আগুন-লুটপাটের পর বন্ধ শিল্পকারখানা; পুড়েছে হাজার কোটি টাকার সম্পদ, অনিশ্চয়তায় হাজারো শ্রমিক
আগুন শুধু কারখানা পোড়ায়নি-পুড়েছে হাজারো মানুষের জীবিকার নিশ্চয়তা। কোথাও ধ্বংস হয়েছে উৎপাদনব্যবস্থা, কোথাও লুট হয়েছে কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য, আবার কোথাও আগুনের পর বন্ধ হয়ে গেছে কারখানার গেট। কিন্তু ধ্বংসস্তূপের সবচেয়ে বড় ক্ষত দেখা যাচ্ছে শ্রমিকের ঘরে- যেখানে মাস শেষে বেতন পৌঁছায় না, বাজারের খাতা বাড়ে, সন্তানের পড়াশোনা অনিশ্চিত হয়, আর ভবিষ্যৎ পরিণত হয় দীর্ঘ অপেক্ষায়।
নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে গাজী টায়ারসের ঘটনাটি তারই নির্মম উদাহরণ। আগস্টের কথিত ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের শুরুতে নিজের কর্মস্থলকে আগুনে জ্বলতে দেখেছিলেন মোহাম্মদ ইপন। দূরের ভাড়া বাসা থেকে তিনি দেখছিলেন কারখানা থেকে আকাশে উঠছে কালো ধোঁয়া। বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল।
কারখানাটিতে রাবার, কেমিক্যালসহ বিপুল পরিমাণ দাহ্য পদার্থ ছিল। ফলে আগুন দ্রুত ভয়াবহ রূপ নেয়। ফায়ার সার্ভিস দীর্ঘ চেষ্টা চালিয়ে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনলেও ততক্ষণে আট বছরের পরিচিত কর্মস্থল কার্যত ধ্বংসস্তূপ। আগুনের পরও বিপর্যয় থামেনি। শুরু হয় লুটপাট। দিন গড়ায়, সপ্তাহ পেরোয়, মাস আসে-কিন্তু কারখানার গেট আর খোলে না।
ইপনের হাতে তখন চাকরি নেই। কিছুদিন সংসার চালাতে কাছাকাছি একটি কারখানায় কাজ নেন তিনি। সেই কাজও স্থায়ী হয়নি। শেষ পর্যন্ত পরিবার নিয়ে শেরপুরের গ্রামের বাড়িতে ফিরে যান। এখন কৃষিকাজ করেই চলছে তাঁর সংসার।
একটি কারখানা পুড়েছে, কিন্তু তার সঙ্গে নিভে গেছে হাজারো পরিবারের আয়ের আলো।
মালিকের রাজনীতি, মাশুল শ্রমিকের
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভার সদস্য গোলাম দস্তগীর গাজীর মালিকানাধীন গাজী টায়ারস ছিল দেশের অন্যতম বড় টায়ার উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকায় গাজী গ্রুপের আরেকটি কারখানাও অগ্নিকাণ্ডে ধ্বংস হয়।
দুই কারখানায় কর্মরত ছিলেন প্রায় ৭ হাজার ২০০ মানুষ। তাঁদের বড় অংশের বাড়ি ময়মনসিংহ, শেরপুর, মাদারীপুর, বরিশাল ও কুমিল্লাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়। কারখানার মালিকের রাজনৈতিক পরিচয় শ্রমিকের হাতে ছিল না। কিন্তু সেই পরিচয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে হামলা হলে তার প্রথম আঘাত গিয়ে পড়ে শ্রমিকের ওপর।
রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, অস্থিরতা কিংবা মালিকের রাজনৈতিক পরিচয়ের দায় একজন শ্রমিক কেন বেকার হয়ে বহন করবেন?
