সরকারি হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের আকাশ-পাতাল ফারাক, সিন্ডিকেটের কারসাজিতে চড়া দামে সার- কৃষকের দুর্ভোগে দায় এড়াতে পারে না সরকার
চলতি আমন মৌসুমে দেশে সারের কোনো ঘাটতি নেই- সরকারের পক্ষ থেকে এমন আশ্বাস বারবারই দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা। চাহিদার গুরুত্বপূর্ণ সময়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় সার নিয়ে তৈরি হয়েছে তীব্র সংকট। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মিলছে না প্রয়োজনীয় সার, কোথাও আবার নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে কিনতে বাধ্য হচ্ছেন কৃষক।
সরকারি খাতা-কলমে পর্যাপ্ত মজুদ ও সরবরাহের হিসাব থাকলেও মাঠে কেন এই সংকট- এই প্রশ্নের জবাব দিতে হবে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও কৃষি বিভাগকেই। কারণ সরবরাহব্যবস্থা সচল রাখা, ডিলারদের নিয়ন্ত্রণ করা, অবৈধ মজুদ ও কালোবাজারি ঠেকানো এবং কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে সার পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব শেষ পর্যন্ত সরকারেরই।
উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কুড়িগ্রাম ও মাগুরার চিত্রেই এ বৈপরীত্য স্পষ্ট। সরকারি হিসাবে দুই জেলাতেই পর্যাপ্ত সার মজুদ রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এক বস্তা সার সংগ্রহ করতেই কৃষকদের ছুটতে হচ্ছে দোকান থেকে দোকানে। কোথাও আবার টাকা দিয়েও সময়মতো সার পাওয়া যাচ্ছে না।
কৃষি বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, চাহিদা অনুযায়ী সার সরবরাহ করা হয়েছে। এমনকি সরবরাহে বিঘ্ন এড়াতে সেপ্টেম্বরের বরাদ্দও আগস্টের শেষদিকে ডিলারদের তুলে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়। তাহলে সেই সার গেল কোথায়- এ প্রশ্নের উত্তর এখন জরুরি।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাদের একাংশ টাকা নেওয়ার পরও সার সরবরাহ করছেন না। আবার অনেকে ৫০ কেজির বস্তা ভাঙতে রাজি নন। ফলে পাঁচ বা ১০ কেজি সার প্রয়োজন এমন ক্ষুদ্র কৃষককেও পুরো বস্তা কিনতে হচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়ছেন প্রান্তিক চাষিরা।
কুড়িগ্রামে এবার ১ লাখ ১০ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন আবাদ হয়েছে। এর জন্য ৫৩ হাজার ৯৫০ টন ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, আগাম সার উত্তোলনের কারণে জেলায় সংকট থাকার কথা নয়।
কিন্তু ভূরুঙ্গামারীর সোনাহাট বাজারে দেখা গেছে ভিন্ন চিত্র। বুধবার বিএডিসির ডিলার ‘মেসার্স রাকিবুল ট্রেডার্স’-এর সামনে সার না পেয়ে বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা সোনাহাট স্থলবন্দরের প্রধান সড়ক অবরোধ করেন। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে উপজেলা প্রশাসনের হস্তক্ষেপে পুলিশ ও বিজিবির সশস্ত্র সদস্যদের উপস্থিতিতে সার বিক্রি করতে হয়।
