লোহার শিকল, উঁচু প্রাচীর আর কঠোর নিরাপত্তাও থামাতে পারেনি তাকে। কারাগারের একটি হাই-সিকিউরিটি সেল থেকেই পরিচালিত হচ্ছে বহু দেশের বিস্তৃত অপরাধ সাম্রাজ্য। তার এক নির্দেশে ঝরে পড়ছে প্রাণ, পাচার হচ্ছে মাদক ও অস্ত্র, ছড়িয়ে পড়ছে আতঙ্ক। তিনি লরেন্স বিষ্ণোই-ভারতের সবচেয়ে আলোচিত এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সবচেয়ে ভয়ংকর গ্যাংস্টারদের একজন।

মাত্র ৩৩ বছর বয়সেই তিনি হয়ে উঠেছেন ভারতের সবচেয়ে আলোচিত গ্যাংস্টারদের একজন। হত্যা, চাঁদাবাজি, মাদক চোরাচালান, আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র পরিচালনা-সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দুতে একটাই নাম, লরেন্স বিষ্ণোই। বিস্ময়কর বিষয় হলো, ২০১৫ সাল থেকে কারাগারে বন্দি থাকলেও জেলের ভেতর থেকেই তিনি পরিচালনা করছেন বিস্তৃত অপরাধ নেটওয়ার্ক, যার শাখা ছড়িয়ে আছে ভারত ছাড়াও কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে।

সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ইউরোপের কয়েকটি দেশের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত অভিযান ‘অপারেশন হার্ড বল’-এ লরেন্স বিষ্ণোই গ্যাংয়ের আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক আবারও বিশ্বজুড়ে আলোচনায় আসে। একযোগে ৫০টিরও বেশি স্থানে অভিযান চালিয়ে অন্তত ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। উদ্ধার করা হয় প্রায় এক হাজার কেজি কোকেন ও হেরোইন, বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ এবং ডজনখানেক অত্যাধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র।

অন্যান্য কুখ্যাত অপরাধীদের মতো লরেন্স বিষ্ণোইয়ের জীবনে দারিদ্র্য, বঞ্চনা কিংবা প্রতিশোধের কোনো গল্প নেই। বরং পাঞ্জাবের ফিরোজপুর জেলার একটি সচ্ছল পরিবারে তার জন্ম। ১৯৯৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি জন্ম নেওয়া লরেন্সের বাবা ছিলেন পুলিশ কর্মকর্তা। পরে পারিবারিক শতাধিক একর কৃষিজমির দেখভাল করতে চাকরি ছেড়ে দেন। আর্থিক স্বচ্ছলতার মধ্যেই বেড়ে ওঠেন লরেন্স।

স্থানীয় কনভেন্ট স্কুলে পড়াশোনা শেষে ২০০৮ সালে চণ্ডীগড়ে উচ্চশিক্ষার জন্য যান। পরে পাঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হয়ে ছাত্র রাজনীতিতে সক্রিয় হন। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে পরাজয়ের পরই তার জীবনের মোড় ঘুরে যায়। সেই সময় থেকেই স্থানীয় অপরাধচক্রের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয় এবং ধীরে ধীরে তিনি অপরাধ জগতের স্থায়ী সদস্য হয়ে ওঠেন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনেই অস্ত্র, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধে জড়িয়ে পড়েন লরেন্স। এরপর পাঞ্জাব ছাড়িয়ে ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে নিজের প্রভাব বিস্তার করেন। সময়ের সঙ্গে গড়ে তোলেন একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক অপরাধচক্র।

বর্তমানে কানাডায় তার নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন ছাত্রজীবনের সহযোগী গোল্ডি ব্রার এবং ইউরোপে নেতৃত্ব দেন রোহিত গোদারা। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্ক মাদক পাচার, অস্ত্র সরবরাহ, চাঁদাবাজি, ভাড়াটে খুন ও আন্তর্জাতিক অর্থপাচারের সঙ্গে জড়িত।

২০১৫ সালে গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে বিভিন্ন উচ্চ নিরাপত্তার কারাগারে বন্দি রয়েছেন লরেন্স বিষ্ণোই। বর্তমানে তাকে গুজরাটের আহমেদাবাদের সবরমতী সেন্ট্রাল জেলের হাই-সিকিউরিটি ওয়ার্ডে রাখা হয়েছে।

তবে কারাগারে থাকলেও তার অপরাধ সাম্রাজ্য থেমে নেই। ভারতের বিভিন্ন তদন্ত সংস্থার দাবি, জেল থেকেই এনক্রিপ্টেড যোগাযোগ, সহযোগী এবং বিদেশে অবস্থানরত গ্যাং সদস্যদের মাধ্যমে তিনি পুরো নেটওয়ার্ক পরিচালনা করেন। এমনকি কারাগারে থেকেই বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দেওয়ার ঘটনাও ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। তার বিরুদ্ধে হত্যা, মাদক পাচার, চাঁদাবাজি ও সংঘবদ্ধ অপরাধসহ ৩০টিরও বেশি মামলা বিচারাধীন।

