এস আলমের নিয়ন্ত্রণকালে ১০ হাজার ৮৩২ নিয়োগ; পটিয়ার ৫১৪৮ জন, পরে ছাঁটাই ৪৬৮৫

এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকা সময়ে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিতে নিয়োগে ব্যাপক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটিতে ১০ হাজার ৮৩২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হলেও এর মধ্যে ৮ হাজার ৫৪২ জনকে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই শুধু জীবনবৃত্তান্ত (সিভি) জমা নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়।

এসব নিয়োগপ্রাপ্তের বড় অংশই চট্টগ্রামের। শুধু চট্টগ্রাম জেলা থেকেই নিয়োগ পেয়েছেন ৮ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে ৫ হাজার ১৪৮ জনের বাড়ি পটিয়া উপজেলায়। এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান সাইফুল আলমের গ্রামের বাড়িও এই পটিয়ায়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সাইফুল আলমের পটিয়ার বাড়ি এবং চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জে এস আলম গ্রুপের অফিসে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার জন্য বাক্স রাখা থাকত। এসব বাক্সে পদের পাশাপাশি এলাকার নামও উল্লেখ করা ছিল।

‘পটিয়া জেনারেল’, ‘পটিয়া ক্যাশ’, ‘পুরুষ জেনারেল-সাতকানিয়া-লোহাগাড়া’, ‘পুরুষ ক্যাশ-গণ্ডামারা-বাঁশখালী’, ‘সনাতন জেনারেল’, ‘মহিলা ক্যাশ’, ‘পিয়ন-ডিপ্লোমা’, ‘পুরুষ জেনারেল’ ও ‘পুরুষ ক্যাশ’- এমন বিভিন্ন পরিচয়ে এসব বাক্সে সিভি জমা নেওয়া হতো।

বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল দৈবচয়ন ভিত্তিতে ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া ১০ কর্মকর্তার লিখিত বক্তব্যও নিয়েছে। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তারা সাইফুল আলমের পটিয়ার বাড়ি ও আসাদগঞ্জের অফিসে রাখা বাক্সে সিভি জমা দিয়েছিলেন। সেখানেই মৌখিক পরীক্ষা ও যোগদানপত্র দেওয়া হয়। ১০ জনের মধ্যে দুজনের মৌখিক পরীক্ষাও নেওয়া হয়নি।

ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো পদে নিয়োগের আগে অন্তত দুটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হয়। এরপর যোগ্য প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ৮ হাজার ৫৪২ জনকে এসব প্রক্রিয়া ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মোট ২৭টি পদে এমন নিয়োগের তথ্য পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) পদে ২ হাজার ৭৮৯ জন, ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার পদে ২ হাজার ১৬০ জন, মেসেঞ্জার কাম গার্ড পদে ১ হাজার ৫৪৪ জন এবং রুরাল ডেভেলপমেন্ট স্কিমের (আরডিএস) স্টাফ হিসেবে ৯১৫ জন নিয়োগ পান। ট্রেইনি জুনিয়র অফিসার পদে নিয়োগ দেওয়া হয় ৫০১ জনকে।

শুধু সাধারণ পদ নয়, ব্যাংকের উচ্চপর্যায়ের পদেও বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগের তথ্য পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময়ে দুজন ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি), আটজন উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি), দুজন এসইভিপি এবং একজন ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের প্রিন্সিপাল নিয়োগ পান বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই। পাঁচজন ইভিপির মধ্যে চারজনের নিয়োগও একইভাবে দেওয়া হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, ডিএমডি হতে অন্তত ২০ বছরের অভিজ্ঞতা এবং আগের পদে দুই বছরের অভিজ্ঞতা প্রয়োজন। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই শর্ত পূরণ না করেই এস আলমের পিএস আকিজ উদ্দিনকে আট বছরের ব্যাংকিং অভিজ্ঞতায় এবং মিফতাহ উদ্দীনকে ১৭ বছরের অভিজ্ঞতায় ডিএমডি পদে নিয়োগ দেওয়া হয়।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টে কথিত ছাত্র আন্দোলনের পর বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন এবং চারটি বহির্নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠানের বিশেষ নিরীক্ষায় ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগে অনিয়মের তথ্য উঠে আসে।

এরপর ওই সময়ে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের যোগ্যতা যাচাই করতে মূল্যায়ন পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ।

