দেশের শিল্প ও জ্বালানি খাতে গ্যাস সংকট এখন আর কেবল সাময়িক ভোগান্তির বিষয় নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে উৎপাদন, কর্মসংস্থান, পরিবহন, বিদ্যুৎ ও জনজীবনে। নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, টাঙ্গাইল, গাজীপুর ও সাভারসহ বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমেছে, কোথাও কোথাও পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। গ্যাসের অভাবে ময়মনসিংহে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎকেন্দ্রও ২৬ দিন ধরে বন্ধ।

শিল্পমালিকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস সরবরাহের অনিশ্চয়তা থাকলেও সংকট মোকাবিলায় কার্যকর ও টেকসই সমাধান দৃশ্যমান নয়। ফলে একদিকে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে জ্বালানি ব্যয়, শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা কমছে এবং উদ্যোক্তাদের লোকসান বাড়ছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের গ্যাস ব্যবস্থাপনা, আমদানি পরিকল্পনা ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নীতির কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

নরসিংদীতে গ্যাস সংকট সবচেয়ে তীব্র আকার ধারণ করেছে। টেক্সটাইল, ডাইং মিলসহ বিভিন্ন মাঝারি ও ভারী শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় চাপ না থাকায় মেশিন চালানো যাচ্ছে না। শিল্পমালিকদের দাবি, জেলার প্রায় ৫০০ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই সংকটের কারণে কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।

উৎপাদন বন্ধ থাকায় একদিকে শ্রমিকদের মজুরি ও অন্যান্য ব্যয় বহন করতে হচ্ছে, অন্যদিকে সময়মতো পণ্য সরবরাহ করতে না পারায় বিদেশি ও দেশীয় অর্ডার বাতিল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা লোকসানের মুখে পড়ছেন উদ্যোক্তারা।

নরসিংদী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি রাশেদুল হাসান রিন্টু বলেন, কয়েক সপ্তাহ ধরে গ্যাসের তীব্র সংকটে শিল্পকারখানার চাকা কার্যত অচল হয়ে পড়েছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গ্যাসের চাপ না থাকায় উৎপাদন চালু রাখা সম্ভব হচ্ছে না।

নরসিংদীর চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ঘোড়াশাল-পলাশ ইউরিয়া সার কারখানায় অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস দেওয়ায় শিল্প, সিএনজি স্টেশন ও আবাসিক গ্রাহকের ওপর সংকটের প্রভাব আরও বেড়েছে।

শিল্পের পাশাপাশি পরিবহন খাতেও সংকটের ভয়াবহ প্রভাব পড়েছে। নরসিংদীর ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন সিএনজি স্টেশনে ভোররাত থেকেই শত শত যানবাহন গ্যাসের জন্য অপেক্ষা করছে। কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও প্রয়োজনীয় গ্যাস পাচ্ছেন না চালকরা।

নরসিংদী জেলা সিএনজি মালিক সমিতির সভাপতি আব্দুল মোমেন মোল্লার ভাষ্য, যেখানে সাধারণত ১২ থেকে ১৫ পিএসআই চাপ থাকার কথা, সেখানে কোনো কোনো দিন চাপ নেমে আসছে শূন্য থেকে ২ পিএসআইয়ে।

এর ফলে আঞ্চলিক সড়কে যানবাহন কমে গেছে এবং যাত্রীদের দুর্ভোগ বেড়েছে। চলাচলকারী যানবাহনের একটি অংশ বাড়তি ভাড়া আদায় করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

গ্যাস সংকট থেকে রেহাই পাচ্ছে না সাধারণ মানুষও। নরসিংদী শহরের বিভিন্ন এলাকায় আবাসিক সংযোগে চাপ এতটাই কমে গেছে যে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত রান্না করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

অনেক পরিবার বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনছে। কেউ মাটির চুলা, কেউ এলপিজি সিলিন্ডার ব্যবহার করে রান্নার কাজ চালাচ্ছেন। এতে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের ওপর বাড়তি আর্থিক চাপ তৈরি হয়েছে।

এর মধ্যে সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত নরসিংদীর বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস সংযোগ পুরোপুরি বন্ধ থাকার ঘটনাও জনদুর্ভোগ আরও বাড়িয়েছে।