নির্ধারিত বিক্রির দিন না থাকলেও কৃষকদের তীব্র বিক্ষোভের মুখে সার ছাড়তে বাধ্য হওয়ার কথা স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট ডিলার।
কুড়িগ্রাম সদরের কৃষক আবদুস সবুর বলেন, খরার ক্ষতির পর এখন সারসংকটে পড়েছেন তারা। শেষ পর্যন্ত কেজিপ্রতি অতিরিক্ত পাঁচ টাকা দিয়ে অল্প পরিমাণ সার সংগ্রহ করতে হয়েছে।
সংকটের চিত্র আরও ভয়াবহ ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারে। সরকার নির্ধারিত ২৭ টাকার টিএসপি বিক্রি হচ্ছে ৩৫ থেকে ৪০ টাকায়। ২১ টাকার ডিএপির দাম উঠেছে ৩০ থেকে ৩২ টাকা পর্যন্ত।
ভূরুঙ্গামারীর ধলডাঙ্গা বাজারে একটি বেসরকারি গুদামে অভিযান চালিয়ে কৃষকেরা প্রায় ১০ হাজার কেজি সার পেয়ে যাওয়ার ঘটনাও প্রশ্ন তুলেছে মজুদ ব্যবস্থাপনা নিয়ে। কৃষকদের অভিযোগ, পরিদর্শন ও নজরদারি এড়াতে কোথাও কোথাও সার গুদামজাত করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হচ্ছে।
মাগুরার চিত্রও খুব একটা আলাদা নয়। জেলার ৬১ হাজার ৯৫৫ হেক্টর আমন জমিতে প্রয়োজনীয় টিএসপি ও ডিএপি নিয়ে কৃষকদের মধ্যে তীব্র উদ্বেগ রয়েছে।
কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদা অনুযায়ী সার দেওয়া হচ্ছে না। এমনকি টিএসপি বা ডিএপি নিতে গেলে কোনো কোনো ডিলার অপ্রয়োজনীয় অন্য সারও কিনতে বাধ্য করছেন। এতে বাড়তি খরচের বোঝা চাপছে কৃষকের ওপর। কৃষক স্মৃতি রঞ্জনের প্রশ্ন, প্রয়োজনীয় সার সময়মতো না পেলে কাঙ্ক্ষিত ফলন কীভাবে সম্ভব?
অথচ সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাগুরার গুদামগুলোতে বিপুল পরিমাণ সার মজুদ রয়েছে। ডিলারদেরও কয়েক মাসের বরাদ্দ উত্তোলন করা হয়েছে। তাহলে গুদাম থেকে মাঠে যাওয়ার পথে কোথায় আটকে যাচ্ছে সার- এখন সেই প্রশ্নই বড় হয়ে উঠেছে।
সরকারি হিসাবেই গত কয়েক মাসে জেলার বিভিন্ন বাজারে অভিযান চালিয়ে ৭০০ বস্তার বেশি অবৈধ সার জব্দ করে নিলামে বিক্রি করা হয়েছে। এতে প্রমাণিত হয়, শুধু ‘পর্যাপ্ত মজুদ’ দেখালেই কৃষকের হাতে সার পৌঁছায় না; প্রয়োজন কার্যকর তদারকি ও জবাবদিহি।
চলতি আমন মৌসুমের চিত্রে সবচেয়ে বড় যে বিষয়টি স্পষ্ট, তা হলো- সরকারি গুদামে সার থাকলেই কৃষকের সংকট দূর হয় না। বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা, ডিলারদের ওপর কার্যকর নজরদারির অভাব, অবৈধ মজুদ এবং বাজার কারসাজির সুযোগ তৈরি হলে কাগজে হাজার হাজার টন সার থাকলেও মাঠে কৃষকের হাহাকার চলতেই পারে।
আর এই ব্যর্থতার দায় শুধু ডিলার বা খুচরা ব্যবসায়ীর ওপর চাপিয়ে সরকার দায়মুক্ত হতে পারে না। কৃষকের কাছে নির্ধারিত দামে, নির্ধারিত সময়ে সার পৌঁছে দেওয়ার পুরো ব্যবস্থাটিই সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন। সেই ব্যবস্থায় কোথাও ফাঁক থাকলে তা বন্ধ করার দায়িত্বও সরকারের।
কৃষক সময়মতো সার না পেলে ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমন উৎপাদন। উৎপাদন কমলে বাড়তে পারে চালের দাম, বাড়বে খাদ্যনিরাপত্তার ঝুঁকি। ফলে এটি শুধু সারসংকট নয়- এটি কৃষক, বাজার ও খাদ্যনিরাপত্তার ওপর সরাসরি আঘাত।


