দেশে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট এখন আর শিল্পাঞ্চল বা গ্রামাঞ্চলের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে রাজধানীর মানুষের জীবনেও। গ্যাস সরবরাহ আরও কমে যাওয়ার পাশাপাশি ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় শুরু হয়েছে লোডশেডিং। ফলে একদিকে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, অন্যদিকে বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও বাড়ছে দুর্ভোগ।

বৈরী আবহাওয়ার কারণে মহেশখালীর সামিট এলএনজি টার্মিনাল বৃহস্পতিবার বিকেলে জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় সংকট আরও তীব্র হয়েছে। এর আগে আগুনের ঘটনায় এক্সিলারেট এনার্জির টার্মিনাল বন্ধ থাকায় এলএনজি সরবরাহে সামিটের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়েছিল। নতুন করে সামিটের সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় জাতীয় গ্রিডে গ্যাসের জোগান নেমে এসেছে সংকটজনক পর্যায়ে।

দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। স্বাভাবিক সময়ে জাতীয় গ্রিডে প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হলেও বর্তমানে তা কমে প্রায় ১৯০ কোটি ঘনফুটে দাঁড়িয়েছে। এলএনজি সরবরাহও নেমে এসেছে ৩০ কোটি ঘনফুটের নিচে।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- গ্যাসের ঘাটতির মধ্যেও বিদ্যুৎ উৎপাদন সচল রাখতে বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হয়েছে। আগে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে দৈনিক প্রায় ৬৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস দেওয়া হলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় ১০০ কোটি ঘনফুট হয়েছে। এর বিপরীতে শিল্প, বাসাবাড়ি ও অন্যান্য খাতে গ্যাসের সরবরাহ নেমে এসেছে মাত্র প্রায় ৮৫ কোটি ঘনফুটে। তিন সপ্তাহ আগেও এসব খাতে ১৬০ থেকে ১৬৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হতো।

ফলে গ্যাস ও বিদ্যুতের দ্বৈত সংকটে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সাধারণ মানুষ ও উৎপাদনমুখী শিল্প। বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্যাস ও বিদ্যুতের সংকটে কারখানাগুলোর উৎপাদন ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে।

এদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও সংকটের প্রভাব পড়েছে। পাওয়ার গ্রিডের তথ্য অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৭টায় দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট। সরবরাহ হয়েছে ১৫ হাজার ২২৬ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ঘাটতি ছিল ১ হাজার ৯৪ মেগাওয়াট। দিনের সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল ২ হাজার ৬৩৭ মেগাওয়াট।

আগের কয়েক দিনের তুলনায় ঘাটতি কিছুটা কমলেও রাজধানীকে লোডশেডিংয়ের বাইরে রাখা যায়নি। বুধবার রাত থেকেই পান্থপথ, যাত্রাবাড়ী, রাজাবাজার, লালমাটিয়া, মণিপুরীপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ বিভ্রাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে।

ডিপিডিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, রাত থেকে ভোর এবং দিনের বিভিন্ন সময়ে নির্দিষ্ট পরিমাণ লোডশেডিং চালানোর কথা রয়েছে। এতে ঢাকার একজন গ্রাহককে ২৪ ঘণ্টায় গড়ে প্রায় এক ঘণ্টা লোডশেডিংয়ের মুখে পড়তে হতে পারে।

গ্যাস সংকটের মধ্যে সৌদি আরামকোর সরবরাহ করা ‘আল হামরা’ নামের একটি এলএনজি কার্গো মহেশখালীর কোনো টার্মিনালই গ্রহণ করেনি। বীমা-সংক্রান্ত আপত্তির কারণে কার্গোটি টার্মিনালে ভেড়ানো সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে পেট্রোবাংলা। সংস্থাটির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, কার্গো পরিবর্তনের জন্য সরবরাহকারীকে বলা হয়েছে।

আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে শনিবার সামিট টার্মিনালে নতুন কার্গো যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। সেটি সফল হলে শনিবার দুপুরের পর জাতীয় গ্রিডে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়তে পারে। তবে সামিটের সরবরাহ বাড়লেই সংকট পুরোপুরি কাটবে না। এক্সিলারেটের ক্ষতিগ্রস্ত বয়লার পরীক্ষা ও চালুর সময় নতুন করে গ্যাস সরবরাহে চাপ তৈরি হতে পারে।

গ্যাস-বিদ্যুতের এই সংকট শুধু পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে মানুষের জীবনযাত্রা ও অর্থনীতিতে। কারখানায় উৎপাদন কমলে কর্মসংস্থান ও ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, বাসাবাড়িতে গ্যাসের সংকট হলে দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হয়, আর বিদ্যুৎ না থাকলে ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়।

বর্তমান বিএনপি সরকারের সময়ে গ্যাস ও বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও প্রশ্ন ক্রমেই বাড়ছে। সরকার যদি সংকট মোকাবিলায় কার্যকর, দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে এর সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে সাধারণ নাগরিক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও শিল্প উদ্যোক্তাদের।

Share.
Leave A Reply

Exit mobile version