২৮ বছরেও মেলেনি ভূমির অধিকার, অভাব-অবহেলা-বঞ্চনায় পাহাড়ের আদিবাসীরা

আজ ৯ আগস্ট আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস। প্রতিবছরের মতো এবারও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে দিবসটি পালিত হচ্ছে। তবে দিবসটি সামনে রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দীর্ঘদিনের ভূমি অধিকার, সাংবিধানিক স্বীকৃতি, নিরাপত্তা ও পুনর্বাসনের বিষয়গুলো আবারও সামনে এসেছে।

১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের পর প্রায় ২৯ বছর পেরিয়ে গেলেও চুক্তির গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি, ঐতিহ্যগত ভূমির অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া এবং অভ্যন্তরীণ ও ভারতফেরত শরণার্থীদের পুনর্বাসন নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে পাহাড়ের বিভিন্ন মহলে। ফলে দারিদ্র্য, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্য দিয়ে অনেক পরিবারকে জীবন কাটাতে হচ্ছে।

এবার জাতিসংঘ ঘোষিত আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসের প্রতিপাদ্য-‘আদিবাসী ধাত্রীদের সম্মান: অধিকার এগিয়ে নেওয়া, সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা নিশ্চিতকরণ এবং আন্তঃপ্রজন্মের কল্যাণ প্রচার’। প্রতিপাদ্যে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর অধিকার, সংস্কৃতি ও প্রজন্মগত কল্যাণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য ছিল পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত ভূমিস্বত্ব নিশ্চিত করা এবং ভূমি-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি করা। এ উদ্দেশ্যে ১৯৯৯ সালে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশন গঠন করে সরকার।

তবে কমিশন গঠনের পরও ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তির কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে এগোয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। আইন সংশোধনসহ বিভিন্ন জটিলতার কারণে কমিশনের কার্যক্রম দীর্ঘ সময় বাধাগ্রস্ত হয়। ২০১৬ সালে আইন সংশোধনের পর কমিশন পুনর্গঠিত হলেও চেয়ারম্যান পরিবর্তনসহ নানা কারণে এর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

রাঙামাটির লংগদু উপজেলার ঘনমোড় মৌজার শিলকাটা গ্রামের জ্ঞান লাল চাকমার ঘটনাটি ভূমি সমস্যার বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। ২০১৬ সালের ১৭ অক্টোবর তিনি খাগড়াছড়িতে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তি কমিশনে নিজের পাঁচ একর বসতভিটা ফেরত চেয়ে আবেদন করেন। কিন্তু সেই আবেদনের এখনো নিষ্পত্তি হয়নি বলে জানা গেছে।

বর্তমানে ওই জমিতে পুনর্বাসিত লোকজন বসবাস করছেন। ফলে নিজের জমি ফিরে না পেয়ে পরিবার নিয়ে বাঘাইছড়ির দেবাছড়ি গ্রামে অন্যের ভূমিতে বসবাস করতে হচ্ছে জ্ঞান লালকে।

একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি কৃষক ন্যালশন চাকমাও। পাহাড়ের অস্থিতিশীল পরিস্থিতির কারণে খাগড়াছড়ির দীঘিনালার পাবলাখালি থেকে পার্শ্ববর্তী দেশে শরণার্থী হিসেবে চলে গিয়েছিলেন তিনি। সম্প্রতি নিজ ভূমিতে ফিরলেও নিজের জমিজমা ফিরে পাননি। বর্তমানে সাজেক ইউনিয়নের বাঘাইহাট এলাকায় পরিবার নিয়ে উদ্বাস্তু জীবন কাটাচ্ছেন।

জ্ঞান লাল ও ন্যালশনের মতো আরও বহু পরিবার বসতভিটা হারিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

শান্তিচুক্তির পর ভারত থেকে ফিরে আসা শরণার্থী এবং অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তুদের পুনর্বাসনের জন্য সরকার টাস্কফোর্স কমিটি গঠন করে। ভারত প্রত্যাগত প্রায় ৩৭ হাজার পরিবারকে ২০ দফা প্যাকেজের আওতায় ফিরিয়ে আনা হলেও তাদের অনেকেই এখনো নিজেদের ভিটেমাটি ফিরে পাননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উদ্বাস্তু হিসেবে ৮০ হাজারের বেশি পরিবার তালিকাভুক্ত থাকলেও তাদের পুনর্বাসন ও ভূমি ফেরত দেওয়ার বিষয়টি এখনো পুরোপুরি সমাধান হয়নি।

টাস্কফোর্স কমিটির সদস্য সন্তোষিত চাকমা বকুলের দাবি, কমিটির চেয়ারম্যান পদ বর্তমানে শূন্য। এর আগে ২৮টি বৈঠক হলেও সেসব বৈঠকের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কার্যকর অগ্রগতি হয়নি। তাঁর অভিযোগ, ১৯৯৭ সালের পর থেকে হামলা, ঘরবাড়িতে অগ্নিসংযোগসহ বিভিন্ন ঘটনার কারণে বহু মানুষ নিরাপত্তাহীনতায় পড়েছেন এবং কেউ কেউ নিজ ভূমি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়েছেন।

১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তির মূল লক্ষ্য ছিল দীর্ঘদিনের সংঘাতের অবসান ঘটিয়ে পার্বত্য অঞ্চলে শান্তি, উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা। কিন্তু প্রায় তিন দশক পরও পাহাড়ে সহিংসতা, ভূমি বিরোধ, রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত দ্বন্দ্ব এবং নিরাপত্তাহীনতার অভিযোগ পুরোপুরি দূর হয়নি।

আদিবাসী অধিকারকর্মীদের অভিযোগ, ভূমির অধিকার নিশ্চিত না হওয়া, পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা এবং সাংবিধানিক স্বীকৃতির অভাব পাহাড়ের জনগোষ্ঠীর সংকটকে আরও দীর্ঘায়িত করছে। ফলে শান্তিচুক্তির সুফল প্রত্যাশিত মাত্রায় পৌঁছায়নি বলে তাদের দাবি।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ আদিবাসী ফোরামের উদ্যোগে আজ সকাল ১০টায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে র‌্যালি, আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। এতে মানবাধিকার ও নারী অধিকারকর্মী খুশী কবির, সংসদ সদস্য আন্না মিনজ, সাবেক সংসদ সদস্য উষাতন তালুকদার, অধ্যাপক ড. সুকোমল বড়ুয়া, টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামানসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যক্তিরা উপস্থিত থাকবেন।

এ ছাড়া খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানসহ তিন পার্বত্য জেলায় শোভাযাত্রা, সমাবেশ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, খুলনা, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, রাজশাহী, দিনাজপুর ও রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানেও দিবসটি পালিত হবে।

আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবসে অধিকার ও সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির দাবির পাশাপাশি পাহাড়ের মানুষের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা- নিজেদের ভূমি ও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা। শান্তিচুক্তির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন, ভূমি বিরোধের দ্রুত নিষ্পত্তি এবং উদ্বাস্তুদের যথাযথ পুনর্বাসন ছাড়া পাহাড়ে টেকসই শান্তি প্রতিষ্ঠা কঠিন।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version