২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের কথিত ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের আগে ও পরে দেশের প্রায় তিন ডজন শিল্পকারখানায় অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। হামলার শিকার হওয়া অনেক প্রতিষ্ঠানের মালিকের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার কথা সামনে এলেও কারখানাগুলোর প্রকৃত ক্ষতির তালিকায় সবচেয়ে বড় নামগুলো শ্রমিকদের।
কারখানা বন্ধ মানে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের উৎপাদন বন্ধ নয়। এর অর্থ- হাজারো পরিবারের আয় বন্ধ, স্থানীয় বাজারে অর্থের প্রবাহ কমে যাওয়া এবং ব্যাংক থেকে সরবরাহকারী পর্যন্ত পুরো অর্থনৈতিক শৃঙ্খলে চাপ তৈরি হওয়া।
কারখানা বন্ধ, থেমে যায় বাজারও
গাজী টায়ারসের পাশে রূপসী বাজারে এক দশকেরও বেশি সময় দোকান চালিয়েছেন আবু বকর। তাঁর প্রধান ক্রেতাদের বড় অংশ ছিলেন কারখানার শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা। বেতন পেতেন শ্রমিকেরা। বাজারে কেনাকাটা করতেন। দোকানদার আয় করতেন। সেই অর্থ আবার স্থানীয় অর্থনীতিতে ঘুরত। কারখানা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই চক্র ভেঙে পড়ে।
বিক্রি কমে গেলেও কয়েক মাস দোকানটি টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেন বকর। শেষ পর্যন্ত তাকেও দোকান ছাড়তে হয়।
অর্থাৎ আগুন কারখানার সীমানার মধ্যে আটকে থাকেনি। তার ধাক্কা গিয়ে পড়েছে আশপাশের দোকান, পরিবহন, ভাড়াবাড়ি, খাবারের ব্যবসা- সবখানে।
ধ্বংসের হিসাব শুধু টাকায় হয় না
রাজনৈতিক অস্থিরতার অর্থনৈতিক ক্ষতি বাংলাদেশে নতুন নয়।
২০০৫ সালে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) পরিচালিত এক গবেষণায় বলা হয়েছিল, হরতালের কারণে দেশের জিডিপির গড়ে ৩ থেকে ৪ শতাংশ ক্ষতি হতো। এর মধ্যে আয়, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান কমার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির বিষয়ও ছিল।
২০১২ সালের শেষ থেকে ২০১৩ সালের শুরুর দিকে টানা হরতালের সময় ইন্টারন্যাশনাল চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, বাংলাদেশ (আইসিসিবি) দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ডলার ক্ষতির কথা জানিয়েছিল।
২০১৫ সালের ইন্টারন্যাশনাল গ্রোথ সেন্টারের এক গবেষণায়ও রাজনৈতিক অস্থিরতার রপ্তানিতে নেতিবাচক প্রভাবের চিত্র উঠে আসে। সেখানে টানা সাত দিনের হরতালে একটি প্রতিষ্ঠানের রপ্তানি কার্যক্রম প্রায় সাড়ে ৪ শতাংশ কমে যাওয়ার কথা বলা হয়।
অর্থাৎ রাজনৈতিক অস্থিরতা শেষ হয়ে গেলেই অর্থনৈতিক ক্ষত শুকিয়ে যায় না। রাজপথ শান্ত হলেও কারখানার চুল্লি ঠান্ডা থাকলে অর্থনীতি স্বাভাবিক হয় না।
বেঙ্গল গ্রুপ: আগুনের পর ঋণের ফাঁদ
কথিত ছাত্র গণঅভ্যুত্থানের পর ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে বেঙ্গল গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজও। ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট সাভারে বিকেএসপির কাছে প্রতিষ্ঠানটির তিনটি কারখানায় আগুন দেওয়া হয়। বেঙ্গল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিনের ভাষ্য অনুযায়ী, সেখানে প্রায় ৩ হাজার কর্মী কাজ করতেন এবং ক্ষতির পরিমাণ ছিল এক হাজার কোটি টাকার বেশি।
কারখানাগুলোর প্রায় ৩৫০ কোটি টাকার ব্যাংকঋণ ছিল। উৎপাদন বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর ঋণ খেলাপি হলে সমস্যাটি আর শুধু ওই তিন কারখানার মধ্যে থাকেনি। পুরো গ্রুপের ব্যাংকিং কার্যক্রমে তার প্রভাব পড়ে। এমনকি অন্য প্রতিষ্ঠানের কাঁচামাল আমদানির জন্য এলসি খোলাও কঠিন হয়ে যায় বলে জানান তিনি।
এখানেই ধ্বংসের দ্বিতীয় ধাপ। আগুন কারখানা পুড়িয়ে দেয়, আর অর্থায়ন সংকট অনেক সময় বাকি শিল্পটাকেও টেনে নামায়।
বেক্সিমকো: কারখানা আছে, কিন্তু উৎপাদনের টাকা নেই
