বাংলাদেশ থেকে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় সৌজন্য উপহার হিসেবে আম পাঠানোর ঘটনাকে ঘিরে আবারও রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে তুমুল আলোচনা। একসময় শেখ হাসিনা সরকারের আমলে ভারতের বিভিন্ন নেতা ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের কাছে সৌজন্য উপহার হিসেবে আম পাঠানো হলে বিরোধী রাজনৈতিক মহল এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একটি অংশ সেটিকে ‘ভারতপ্রীতির কূটনীতি’ বলে তীব্র সমালোচনা করেছিল। সেই সময় শেখ হাসিনা সরকারের বিরুদ্ধে ভারতের প্রতি অতিরিক্ত অনুগত হওয়ার অভিযোগও বারবার তোলা হয়েছিল।

কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় রাজনৈতিক বাস্তবতা বদলেছে। এখন বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকারের উদ্যোগে পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় আবারও পাঠানো হয়েছে বাংলাদেশের বিখ্যাত আম। আর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই নতুন করে উঠেছে প্রশ্ন, যে কূটনৈতিক উদ্যোগ একসময় ‘ভারতপ্রীতি’ হিসেবে আখ্যায়িত হয়েছিল, আজ একই ধরনের পদক্ষেপ কীভাবে মূল্যায়িত হবে?

মঙ্গলবার (৩০ জুন) যশোরের বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে কলকাতায় পাঠানো হয় ৫০০ কেজি আম্রপালি ও হাঁড়িভাঙ্গা আম। এর মধ্যে ১০০ কেজি আম পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া বাকি আম পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তি, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এবং আমন্ত্রিত অতিথিদের মধ্যে সৌজন্য উপহার হিসেবে বিতরণ করা হবে।

একই দিনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী ডা. মানিক সাহার জন্য ৬০০ কেজি আম পাঠানো হয়। ত্রিপুরায় পাঠানো চালানেও ছিল বাংলাদেশের জনপ্রিয় আম্রপালি ও হাঁড়িভাঙ্গা জাতের আম। আনুষ্ঠানিকভাবে এই উপহার ত্রিপুরা সরকারের প্রতিনিধিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়, যা প্রতিবেশী দুই অঞ্চলের পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও কূটনৈতিক সম্পর্কের অংশ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

ফলে পশ্চিমবঙ্গের জন্য ৫০০ কেজি এবং ত্রিপুরার জন্য ৬০০ কেজি, মোট ১,১০০ কেজি আম ভারতের দুই রাজ্যে সৌজন্য উপহার হিসেবে পাঠিয়েছে বাংলাদেশ। ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই অতীত ও বর্তমানের এই দুই ঘটনার তুলনা টেনে প্রশ্ন তুলছেন। তাঁদের বক্তব্য, শেখ হাসিনা সরকারের সময় একই ধরনের সৌজন্য কূটনীতিকে যারা ‘ভারতপ্রেম’ বা ‘ভারতের দালালি’ বলে সমালোচনা করেছিলেন, এখন তারা কী ব্যাখ্যা দেবেন? একই কাজ ভিন্ন সরকারের ক্ষেত্রে ভিন্নভাবে মূল্যায়ন করা হলে তা রাজনৈতিক দ্বৈত মানদণ্ডের উদাহরণ হয়ে দাঁড়ায় বলেও মন্তব্য করছেন অনেকে।

অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মৌসুমি ফল, খাদ্যসামগ্রী বা সাংস্কৃতিক উপহার বিনিময় দীর্ঘদিনের স্বীকৃত কূটনৈতিক রীতি। এ ধরনের সৌজন্য বিনিময়কে সাধারণত দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্ক উন্নয়নের অংশ হিসেবেই দেখা হয়। তবে বাংলাদেশে ভারত ইস্যু দীর্ঘদিন ধরেই রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল হওয়ায় এমন উদ্যোগ প্রায়ই রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দেয়।

পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় আম পাঠানোর এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আবারও আলোচনায় এসেছে একটি পুরোনো প্রশ্ন, রাষ্ট্রীয় সৌজন্য কি সব সরকারের ক্ষেত্রেই একই মানদণ্ডে বিচার করা হবে, নাকি রাজনৈতিক অবস্থান বদলালে একই উদ্যোগের ব্যাখ্যাও বদলে যাবে? এই প্রশ্ন এখন রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version