কারিগরি ত্রুটির কারণে ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় অবস্থিত আদানি পাওয়ারের বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে গেছে। এতে বাংলাদেশে কেন্দ্রটি থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ ৮০০ মেগাওয়াটের নিচে নেমে এসেছে। বিদ্যুতের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে বড় ধরনের ঘাটতি চলমান থাকার মধ্যেই নতুন এই বিপর্যয়ে দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।

আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি উৎপাদন ইউনিটের মধ্যে বর্তমানে শুধু ইউনিট-১ চালু রয়েছে। এর ফলে গতকাল কেন্দ্রটি থেকে গড়ে প্রায় ৭৪৮ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়েছে। অথচ ইউনিট-২ বন্ধ হওয়ার আগে কেন্দ্রটি থেকে বাংলাদেশে প্রায় ১ হাজার ৪৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসছিল।

বিদ্যুৎ সরবরাহে বড় ধাক্কাটি আসে ৯ সেপ্টেম্বর রাত ১১টার দিকে। ওই সময় কারিগরি ত্রুটির কারণে ইউনিট-২ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর মধ্যরাতে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে প্রায় ৭৫৮ মেগাওয়াটে নেমে আসে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) সদস্য (উৎপাদন) মো. জহুরুল ইসলাম জানান, ইউনিট-২-এর প্রধান পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ফিড ইউনিটে ত্রুটি দেখা দেওয়ায় সেটি বন্ধ করতে হয়েছে। তাঁর ভাষ্য, ফিড ইউনিটটি অতিরিক্ত গরম হয়ে যাওয়ায় নিরাপত্তার স্বার্থে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ করে দেওয়া হয়।

বিপিডিবি জানিয়েছে, মেরামতের কাজ শুরুর আগে ইউনিটটিকে পুরোপুরি ঠান্ডা হতে দিতে হবে। এ কারণে ত্রুটি সারিয়ে ইউনিটটি পুনরায় উৎপাদনে আনতে তিন থেকে চার দিন সময় লাগতে পারে।

তাপবিদ্যুৎকেন্দ্রের বয়লার ফিড পাম্প বা ফিড ইউনিট একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা। এর মাধ্যমে উচ্চচাপে বয়লারে নিয়মিত পানি সরবরাহ করা হয়। এ ব্যবস্থায় ত্রুটি দেখা দিলে বয়লারের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে। ফলে অনেক ক্ষেত্রে পুরো উৎপাদন ইউনিট বন্ধ করে দিতে হয়।

এদিকে আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ কমে যাওয়ার সময়েই জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ ঘাটতি প্রকট হয়ে উঠেছে। আজ ভোররাত ৩টায় জাতীয় গ্রিডে ১৫ হাজার ৭৭৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ১২ হাজার ৯০৭ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ওই সময়ে ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৮৬৯ মেগাওয়াট।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আদানির একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় উৎপাদন সক্ষমতার বড় একটি অংশ আপাতত ব্যবহার করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে এর প্রভাব আরও স্পষ্ট হতে পারে। ফলে লোডশেডিং ও বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় নতুন করে চাপ তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।

সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতেও আদানির গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহে একাধিকবার বিঘ্ন ঘটেছে। এর আগে রেলপথে জটের কারণে কেন্দ্রটিতে কয়লা পরিবহন ব্যাহত হওয়ায় উৎপাদন কমাতে হয়েছিল। আদানি কর্তৃপক্ষ তখন জানিয়েছিল, কয়লা পরিবহন ও লোডিংয়ের ওপর আরোপিত বিভিন্ন বিধিনিষেধের কারণে কয়লার প্রাপ্যতায় প্রভাব পড়েছে। ফলে সন্ধ্যার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে সরবরাহকে অগ্রাধিকার দিয়ে উৎপাদন সমন্বয় করতে হয়েছে।

গোড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটের প্রতিটির স্থাপিত সক্ষমতা ৮০০ মেগাওয়াট। তবে কেন্দ্রটির মোট প্রকৃত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে কেন্দ্রটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালে এর সরবরাহ কখনো কখনো ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াট ছাড়িয়ে যায়।

ফলে একটি ইউনিটের এই আকস্মিক অচলাবস্থা কত দ্রুত কাটিয়ে ওঠা যায়, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ইউনিট-২ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে উৎপাদনে ফিরতে না পারলে দেশের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি আরও বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version