের চমৎকার পাস থেকে পাওয়া সহজ সুযোগ নষ্ট করে বসেন এই তরুণ। একা গোলরক্ষককে পেয়েও বল পাঠান পোস্টের বাইরে।
সুযোগ নষ্টের মাশুল ব্রাজিলকে দিতে হয়েছে নির্মমভাবে। ৬৮ মিনিটে দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মাঠে নামানো হয় নেইমার জুনিয়রকে। চলতি বিশ্বকাপে এটাই ছিল তাঁর প্রথম উপস্থিতি। কিন্তু তখনও ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি নিজেদের হাতে নিয়ে ফেলেছিল নরওয়ে।
এরপর শুরু হয় আর্লিং হালান্ডের শো। ম্যাচের ৮০ মিনিটে বাম প্রান্ত থেকে আন্দ্রেয়াস শেলদেরুপের নিখুঁত ক্রসে শূন্যে ভেসে উঠে দুর্দান্ত এক হেডে বল জালে পাঠান হালান্ড। আলিসনের কোনো সুযোগই ছিল না। গোল হজমের পর সমতায় ফেরার মরিয়া চেষ্টায় আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়ে ব্রাজিল। কিন্তু সেই আগ্রাসনই উল্টো তাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়।
নির্ধারিত সময়ের শেষ মিনিটে আবারও শেলদেরুপের পাস ধরে ডি-বক্সের বাইরে থেকে বাঁ পায়ের শক্তিশালী শটে বল জালে জড়িয়ে দেন হালান্ড। মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে যায় ব্রাজিল সমর্থকদের গ্যালারি। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে গিয়ে নরওয়ের ইতিহাস গড়ার পথ প্রায় নিশ্চিত করে দেন ম্যানচেস্টার সিটির এই গোলমেশিন।
দুই গোলের এই অসাধারণ পারফরম্যান্সের মাধ্যমে বিশ্বকাপে নিজের গোলসংখ্যা সাতে উন্নীত করেন হালান্ড। একইসঙ্গে বিশ্বমঞ্চে নিজের শ্রেষ্ঠত্বের আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন তিনি।
যোগ করা সময়ের শেষ মুহূর্তে পেনাল্টি থেকে একটি গোল শোধ করেন নেইমার। তবে সেটি কেবল ব্যবধান কমানোর কাজই করেছে। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজতেই উল্লাসে ফেটে পড়ে নরওয়ে শিবির, আর হতাশা ও কান্নায় ভেঙে পড়ে ব্রাজিলের খেলোয়াড় ও সমর্থকরা।
১৯৯০ সালের পর এই প্রথম বিশ্বকাপের শেষ ষোলো পেরোতে ব্যর্থ হলো ব্রাজিল। অন্যদিকে প্রথমবারের মতো কোয়ার্টার ফাইনালে উঠে নতুন ইতিহাস লিখল নরওয়ে।
ম্যাচ শেষে সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠে নেইমারের দেরিতে মাঠে নামা। অনেকের প্রশ্ন, কোচ কার্লো আনচেলত্তি যদি তাঁর সবচেয়ে অভিজ্ঞ ও সৃজনশীল খেলোয়াড়কে আরও আগে মাঠে নামাতেন, তাহলে কি ম্যাচের ফল ভিন্ন হতে পারত? সেই প্রশ্নের উত্তর আর কখনো জানা যাবে না। তবে নিশ্চিতভাবে বলা যায়, সুযোগ নষ্টের খেসারত দিয়ে আর হালান্ডের নির্মম ফিনিশিংয়ের কাছে আত্মসমর্পণ করেই বিশ্বকাপ মিশন শেষ করতে হলো ব্রাজিলকে।


