বাংলাদেশের সংবিধানের ২৭ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।” কিন্তু বাস্তবে প্রশ্ন উঠেছে—আইনের এই সমতা কি সব ক্ষেত্রে কার্যকর হচ্ছে? সাম্প্রতিক কয়েকটি ঘটনা দেশের বিচারব্যবস্থা ও জবাবদিহিতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
ঈদের আগে রাজধানীর মগবাজারের আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশজুড়ে শোক ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। ঘটনার পর সরকার তদন্ত শুরু করে এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে। তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। পাশাপাশি মৃত্যুর ঘটনায় দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলাও হয়েছে এবং তদন্ত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাঠানো চিঠিতে জানানো হয়েছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ব্যাখ্যা সন্তোষজনক না হওয়ায় ‘দ্য মেডিক্যাল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অধ্যাদেশ, ১৯৮২’-এর ১১(২)(খ) ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগও দেওয়া হয়েছে।
স্বাস্থ্য খাতের পর্যবেক্ষকদের মতে, বেসরকারি হাসপাতালের অবহেলায় রোগীর মৃত্যুর ঘটনা নতুন নয়। অতীতে বহু অভিযোগ উঠলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ফলে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে সরকারের পদক্ষেপকে অনেকেই একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
অন্যদিকে, শিশু হত্যা ও নির্যাতনের ঘটনাতেও সাম্প্রতিক সময়ে দ্রুত বিচার নজর কাড়ছে। রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছর বয়সী শিশু রামিসা আক্তার ধর্ষণ ও হত্যা মামলার প্রধান আসামি সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না খাতুনকে আদালত মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন। ঘটনার মাত্র ছয় দিনের মধ্যে রায় ঘোষণাকে বিচারব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে সমালোচকদের প্রশ্ন, সব ক্ষেত্রে কি একইভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত হচ্ছে?
দেশজুড়ে হামের প্রাদুর্ভাবে শত শত শিশুর মৃত্যুর ঘটনায় এখনও পর্যন্ত দায় নির্ধারণ কিংবা বিচারিক প্রক্রিয়ায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা যায়নি। বিভিন্ন মহলের দাবি, সময়মতো টিকা সরবরাহে ব্যর্থতা এবং প্রশাসনিক গাফিলতির কারণেই এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।

ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স এক সংবাদ সম্মেলনে দাবি করেন, সম্ভাব্য টিকা সংকট সম্পর্কে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে একাধিকবার সতর্ক করা হয়েছিল। ইউনিসেফের মতে, টিকা ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থায় পরিবর্তনের কারণে সময়মতো টিকা দেশে পৌঁছায়নি।
এ ঘটনায় সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, সাবেক স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নুরজাহান বেগমসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও জবাবদিহিতার দাবি উঠেছে। তবে দায়ীদের বিরুদ্ধে মামলা করার একাধিক উদ্যোগ আদালতে টেকেনি। সর্বশেষ কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবালের দায়ের করা মামলার আবেদনও খারিজ করে দেয় আদালত।
এর আগে হামের প্রাদুর্ভাব ও শিশু মৃত্যুর ঘটনা তদন্তে একটি ইনকোয়ারি কমিশন গঠনের বিষয়ে রুল জারি করেছিলেন হাইকোর্ট। আদালত সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তাদের কাছে জবাবও চেয়েছেন। কিন্তু এখনও পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বা কার্যকর তদন্তের ফল সামনে আসেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সব ক্ষেত্রেই সমানভাবে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা জরুরি। আদ্-দ্বীন হাসপাতালের ঘটনায় যেমন দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তেমনি হামে আক্রান্ত হয়ে শত শত শিশুর মৃত্যুর ঘটনাতেও নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের বিচারের আওতায় আনা প্রয়োজন।
তাদের ভাষ্য, যদি ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া যায়, তাহলে শত শত শিশুর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানেও একই ধরনের গুরুত্ব দেওয়া উচিত। অন্যথায় আইনের সমতা ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে জনমনে সংশয় থেকেই যাবে।

হামে শত শত শিশুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদঘাটন, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের মধ্য দিয়েই কেবল রাষ্ট্র প্রমাণ করতে পারবে যে, দেশের প্রতিটি নাগরিকের জীবন সমান মূল্যবান এবং আইনের দৃষ্টিতে সবাই সমান।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version