নারায়ণগঞ্জেও পরিস্থিতি ভয়াবহ। গ্যাসের অভাবে টানা ১১ দিন ধরে জেলার সব রি-রোলিং মিল ও স্টিল মিল বন্ধ রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা।

বাংলাদেশ রি-রোলিং অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ মাহবুবুর রশিদ জুয়েলের অভিযোগ, গ্যাসের অভাবে মিল চালু করা যাচ্ছে না এবং সরকারের কাছ থেকেও তাঁরা কার্যকর আশ্বাস পাচ্ছেন না।

সোনারগাঁর আমান ইকোনমিক জোনেও উৎপাদন স্বাভাবিক হয়নি। সেখানে একটি সিমেন্ট কারখানা প্রতিদিন ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা বন্ধ থাকছে। জেলার আরও কয়েকটি সিমেন্ট কারখানায় একই ধরনের পরিস্থিতি চলছে।

টাঙ্গাইলেও গ্যাসের চাপ ভয়াবহভাবে কমে গেছে। গতকাল সকাল থেকে গ্যাস সংকটে অন্তত ৪৫টি কারখানার উৎপাদন বন্ধ হয়ে যায়। কয়েকটি কারখানা ডিজেল ব্যবহার করে সীমিত আকারে উৎপাদন চালু রাখার চেষ্টা করলেও তাতেও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরেনি।

টাঙ্গাইল গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন লিমিটেডের কর্মকর্তার তথ্য অনুযায়ী, যেখানে জাতীয় গ্রিড থেকে ১৫০ পিএসআই চাপ পাওয়ার কথা, সেখানে তা নেমে এসেছে মাত্র ২০ থেকে ২৫ পিএসআইয়ে।

মির্জাপুরের একাধিক স্পিনিং, কটন, গার্মেন্টস ও টেক্সটাইল কারখানা পর্যাপ্ত গ্যাস না পাওয়ায় বন্ধ রয়েছে। এতে শত শত শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছেন এবং শিল্পমালিকদের লোকসান বাড়ছে।

গাজীপুরে গ্যাসের চাপ আগের তুলনায় সামান্য বাড়লেও শিল্পকারখানা স্বাভাবিকভাবে চালানোর মতো পর্যাপ্ত নয়। কোনো কোনো কারখানায় অর্ধেকের বেশি মেশিন বন্ধ রেখে উৎপাদন চালাতে হচ্ছে।

কারখানা কর্তৃপক্ষ শ্রমিকদের পালাক্রমে কাজে লাগাচ্ছে। এতে উৎপাদন কমার পাশাপাশি শ্রমিকদের কর্মঘণ্টা ও আয়েও প্রভাব পড়ছে।

সাভার-আশুলিয়া শিল্পাঞ্চলেও গ্যাস সংকট কাটেনি। পোশাক কারখানাগুলোতে দিনের বেলায় গ্যাসের চাপ প্রায় থাকছেই না; রাতে কিছুটা বাড়লেও তা উৎপাদন স্বাভাবিক করার জন্য যথেষ্ট নয়।

গ্যাসের ঘাটতি সামাল দিতে অনেক কারখানা ডিজেল ও এলপিজি ব্যবহার করছে। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে ওয়াশিং ও ডাইং ইউনিটগুলো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

অর্থাৎ গ্যাস সংকটের কারণে শুধু উৎপাদন কমছে না, একই সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্পপণ্যের উৎপাদন খরচও বাড়ছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব দেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা ও রপ্তানি খাতেও পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন উদ্যোক্তারা।

হবিগঞ্জের মাধবপুরে ৮১টি শিল্পকারখানায় গ্যাস সরবরাহ তুলনামূলক স্বাভাবিক হলেও সিএনজি স্টেশনগুলোতে সংকট অব্যাহত রয়েছে। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের বিভিন্ন স্টেশনে শত শত যানবাহনের দীর্ঘ সারি দেখা যাচ্ছে।

চালকদের অনেককে ভোরে লাইনে দাঁড়িয়ে দুপুর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জাতীয় পর্যায়ে গ্যাসের চাপ কম থাকার কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।

গ্যাস সংকটের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিকগুলোর একটি দেখা গেছে ময়মনসিংহে। শম্ভুগঞ্জে ২১০ মেগাওয়াট ক্ষমতার সরকারি আরপিসিএল বিদ্যুৎকেন্দ্রটি গ্যাসের অভাবে ২৬ দিন ধরে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে।