বেক্সিমকোর ঘটনাও একই সংকটকে আরও স্পষ্ট করে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ওসমান কায়সার চৌধুরীর ভাষ্য অনুযায়ী, ৫ আগস্টের পর বেক্সিমকো ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কে হামলা ও অগ্নিসংযোগে প্রায় ৮০০ কোটি টাকার কাঁচামাল ও তৈরি পণ্য ধ্বংস হয়।
পরবর্তী সময়ে পর্যাপ্ত ক্রয়াদেশ ও অর্থায়ন সংকটের প্রেক্ষাপটে বেক্সিমকো গ্রুপের ১৫টি পোশাক কারখানার প্রায় ৪০ হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের খবর আসে।
গ্রুপটির ভাইস চেয়ারম্যান সালমান এফ রহমান শেখ হাসিনা সরকারের বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টা ছিলেন। তাঁর গ্রেপ্তার ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক অর্থায়ন বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা জানায় প্রতিষ্ঠানটি। বিপুল ঋণ ও অর্থায়ন সংকটে বেশির ভাগ কারখানা পুনরায় চালু করা সম্ভব হয়নি। বেক্সিমকো গ্রুপের ব্যাংকঋণের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
ওসমান কায়সার চৌধুরীর বক্তব্যে সংকটের মূল জায়গাটি পরিষ্কার- কারখানা আছে। মেশিন আছে। উৎপাদনের সক্ষমতাও আছে। কিন্তু চলতি মূলধন নেই। আর মূলধন না থাকলে কারখানা কেবল ভবন ও যন্ত্রপাতির সমষ্টি হয়ে থাকে।
গাজী গ্রুপের সামনে একই প্রশ্ন
গাজী গ্রুপের ক্ষতিগ্রস্ত কারখানাগুলোও এখন পুনরায় চালুর অপেক্ষায়। প্রতিষ্ঠানটির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, কারখানা চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বিমা-সংক্রান্ত জটিলতাসহ বেশ কিছু বিষয় এখনো নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।
২০২৪ সালের কথিত ছাত্র আন্দোলনে হামলা ও অগ্নিসংযোগে রূপগঞ্জে গাজী গ্রুপের দুটি শিল্প ব্লকে প্রায় ২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার আগে দেশের টায়ারের মোট চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ পূরণ করত গাজী গ্রুপ- এমন দাবি রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে।
অর্থাৎ এখানে ক্ষতি শুধু একটি কোম্পানির নয়। দেশীয় উৎপাদন, বাজার, সরবরাহব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থান- সবকিছুর সঙ্গে এর সম্পর্ক রয়েছে।
গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে শ্রমিকের অপেক্ষা
রূপগঞ্জের গাজী টায়ারসের বন্ধ প্রধান ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন রহমত আলী।
কারখানা বন্ধ হওয়ার পর শরীয়তপুরের গ্রামের বাড়িতে ফিরে গেছেন তিনি। কিন্তু পুরোনো কর্মস্থলের টান কাটেনি। সুযোগ পেলেই রূপগঞ্জে এসে বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়ান। ভেতরে তাকান। অপেক্ষা করেন। কারখানা খুলেছে কি না-দেখতেই তাঁর এই আসা। তিনি আবার কাজ করতে চান। পুরোনো কর্মস্থলেই।
এই অপেক্ষার মধ্যে বাংলাদেশের শিল্প খাতের একটি বড় বাস্তবতা লুকিয়ে আছে।
কারখানা পুনর্নির্মাণ করা যায়। মেশিন কেনা যায়। ভবন মেরামত করা যায়। ব্যাংকঋণ পুনর্গঠন করা যায়। কিন্তু কর্মহীন মানুষের হারানো সময়, আয় ও নিরাপত্তা ফিরিয়ে দেওয়া সহজ নয়।
শিল্পকারখানায় আগুন লাগার খবর সাধারণত হিসাব হয় কোটি কোটি টাকার ক্ষতিতে। কিন্তু সেই হিসাবের বাইরে থেকে যায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্কটি- কতজনের বেতন বন্ধ হয়েছে, কত পরিবার গ্রামে ফিরে গেছে, কত দোকান বন্ধ হয়েছে, কত শিশুর পড়াশোনা থমকে গেছে, কত মানুষ নতুন করে অনিশ্চিত জীবনে ঢুকে পড়েছে।
রাজনৈতিক পালাবদল, সংঘাত কিংবা অস্থিরতার মূল্য তাই শুধু রাষ্ট্র বা মালিকপক্ষ দেয় না। শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী বিলটি অনেক সময় পরিশোধ করতে হয় শ্রমিককেই।
রহমত আলীর মতো হাজারো শ্রমিকের অপেক্ষা তাই শুধু একটি কারখানার গেট খোলার অপেক্ষা নয়- এটি আবার কাজ, আয় এবং স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার অপেক্ষা।
আর সেই অপেক্ষার প্রশ্নটি এখনো একই- কারখানা আবার খুলবে কবে? আর খুললেও ফিরবে কি হারিয়ে যাওয়া কর্মসংস্থান?


