রাজধানী ঢাকায় তীব্র গ্যাস-সংকটের কারণে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন সিএনজিচালিত অটোরিকশা, প্রাইভেটকার ও রাইড শেয়ারিংয়ের চালকেরা। গ্যাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা ফিলিং স্টেশনে লাইনে দাঁড়িয়েও প্রয়োজন অনুযায়ী জ্বালানি মিলছে না। এতে দিনের বড় একটি সময় গ্যাস সংগ্রহেই চলে যাচ্ছে চালকদের। কমে গেছে আয়, বেড়েছে ঋণের চাপ ও পারিবারিক দুশ্চিন্তা।

গত ১৫ আগস্ট রাজধানীর শ্যামলী থেকে গাবতলী এলাকার কয়েকটি সিএনজি ফিলিং স্টেশন ঘুরে দেখা যায়, কোথাও মধ্যরাত থেকে আবার কোথাও ভোর থেকেই গ্যাসের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে আছেন চালকেরা। কোনো কোনো স্টেশনে গ্যাসের চাপ এতটাই কম যে স্বাভাবিক পরিমাণ জ্বালানি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।

শ্যামলীর একটি ফিলিং স্টেশনে যাত্রাবাড়ী থেকে এসে সকাল সাড়ে আটটায় লাইনে দাঁড়ান সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক আবুল বাশার। প্রায় আড়াই ঘণ্টা অপেক্ষার পর দুই দফায় তিনি মাত্র ৬০ টাকার গ্যাস পান। তাঁর ভাষায়, এত অল্প গ্যাসে গাড়ি এক ঘণ্টাও চলবে না। গ্যাস শেষ হয়ে গেলে তাঁকে আবার লাইনে দাঁড়াতে হবে।

আবুল বাশার জানান, এমন পরিস্থিতি প্রায় তিন সপ্তাহ ধরে চলছে। কখনো চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা করেও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের পেছনে দীর্ঘ সময় চলে যাওয়ায় গাড়ি চালানোর সময় কমে গেছে। অথচ প্রতিদিন গাড়ির মালিককে নির্ধারিত জমা দিতে হচ্ছে। ফলে কয়েক দিন ধরে তাঁর আয় প্রায় বন্ধ। আগে সব খরচ বাদ দিয়ে দিনে গড়ে ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা আয় করলেও এখন সেই আয়ও হচ্ছে না।

শুধু বাশার নন, একই সংকটে পড়েছেন অসংখ্য চালক। গাবতলীর নন্দারবাগ এলাকায় শাহ আলম নামের এক চালক জানান, প্রতিদিন গাড়ির মালিককে ১ হাজার ১০০ টাকা জমা দিতে হয়। গ্যাস, খাবারসহ দৈনিক খরচ দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু গ্যাসের লাইনে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করায় আগের মতো আয় করতে না পারায় তাঁকে ইতোমধ্যে ১৫ হাজার টাকা ঋণ করতে হয়েছে।

অন্যদিকে, রাইড শেয়ারিংয়ের চালকদের অবস্থাও নাজুক। বাড্ডা থেকে কল্যাণপুরের একটি স্টেশনে গ্যাস নিতে আসা এক চালক আগের দিন রাত ১২টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন। রাত পেরিয়ে সকাল হলেও গ্যাস পাননি। দিনের বেলায় গাড়ি চালানো এবং রাতে গ্যাসের লাইনে দাঁড়ানোর কারণে অনেক চালক নিয়মিত ঘুমানোর সুযোগও পাচ্ছেন না।

রাজধানীর অন্যান্য এলাকাতেও একই চিত্র দেখা গেছে। ১৫ আগস্ট প্রগতি সরণির আবুল হোটেল থেকে নতুনবাজার পর্যন্ত চারটি সিএনজি ফিলিং স্টেশনের মধ্যে দুটিতে গ্যাস ছিল না। আরেকটিতে গ্যাসের চাপ ছিল কম। যেখানে গ্যাস মিলছিল, সেখানেও দীর্ঘ গাড়ির সারি দেখা যায়। কোনো কোনো স্টেশনে চালকেরা কয়েক ঘণ্টা অপেক্ষা করেও মাত্র কয়েকশ টাকার গ্যাস পেয়েছেন।

১৬ আগস্ট সকালেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় সিএনজি স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইন দেখা গেছে। কোথাও কম চাপের কারণে গ্যাস সরবরাহ দেওয়া সম্ভব হয়নি, আবার কোথাও গ্যাস না থাকায় স্টেশন বন্ধ রাখা হয়েছে। চালকদের অভিযোগ, দুই থেকে পাঁচ ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ানোর পর গ্যাস নিয়ে মাত্র কয়েকটি ট্রিপ দেওয়ার পরই আবার জ্বালানি শেষ হয়ে যাচ্ছে।

গ্যাস-সংকটের পেছনে জাতীয় পর্যায়ে সরবরাহ ঘাটতিও বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে। দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। এর একটি বড় অংশ আসে এলএনজি থেকে।

সম্প্রতি এলএনজি সরবরাহে বাধা তৈরি হওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের সরবরাহ কমেছে। সমুদ্রে বৈরী আবহাওয়ার কারণে আমদানি করা এলএনজি বহনকারী জাহাজ থেকে টার্মিনালে গ্যাস খালাসে সমস্যা তৈরি হয়। এতে সরবরাহ আরও কমে যায় বলে পেট্রোবাংলা ও জ্বালানি বিভাগের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

এর আগে এক্সিলারেট এনার্জির একটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল দুর্ঘটনার পর বন্ধ হয়ে যাওয়ায় দেশের গ্যাস সরবরাহে বড় ঘাটতি তৈরি হয়েছিল। পরে টার্মিনালটি আংশিকভাবে চালু হলেও সরবরাহ পুরোপুরি স্বাভাবিক হয়নি। ফলে রান্নার চুলা, শিল্পকারখানা, বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহনের জ্বালানি- সব ক্ষেত্রেই সংকটের প্রভাব পড়েছে।

গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা এখন পড়ছে নিম্নআয়ের পরিবহন শ্রমিকদের ওপর। গাড়ি যতক্ষণ রাস্তায় থাকে, ততক্ষণ আয় হয়। কিন্তু দিনের অর্ধেক সময় যদি গ্যাসের লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তাহলে আয় কমে যাওয়া স্বাভাবিক। এর সঙ্গে প্রতিদিনের গাড়ির জমা, খাবার ও অন্যান্য খরচ ঠিকই বহন করতে হচ্ছে চালকদের।

ফলে গ্যাসের সংকট এখন শুধু জ্বালানির সংকট নয়; এটি নগর পরিবহন, চালকদের আয়-রোজগার এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন চলাচলের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলছে। দ্রুত সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই দুর্ভোগ আরও বাড়তে পারে।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version