আদিত্য প্রতাপ ঘোষের কলাম

পৃথিবীতে জন্মদিন নিয়ে এতটা হাসিখেলা বোধ হয় খুব কম মানুষের ভাগ্যেই জোটে! খালেদা জিয়ার জন্মতারিখ নিয়ে যে তথ্য সামনে আসে, তাতে মনে হতে পারে একজন মানুষের জন্ম হয়েছে সম্ভবত একবার, কিন্তু জন্মদিন যেন একাধিকবার!

খালেদা জিয়ার প্রথম পরীক্ষার মার্কশিট বলছে তার জন্মতারিখ ৫ সেপ্টেম্বর ১৯৪৬। মেট্রিক পরীক্ষাগামী সার্টিফিকেটে আবার ৪ আগস্ট ১৯৪৪। সেই পরীক্ষা দূরে থাক, উর্দু ব্যতিত অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ হতে পারেন নি শেষপর্যন্ত। তার পুরোনো পাসপোর্ট খুললে দেখা যায় ৫ আগস্ট ১৯৪৬। বর্তমান মানে তার সর্বশেষ পাসপোর্টে তারিখ বদলে হয়ে গেছে ১৫ আগস্ট ১৯৪৬। কোভিড-১৯ টেস্ট রিপোর্টও পিছিয়ে নেই, সেখানে আবার ৮ মে ১৯৪৬!

আর সবশেষে প্রধানমন্ত্রীর শপথের রেকর্ডে উল্লেখ ১৯ আগস্ট ১৯৪৭। হিসাবরক্ষকও ক্যালকুলেটর বন্ধ করে বললো “ভাই, আসল জন্মদিনটা আগে ঠিক করেন, তারপর হিসাব করি মোট কয়টা!”

বিষয়টি মূলত আলোচিত হয়ে ওঠে ১৫ই আগস্টকে ঘিরে। ১৫ই আগস্ট বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বেদনাবিধুর দিন। বাংলাদেশের মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হন। বাংলাদেশী প্রতিটি মুক্তিযুদ্ধ-পন্থী মানুষেরা ১৫ই অগাস্টকে শোক দিবস হিসেবে বিনম্র শ্রদ্ধায় বঙ্গবন্ধুকে স্বরণ করে। বিএনপি আর খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক নোংরামো সেখান থেকেই শুরু। যে মানুষটি বাংলাদেশ নামের একটি ভূখণ্ডের জন্মের জন্যে নিজের জীবন উৎসর্গ করলেন, খালেদা জিয়া গং সীমাহীন রাজনৈতিক নোংরামো করে সেই দিনটায় নিজের ভূয়া জন্মদিন পালন শুরু করে।

জন্মতারিখের নথিগত অসঙ্গতি যখন সামনে আসে, তখন প্রশ্নটা আর শুধু জন্মদিনের থাকে না, এটি পরিণত হয় রাজনীতির এক দীর্ঘস্থায়ী হাস্য-রহস্যে। একজন মানুষের জন্মদিন সাধারণত বছরে একবার আসে। কিন্তু নথিগুলো যদি এমন হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে ক্যালেন্ডার কি ভুল, নাকি ক্যালেন্ডারই বিভ্রান্ত? নাকি রাজনৈতিক উন্মাদের অন্যুন শিষ্টাচারমার্কশিটের এক তারিখ, সার্টিফিকেটে আরেক, পাসপোর্টে এক রকম, আবার নতুন পাসপোর্টে অন্য রকম এ যেন জন্মতারিখ নয়, রীতিমতো ‘ভার্সন আপডেট’! তবে হাস্যরসের আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন থেকেই যায়। এতগুলো সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক নথিতে যদি ভিন্ন ভিন্ন জন্মতারিখ উল্লেখ থাকে, তাহলে সঠিক জন্মতারিখ কোনটি? আর কোন নথিটিই বা চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে গ্রহণযোগ্য? আজ পর্যন্ত বিএনপি এই ধোয়াশা পরিস্কার করেনি।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে অনেক রহস্যের সমাধান হয় না, বরং সময়ের সঙ্গে রহস্য আরও ঘনীভূত হয়। খালেদা জিয়ার জন্মতারিখের কাহিনিটিও যেন তেমনই! জন্ম একবারের, তারিখ অনেক; আর হিসাব করতে গিয়ে ইতিহাসই বিভ্রান্ত!

তাই এখন সবচেয়ে যৌক্তিক দাবি একটাই। রাজনৈতিক বক্তব্য নয়, মূল সরকারি নথি প্রকাশ করে জন্মতারিখের রহস্যের অবসান ঘটানো হোক। কারণ জন্মদিন যদি বছরে একবার হয়, তাহলে জন্মতারিখও অন্তত একটাই হওয়া উচিত!

আদিত্য প্রতাপ ঘোষ
লেখক, ব্লগার ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version