দেশের কারাগারগুলো ধারণক্ষমতার দ্বিগুণেরও বেশি বন্দীর ভারে ন্যুব্জ। সেলগুলোতে জায়গা নেই, বন্দীদের ব্যবস্থাপনা নিয়ে বাড়ছে চাপ- এর মধ্যেই মাত্র ১১৭ দিনে প্রায় দুই লাখ মানুষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এই বিপুল গ্রেপ্তারের চিত্র দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, বিচারব্যবস্থা ও কারা ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে।

পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ মে থেকে ২৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত বিশেষ অভিযান, বিভিন্ন মামলা ও অন্যান্য অভিযানে মোট ১ লাখ ৯৫ হাজার ১৪৬ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এর মধ্যে শুধু পুলিশের বিশেষ অভিযানেই গ্রেপ্তার করা হয়েছে ৫৩ হাজার ৫১৮ জন। আর অন্যান্য মামলা ও অভিযানে গ্রেপ্তার হয়েছেন আরও ১ লাখ ৪১ হাজার ৬২৮ জন।

অর্থাৎ হিসাব করলে গড়ে প্রতিদিন প্রায় ১ হাজার ৬৫০ জন গ্রেপ্তার হয়েছেন। এত বিপুলসংখ্যক মানুষ গ্রেপ্তারের ফলে আগে থেকেই চরম চাপের মধ্যে থাকা কারাগারগুলোতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে।

কারা অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের ৭৫টি কারাগারে বন্দী ধারণক্ষমতা প্রায় ৪৫ হাজার ১৮৬ জন। অথচ বর্তমানে বন্দীর সংখ্যা প্রায় ৯৮ হাজার ২৩৩ জন। অর্থাৎ স্বাভাবিক ধারণক্ষমতার তুলনায় বন্দী রয়েছে দ্বিগুণেরও বেশি।

এই পরিসংখ্যানই কারাগার ব্যবস্থাপনার ভয়াবহ চাপের চিত্র স্পষ্ট করে। নির্ধারিত সংখ্যার প্রায় দ্বিগুণ বন্দীকে একই অবকাঠামোর মধ্যে রাখা, তাদের খাবার, চিকিৎসা, নিরাপত্তা, স্যানিটেশন ও পৃথকীকরণ নিশ্চিত করা কর্তৃপক্ষের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গ্রেপ্তার হওয়া অনেকের বিরুদ্ধে ছোটখাটো অভিযোগ রয়েছে। কারও ক্ষেত্রে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা কিংবা এক থেকে চার দিনের কারাদণ্ডও হচ্ছে।

এখানেই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- কারাগার যখন ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ বন্দীতে ঠাসা, তখন সব ধরনের অভিযোগে নির্বিচারে কারাবন্দিত্বের প্রয়োজনীয়তা কতটা?

অপরাধ দমনে আইন প্রয়োগ অবশ্যই জরুরি। কিন্তু একই সঙ্গে মামলার প্রকৃতি, অভিযোগের গুরুত্ব, জামিনের সুযোগ এবং বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনা না করে ব্যাপক হারে মানুষকে কারাগারে পাঠানো হলে তা কারা ব্যবস্থার ওপর অস্বাভাবিক চাপ সৃষ্টি করতে পারে।

১ মে থেকে ২৬ আগস্ট পর্যন্ত পুলিশের বিশেষ অভিযানে গ্রেপ্তার হওয়া ৫৩ হাজার ৫১৮ জনের পাশাপাশি বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও মাদক উদ্ধারের তথ্যও প্রকাশ করেছে পুলিশ।

পুলিশের এই অভিযানগুলোতে অপরাধ দমন ও অবৈধ অস্ত্র-মাদকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি সামনে এলেও, একই সময়ে মোট গ্রেপ্তারের বিশাল সংখ্যা কারাগারের ধারণক্ষমতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বাস্তবতা তৈরি করেছে।

কারাগারের ধারণক্ষমতা যেখানে ৪৫ হাজারের কিছু বেশি, সেখানে বন্দী প্রায় ৯৮ হাজার- এই ব্যবধান শুধু সংখ্যার পার্থক্য নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে মানবিক মর্যাদা, নিরাপত্তা, চিকিৎসা, বিচারপ্রক্রিয়া ও কারা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা।

অতিরিক্ত বন্দীর চাপে একই স্থানে ভিন্ন ধরনের মামলার আসামিদের রাখতে হলে নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়তে পারে। বন্দীদের পর্যাপ্ত জায়গা, চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসম্মত পরিবেশ নিশ্চিত করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কিন্তু অপরাধ দমন ও গ্রেপ্তারের পাশাপাশি দ্রুত বিচার, মামলাজট কমানো, জামিনযোগ্য মামলায় অপ্রয়োজনীয় কারাবাস এড়ানো এবং বিকল্প শাস্তির ব্যবস্থা নিয়েও ভাবতে হবে।

নইলে একদিকে পুলিশি অভিযানে হাজার হাজার মানুষ গ্রেপ্তার হবে, অন্যদিকে কারাগারে জায়গার সংকট আরও তীব্র হবে- আর পুরো ব্যবস্থার চাপ গিয়ে পড়বে কারা কর্তৃপক্ষ, বিচারব্যবস্থা এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের ওপর।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version