কেন্দ্রটি বন্ধ থাকায় ময়মনসিংহসহ বৃহত্তর অঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় তথ্য অনুযায়ী, শহরাঞ্চলে দৈনিক ৮ থেকে ১০ ঘণ্টা এবং গ্রামীণ এলাকায় ১২ থেকে ১৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের অভিযোগ রয়েছে।

আরপিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ না পাওয়া পর্যন্ত কেন্দ্রটি চালু করা অনিশ্চিত।

সরকারি হিসাবে দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। কিন্তু ১৮ আগস্ট সন্ধ্যা ৬টায় মোট সরবরাহ ছিল মাত্র ২২৫ দশমিক ৭ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ঘাটতি দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৫৪ দশমিক ৩ কোটি ঘনফুট।

এর মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে এসেছে ১৬২ দশমিক ৬ কোটি ঘনফুট এবং এলএনজি থেকে ৬৩ দশমিক ১ কোটি ঘনফুট। মোট সরবরাহের প্রায় ২৮ শতাংশ এসেছে এলএনজি থেকে।

এক দিন আগেও সরবরাহ ছিল প্রায় ২২৮ দশমিক ৭ কোটি ঘনফুট। অর্থাৎ মাত্র এক দিনের ব্যবধানে সরবরাহ কমেছে প্রায় ৩ কোটি ঘনফুট।

স্বাভাবিক সময়ে দেশের দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল পূর্ণ সক্ষমতায় পরিচালিত হলে দৈনিক প্রায় ২৬৫ কোটি ঘনফুট পর্যন্ত গ্যাস সরবরাহের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু এলএনজি কার্গো সরবরাহ ও টার্মিনাল-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে সেই সক্ষমতা পুরোপুরি কাজে লাগানো যাচ্ছে না।

তথ্য অনুযায়ী, ২০ জুলাইয়ের তুলনায় ১৬ আগস্ট বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ কমেছে ২ দশমিক ৫ শতাংশ। একই সময়ে শিল্প খাতে সরবরাহ কমেছে প্রায় ৩০ শতাংশ।

বিদ্যুৎ উৎপাদন ধরে রাখতে শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহে কাটছাঁট করা হলে এর সরাসরি মাশুল দিতে হচ্ছে উৎপাদনমুখী প্রতিষ্ঠানগুলোকে। কারখানা বন্ধ, উৎপাদন কম, বিকল্প জ্বালানির বাড়তি ব্যয়- সব মিলিয়ে দেশের শিল্প খাত এখন বহুমুখী চাপে পড়েছে।

সবচেয়ে বেশি উদ্বেগ তৈরি হয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদি সময়সীমার বক্তব্যে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ড. জাহেদ উর রহমান জানিয়েছেন, গ্যাস সংকট পুরোপুরি নিরসনে আরও অন্তত দুই বছর সময় লাগতে পারে।

যদি সংকট সমাধানে আরও দুই বছর প্রয়োজন হয়, তাহলে এই সময়ের মধ্যে শিল্পকারখানার উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও রপ্তানি কীভাবে সুরক্ষিত রাখা হবে- এ প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তরও জরুরি।

শুধু আশ্বাস দিয়ে এই সংকট মোকাবিলা সম্ভব নয়। প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহের বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা, এলএনজি আমদানিতে স্থিতিশীলতা, পাইপলাইন ও বিতরণ ব্যবস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং শিল্পের জন্য নির্ভরযোগ্য জ্বালানি নিশ্চয়তা।

গ্যাস সংকটের পেছনে আমদানি, দেশীয় উৎপাদন, পাইপলাইন সক্ষমতা ও অবকাঠামোগত বিভিন্ন সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে। তবে সংকট দীর্ঘায়িত হয়ে যখন একের পর এক শিল্পাঞ্চলের কারখানা বন্ধ করছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র অচল হয়ে পড়ছে, সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে এবং বাসাবাড়ির চুলা জ্বলছে না- তখন সরকারের জ্বালানি ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।

দেশের শিল্পের চাকা সচল রাখা, বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করা এবং সাধারণ মানুষের জ্বালানি চাহিদা পূরণ করা সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। সেই জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী গ্যাস সংকট তৈরি হলে এর দায় শুধু বাজার পরিস্থিতি বা বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version