২০২৫ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ওই মূল্যায়ন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাথমিকভাবে ৫ হাজার ৩৭৩ জনকে পরীক্ষার আওতায় আনা হয়েছিল। এর মধ্যে ৪০২ জন পরীক্ষায় অংশ নেন এবং তারা সবাই চাকরিতে বহাল রয়েছেন। অন্যদিকে ৪ হাজার ৯৭১ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি। পরবর্তীতে বিভিন্ন কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে না পারা আরও ২৮৭ জনকে প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়।

এরপর ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করার সিদ্ধান্ত নেয় ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ। তাদের মধ্যে ৪ হাজার ৪৪০ জনের বাড়ি চট্টগ্রামে। ১৫৫ জন কক্সবাজারের, ১০ জন ঢাকার এবং অন্যান্য ৬১ জেলার ৮০ জন।

এ ছাড়া পাঁচজনকে বাধ্যতামূলক অবসর দেওয়া হয়। বিভিন্ন অভিযোগে ১২১ জন, চুক্তির মেয়াদ শেষে নবায়ন না করায় ১ হাজার ১৯০ জন এবং অন্যান্য কারণে ১৩৬ জনকে চাকরিচ্যুত করা হয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের মধ্যে চট্টগ্রামের ৮ হাজার ৯৯ জন। এরপর কক্সবাজারের ৩৯৮, কুমিল্লার ১১৪, ময়মনসিংহের ৯৯, বগুড়ার ৯৭ এবং ঢাকার ৯৬ জন।

এ ছাড়া রাজশাহীর ৮৩, যশোরের ৭৮, গাইবান্ধার ৭৫ এবং রংপুরের ৬৬ জন নিয়োগ পান। অন্যান্য ৫৪ জেলা থেকে নিয়োগ দেওয়া হয় আরও ১ হাজার ৬২৭ জনকে।

বছরভিত্তিক হিসাবে ২০১৭ সালে ৩৬৭ জন, ২০১৮ সালে ১ হাজার ১১৮, ২০১৯ সালে ২ হাজার ৪৬৭, ২০২০ সালে ২ হাজার ১১০, ২০২১ সালে ৮৬৫, ২০২২ সালে ২ হাজার ১১৯, ২০২৩ সালে ৩৯৭ এবং ২০২৪ সালে ১ হাজার ৩৯২ জন নিয়োগ পান।

প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও নিয়ম না মানার তথ্য উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচের ১৯০ জনকে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। তাদের মধ্যে ১২ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও নিয়োগ পান।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ৮৪০ জনের সিভি প্রধান কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে ৭৬৩ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ নেন। ৫০ শতাংশের বেশি নম্বর পান মাত্র ৩৬ জন। পরে শর্ত শিথিল করে ২০ শতাংশ নম্বর পাওয়া প্রার্থীদেরও মৌখিক পরীক্ষায় ডাকা হয়।

শেষ পর্যন্ত ৩০৪ জনকে উত্তীর্ণ করা হয়। তাদের মধ্যে ১৯০ জনকে ইসলামী ব্যাংক এবং ১২৬ জনকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো হয়।

ইসলামী ব্যাংকে পাঠানো ১৯০ জনের মধ্যে ১৮৪ জন যোগদান করেন। বর্তমানে তাদের ৩১ জন চাকরিতে আছেন। ২১ জন পদত্যাগ করেছেন, ১৩১ জন চাকরি হারিয়েছেন এবং একজন মারা গেছেন।

তবে ২৫তম ব্যাচের নিয়োগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর মাধ্যমে লিখিত পরীক্ষা নেওয়া হয়। ওই ব্যাচে নিয়োগ পাওয়া ১৫০ জনের মধ্যে ৮৮ জনই চট্টগ্রামের।

২০১৭ সালে নিয়োগ পাওয়া ১৪৪ জন এবং ২০২৪ সালে নিয়োগ পাওয়া ২০০ প্রবেশনারি অফিসারের নিয়োগ যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করে হয়েছে। ২০২৪ সালের ওই ২০০ জনের মধ্যে চট্টগ্রামের ছিলেন ৩৬ জন।

ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন বলেছেন, সব ধরনের প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই কর্মী ছাঁটাই করা হয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে নিয়োগ পাওয়া কর্মীদের জন্য মূল্যায়ন পরীক্ষা আয়োজন করা হয়েছিল। যারা পরীক্ষায় অংশ নেননি, তাদের প্রথমে ওএসডি করা হয়। পরে প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কর্মী নিয়োগ ও ছাঁটাই ব্যাংকের নিজস্ব বিষয়। ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষই এসব কর্মী নিয়োগ করেছে এবং তারাই পরবর্তী সময়ে ছাঁটাই করেছে। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের হস্তক্ষেপ করা সমীচীন হবে না।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version