লরেন্স বিষ্ণোই আন্তর্জাতিকভাবে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় আসেন বলিউড তারকা সালমান খানকে হত্যার প্রকাশ্য হুমকি দিয়ে।

১৯৯৮ সালে রাজস্থানের যোধপুরে ‘হাম সাথ সাথ হ্যায়’ সিনেমার শুটিং চলাকালে সালমান খানের বিরুদ্ধে কৃষ্ণসার হরিণ শিকারের অভিযোগ ওঠে। বিষ্ণোই সম্প্রদায়ের কাছে এই হরিণ অত্যন্ত পবিত্র। ফলে ঘটনাটি তাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দেয়।

২০১৮ সালে আদালতে হাজিরার সময় লরেন্স প্রকাশ্যে ঘোষণা দেন, “আমরা যোধপুরেই সালমান খানকে হত্যা করব।”এরপর একাধিকবার সালমান খান ও তার পরিবারের কাছে হত্যার হুমকি পাঠানো হয়। ২০২২ সালে সালমানের বাবা সেলিম খানের কাছে হুমকির চিরকুট পৌঁছায়। ২০২৩ সালে ই-মেইলের মাধ্যমে আবারও হুমকি দেওয়া হয়।

সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা ঘটে ২০২৪ সালের ১৪ এপ্রিল। মুম্বাইয়ের বান্দ্রায় সালমান খানের ‘গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্ট’-এর বাইরে মোটরসাইকেলে এসে দুই বন্দুকধারী অন্তত পাঁচ রাউন্ড গুলি চালায়। হামলার কয়েক ঘণ্টা পর লরেন্সের ভাই আনমোল বিষ্ণোই সামাজিক মাধ্যমে হামলার দায় স্বীকার করে এটিকে ‘শেষ সতর্কবার্তা’ বলে দাবি করেন।
গ্রেপ্তার হওয়া হামলাকারীদের দাবি, কারাগারে বসেই লরেন্স বিষ্ণোই তাদের এই হামলার নির্দেশ দিয়েছিলেন।

কারাগারে বন্দি থাকা অবস্থাতেই লরেন্স বিষ্ণোইয়ের বিরুদ্ধে একাধিক আলোচিত হত্যাকাণ্ডের নির্দেশ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।

এর মধ্যে রয়েছে ২০২২ সালে জনপ্রিয় পাঞ্জাবি শিল্পী সিধু মুসেওয়ালাকে হত্যা, ২০২৩ সালে কানাডায় শিখ নেতা হরদীপ সিং নিজ্জারের হত্যাকাণ্ডে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ এবং ২০২৪ সালে রাজনীতিক বাবা সিদ্দিকী হত্যাকাণ্ডে তার গ্যাংয়ের সম্পৃক্ততার অভিযোগ।

এ ছাড়া ২০২২ সালে গুজরাট উপকূলে পাকিস্তানি নৌকা থেকে প্রায় ৪০ কেজি হেরোইন জব্দের মামলাতেও তাকে আসামি করা হয়।

লরেন্স বিষ্ণোই শুধু অপরাধ নয়, নিজের ব্যক্তিত্ব ও উপস্থিতির কারণেও আলোচিত। পরিপাটি ছাঁটা দাড়ি, হুডি বা জ্যাকেট, স্থির দৃষ্টি-সব মিলিয়ে তিনি নিজেকে এমন এক পরিচয়ে তুলে ধরেছেন, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বহু অনুসারীর কাছেও আলোচনার বিষয়। তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, এই ‘গ্ল্যামারাইজড’ ভাবমূর্তির আড়ালে রয়েছে সংঘবদ্ধ অপরাধ, ভয়ভীতি এবং সহিংসতার দীর্ঘ ইতিহাস।

তার উত্থান প্রমাণ করেছে যে আধুনিক অপরাধচক্র আর কোনো নির্দিষ্ট শহর বা দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক যোগাযোগ এবং সংগঠিত নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে একজন বন্দিও কীভাবে বহুজাতিক অপরাধচক্র পরিচালনা করতে পারে, তার অন্যতম আলোচিত উদাহরণ হয়ে উঠেছেন লরেন্স বিষ্ণোই।

ভারতের তদন্ত সংস্থাগুলোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক আইনশৃঙ্খলা বাহিনীগুলোও এখন তাকে বৈশ্বিক সংগঠিত অপরাধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মুখ হিসেবে বিবেচনা করছে। কারাগারের উঁচু দেয়ালের আড়ালে থেকেও কীভাবে অপরাধ সাম্রাজ্য পরিচালিত হতে পারে-লরেন্স বিষ্ণোই তারই এক ভয়ংকর প্রতীক।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version